Logo

কুষ্টিয়ায় আট মাসে জলাতঙ্কের টিকা নিলেন ১২ হাজারের বেশি

profile picture
জেলা প্রতিনিধি
কুষ্টিয়া
২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:০৩
কুষ্টিয়ায় আট মাসে জলাতঙ্কের টিকা নিলেন ১২ হাজারের বেশি
ছবি: সংগৃহীত

কুষ্টিয়ায় পশুর কামড় ও আঁচড়ের ঘটনায় জলাতঙ্ক প্রতিরোধী টিকার চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালেই পশুর কামড় বা আঁচড়ের পর চিকিৎসা ও র‍্যাবিসের টিকা নিয়েছেন ১২ হাজার ৬৮১ জন। আক্রান্তদের বড় অংশই বিড়ালের কামড় ও আঁচড়ের শিকার।

বিজ্ঞাপন

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে ১ হাজার ৭১২ জন, ফেব্রুয়ারিতে ১ হাজার ১৮৯, মার্চে ১ হাজার ১৮৭, এপ্রিলে ১ হাজার ৫৩৭, মে মাসে ১ হাজার ৫০৮, জুনে ১ হাজার ৬৫৯ এবং জুলাইয়ে ১ হাজার ৬০৮ জন চিকিৎসা ও টিকা নিয়েছেন। আগস্টে রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২৮১ জনে, যা আট মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ।

সব মিলিয়ে প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ১ হাজার ৫৮৫ জন পশুর কামড় বা আঁচড়ের পর হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানান, এই পরিসংখ্যান শুধু কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের। জেলার আরও পাঁচটি উপজেলা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের তথ্য যুক্ত হলে মোট আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হবে। আবার অনেকে হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে না গিয়ে ফার্মেসি থেকে ব্যক্তিগতভাবে টিকা সংগ্রহ করেন। ফলে সরকারি হাসপাতালের হিসাব দিয়ে জেলার পুরো চিত্র পাওয়া সম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

আক্রান্তদের বড় অংশ বিড়ালের কামড়ে

হাসপাতালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, পশুর কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্তদের মধ্যে বিড়ালের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। এরপর রয়েছে কুকুর এবং তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে বানর বা হনুমান। বেজি, শেয়ালসহ অন্যান্য প্রাণীর কামড় ও আঁচড়ের ঘটনাতেও মানুষ চিকিৎসা নিতে হাসপাতালে আসছেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

সেপ্টেম্বরের প্রথম ১৫ দিনের তথ্যেও বিড়ালের আধিক্য স্পষ্ট। ১ থেকে ১৫ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রাণীর কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত ১ হাজার ১৫০ জনকে কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে র‍্যাবিসের টিকা দেওয়া হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২০ জন কুকুরের কামড়ে, একজন শেয়ালের কামড়ে এবং তিনজন বানরের কামড় বা আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে টিকা নিতে আসেন।

অর্থাৎ ওই ১৫ দিনে টিকা নেওয়া ১ হাজার ১৫০ জনের মধ্যে ১ হাজার ২৬ জনই বিড়ালের কামড় বা আঁচড়ের শিকার।

বিজ্ঞাপন

হাসপাতালের জলাতঙ্ক বিভাগে কর্মরত রাজু আহমেদ জানান, আক্রান্তদের কেউ কেউ একাধিকবার টিকা নিতে আসছেন। শখের বশে বাসাবাড়িতে বিড়াল-কুকুরসহ বিভিন্ন প্রাণী পালনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

পোষা বিড়ালের আঁচড়ের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে মারুফ হাসান বলেন, বুধবার তার পোষা বিড়াল তাকে আঁচড় দিয়েছে। এর আগেও কয়েকবার একই কারণে তাকে ভ্যাকসিন নিতে হয়েছে। তবে শখের কারণে এখনো বিড়াল পোষা ছাড়তে পারেননি তিনি।

কুষ্টিয়া শহরের বটতলা এলাকার বাসিন্দা স্বপ্না খাতুন জানান, পোষা বিড়ালের সঙ্গে খেলার সময় তার মেয়েকে বিড়াল কামড় দেয়। পরে মেয়েকে টিকা দেওয়ার জন্য হাসপাতালে নিয়ে আসেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

