টিকা কার্যক্রম চলমান থাকলেও কেন থামছে না হামে শিশু মৃত্যু?

দেশে হামের সংক্রমণ ও এ রোগে শিশু মৃত্যুর হার উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। একদিনেই ১৭ জন শিশুর মৃত্যুর খবর জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যা পরিস্থিতিকে আরও সংকটপূর্ণ করে তুলেছে। একই সময়ে সরকারের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচি চলমান থাকলেও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় টিকার কার্যকারিতা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
বিজ্ঞাপন
চলতি বছরের মার্চের মাঝামাঝি থেকে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে শুরু করলে ৫ এপ্রিল থেকে ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের জন্য এমআর-১ বুস্টার ডোজ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করে সরকার।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ইতোমধ্যে প্রায় ১ কোটি ৬১ লাখ শিশু টিকা পেয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৮৯ শতাংশ।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকা কার্যক্রম শুরু হলেও তার পূর্ণ প্রভাব প্রকাশ পেতে সাধারণত দুই থেকে তিন সপ্তাহ সময় লাগে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিনিধিও একই মত দিয়ে জানিয়েছেন, টিকার কার্যকারিতা বোঝার জন্য পর্যাপ্ত সময় অতিবাহিত হয়েছে। তবে এর মধ্যেই মৃত্যুর সংখ্যা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন: হামের উপসর্গে আরও ১২ শিশুর মৃত্যু
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু টিকা কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করাই যথেষ্ট নয়। তাদের মতে, ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ সতর্কতাকে কার্যত মহামারির ইঙ্গিত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত ছিল এবং আগেই জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণা প্রয়োজন ছিল। পাশাপাশি আক্রান্ত এলাকা চিহ্নিত করে কঠোর আইসোলেশন, কার্যকর নজরদারি ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের ঘাটতি রয়েছে বলেও তারা মনে করেন।
তাদের মতে, উপজেলা ও তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে আইসোলেশন ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে অন্য রোগীদের মধ্যেও সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে ভিটামিন ‘এ’ কর্মসূচি দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আরও দুর্বল হয়ে পড়ছে।
বিজ্ঞাপন
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. তাজুল ইসলাম বারী বলেন, বর্তমান টিকাদান কর্মসূচিতে বিভিন্ন বয়সের শিশুদের মধ্যে ভ্যাকসিনের কার্যকারিতার হার ভিন্ন। বিশেষ করে ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে কার্যকারিতা তুলনামূলক কম এবং পূর্ণ সুরক্ষার জন্য সময় প্রয়োজন। শুধু টিকা নয়, পাশাপাশি পুষ্টি ও দ্রুত আইসোলেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত না করলে সংক্রমণ কমানো কঠিন হবে।
অন্যদিকে রোগতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বিশ্বব্যাপী হামের সংক্রমণ বাড়লেও বাংলাদেশের মতো শিশু মৃত্যুর হার কোথাও দেখা যাচ্ছে না। তার মতে, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার সমন্বয়হীনতা ও দুর্বল বাস্তবায়ন পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, টিকার প্রভাব শুরু হলেও মৃত্যুর ঝুঁকি এক মাস পর্যন্ত থাকতে পারে।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শিশু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. লুৎফন নেসা জানান, হাম শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয় এবং নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো জটিলতা সৃষ্টি করে। অপুষ্টি থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে অক্সিজেন সাপোর্ট দিয়েও শিশুদের বাঁচানো সম্ভব হয় না বলে তিনি উল্লেখ করেন।
রুটিন টিকাদান কার্যক্রমেও সাম্প্রতিক সময়ে ভাটা পড়ার তথ্য পাওয়া গেছে। যদিও পূর্বের বছরগুলোতে টিকা কভারেজ প্রায় ৯০ শতাংশের বেশি ছিল, চলতি বছরে তা কমে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্বাস্থ্য সহকারীদের কর্মবিরতি, প্রশাসনিক জটিলতা ও মাঠপর্যায়ের সমস্যা টিকাদানে বাধা সৃষ্টি করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে রোগী ও অভিভাবকদের অভিযোগ, অনেক শিশু টিকা নেওয়ার আগেই আক্রান্ত হয়ে পড়ছে। আবার টিকা নেওয়ার পরও কিছু ক্ষেত্রে সংক্রমণ দেখা যাচ্ছে, যা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি টিকার আংশিক সুরক্ষা, সময়ের পার্থক্য এবং দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে হতে পারে।
তথ্য অনুযায়ী, আক্রান্ত শিশুদের একটি বড় অংশ এখনও টিকা গ্রহণ করেনি। আবার কিছু শিশু এক বা দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও আক্রান্ত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এতে বোঝা যায় টিকা সম্পূর্ণ সুরক্ষা দিলেও তা সময়সাপেক্ষ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য উপাদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
বিজ্ঞাপন
চিকিৎসকরা সতর্ক করে বলছেন, হাম থেকে সেরে ওঠার পরও শিশুদের দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকি থেকে যায়। চোখের সমস্যা, স্নায়বিক জটিলতা, শ্রবণশক্তি হ্রাস এবং ফুসফুসে স্থায়ী ক্ষতির মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি থাকলে অন্ধত্বের ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের অভিমত, বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় শুধু টিকা নয়, সমন্বিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, পুষ্টি নিশ্চিতকরণ, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং কার্যকর আইসোলেশন ব্যবস্থাই হতে পারে টেকসই সমাধান। নইলে শিশু মৃত্যুর হার নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়বে বলে তারা সতর্ক করেছেন।