মোহাম্মদ নাসের আলী জানান, বাড়ির সিঁড়িতে শুয়ে থাকা বিড়ালের গায়ে অসাবধানতাবশত পা লাগলে সেটি তাকে কামড় দেয়। এর আগেও ওই বিড়াল তাকে আঁচড় দিয়েছিল এবং তখনও তাকে টিকা নিতে হয়েছিল। তার ভাষ্য, বিড়ালটি পোষা হলেও সেটিকে টিকা দেওয়া হয়নি।

সুমাইয়া তাসনিম জানান, প্রায় দুই সপ্তাহ আগে একটি বিড়াল তাকে আঁচড় দেয়। এ কারণে তিনি হাসপাতালে টিকা নিতে এসেছেন। এর আগেও একবার বিড়ালের আঁচড়ে তাকে টিকা নিতে হয়েছিল।

দিনে ৫৬৩টি পর্যন্ত টিকা দেওয়ার ঘটনা

বিজ্ঞাপন

কুষ্টিয়া ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত আবাসিক কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ইকবাল হাসান বলেন, কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এখন তুলনামূলকভাবে কম। অন্যান্য প্রাণীর কামড়ের রোগীর সংখ্যাও কম। তবে বিড়ালের আঁচড় বা কামড়ের রোগী অনেক বেশি। আক্রান্তদের প্রায় ৯৫ শতাংশই পোষা বিড়ালের আঁচড় বা কামড়ের শিকার।

তিনি বলেন, এমন ঘটনাও ঘটছে যে একজন রোগী এক মাস আগে ভ্যাকসিন নেওয়ার পর আবার বিড়ালের আঁচড় বা কামড়ের কারণে হাসপাতালে আসছেন।

ভ্যাকসিনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে ডা. ইকবাল হাসান বলেন, বর্তমানে টিকার চাহিদা এতটাই বেড়েছে যে আগে এ ধরনের পরিস্থিতি দেখা যায়নি। একদিনে হাসপাতালে সর্বোচ্চ ৫৬৩টি পর্যন্ত ভ্যাকসিন দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০টি ভ্যাকসিন দিতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বাইরে গেলে পোষা প্রাণীর ঝুঁকি বাড়ে

ডা. ইকবাল হাসান বলেন, পোষা বিড়াল বা কুকুর বাইরে গেলে কিংবা বাইরের প্রাণীর সঙ্গে মিশলে তার আঁচড় বা কামড়ের মাধ্যমে জলাতঙ্কের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। বিড়ালকে টিকা দেওয়া থাকলেও কিছু ক্ষেত্রে ঝুঁকি পুরোপুরি বাদ যায় না। তবে পোষা বিড়াল-কুকুর সব সময় ঘরের ভেতরে থাকলে এবং বাইরে না গেলে ঝুঁকি তুলনামূলক কম।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বারবার ভ্যাকসিন নেওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, যেকোনো ওষুধের মতো ভ্যাকসিনেরও কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে। তাই অপ্রয়োজনীয়ভাবে বারবার ভ্যাকসিন না নিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তা গ্রহণ করা উচিত।

তিনি আরও বলেন, পোষা প্রাণীর আঁচড় বা কামড়ের ঘটনায় সরকারকে বিপুল অর্থ ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তাই পোষা প্রাণী পালনের ক্ষেত্রে সবাইকে আরও সচেতন ও সতর্ক হতে হবে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের (বিবিসিএল) সহ-সভাপতি শাহাবুদ্দিন মিলন বলেন, পশু পালনের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা জরুরি। প্রাণীর যথাযথ পরিচর্যা, টিকাদান এবং মানুষের সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রাণী আঁচড় বা কামড় দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

কুষ্টিয়ার সিভিল সার্জন ডা. শেখ মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, সচেতন হওয়া এবং সচেতনতা তৈরি করা ছাড়া এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের অন্য কোনো পথ নেই।

তার পরামর্শ, বিড়াল-কুকুরসহ অন্য কোনো প্রাণী বাড়িতে আনার আগে তার টিকা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে পোষা প্রাণীটি যাতে বাইরের অন্য প্রাণীর সংস্পর্শে না আসে, সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

বিজ্ঞাপন

তিনি জানান, কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালসহ উপজেলা হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী র‍্যাবিস টিকার কোনো সংকট নেই।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD