Logo

যে কারণে বাংলাদেশি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না ইরান

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২২ এপ্রিল, ২০২৬, ১৩:৩৯
যে কারণে বাংলাদেশি জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হতে দিচ্ছে না ইরান
ছবি: সংগৃহীত

মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ হরমুজ প্রণালি কঠোর নিয়ন্ত্রণে রেখেছে তেহরান। এই পরিস্থিতিতে ইরানের ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি)-এর অনুমতি না পাওয়ায় বাংলাদেশি পতাকাবাহী জাহাজ ‘বাংলার জয়যাত্রা’ এখনো হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারেনি।

বিজ্ঞাপন

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, বিষয়টি সমাধানে তৎপরতা চালানো হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে গত ১৯ এপ্রিল তুরস্কে এক বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাঈদ খাতিবজাদেহর কাছে জাহাজটির নিরাপদ পারাপারের জন্য সহযোগিতা চান। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।

একই সময়ে ক্যামেন আইল্যান্ডের পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজও সৌদি আরবের জুয়াইমাহ বন্দর থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রার কথা থাকলেও ইরানের অনুমতি না পাওয়ায় সেটিও গন্তব্যে পৌঁছাতে পারেনি বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

এর আগে ১ এপ্রিল ঢাকায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত জানান, হরমুজ পারাপারের অপেক্ষায় থাকা বাংলাদেশি জাহাজগুলোর বিষয়ে সহায়তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মার্চ মাসের শেষদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি দেশটির রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে বলেছিলেন, বাংলাদেশসহ কয়েকটি দেশের জাহাজ চলাচলের সুযোগ দেওয়া হতে পারে।

তবে বাস্তবে দুই দফা চেষ্টা করেও অনুমতি না পেয়ে বর্তমানে প্রায় ৩৭ হাজার টন সারবোঝাই ‘বাংলার জয়যাত্রা’ সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি বন্দরের কাছে অবস্থান করছে। জাহাজটি বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের (বিএসসি) মালিকানাধীন হলেও এটি একটি সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানির ভাড়ায় পরিচালিত হচ্ছে। জাহাজের সব নাবিকই বাংলাদেশি। পরিকল্পনা ছিল, হরমুজ পেরিয়ে এটি দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন ও ডারবান বন্দরে যাবে।

বিএসসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কমোডর মাহমুদুল মালেক জানিয়েছেন, জাহাজটি পার করানোর জন্য কূটনৈতিক পর্যায়ে যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকায় কূটনৈতিক সূত্রগুলোর ধারণা, সম্প্রতি ইরানে হামলা এবং দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশ সরকারের দেওয়া কিছু বিবৃতি তেহরানের অসন্তোষের কারণ হতে পারে। বিষয়টি ঢাকায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূতও ইঙ্গিত দিয়েছেন বলে জানা গেছে। এই কারণেই হরমুজ প্রণালি অতিক্রমে অনুমতি দিতে অনীহা দেখাচ্ছে ইরান—এমন ধারণা কূটনৈতিক মহলে আলোচনা হচ্ছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালায় বলে দাবি করা হয়। এতে দেশটির সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা খামেনি এবং তার পরিবারের কয়েকজন সদস্য নিহত হন—এমন তথ্যও ইরানি সূত্রে উঠে এসেছে। একই হামলায় প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও সশস্ত্র বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারাও নিহত হন বলে জানানো হয়।

বিজ্ঞাপন

এর জবাবে ইরান সৌদি আরব, কাতার ও কুয়েতসহ উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালায়।

পরবর্তীতে ১ মার্চ বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ইরানের পাল্টা হামলার নিন্দা জানায়। তবে ওই বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র বা ইসরায়েলের নাম উল্লেখ করা হয়নি এবং ইরানে হামলা নিয়েও সরাসরি নিন্দা জানানো হয়নি।

এই অবস্থান নিয়ে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনার পর ২ মার্চ আরেকটি বিবৃতিতে খামেনির মৃত্যুকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করে ইরানের জনগণের প্রতি শোক জানায় বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন

কূটনৈতিক সূত্রগুলোর মতে, বাংলাদেশ দূতাবাসের পর্যাপ্ত শোকপ্রকাশ না করা এবং আনুষ্ঠানিকভাবে শোকবইয়ে স্বাক্ষর না করার বিষয়টি ইরানের মধ্যে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া তৈরি করে।

ঢাকায় নিযুক্ত ইরানি রাষ্ট্রদূত এক সাক্ষাৎকারে জানান, বাংলাদেশের বিবৃতিতে তারা সন্তুষ্ট নয়। তিনি আরও বলেন, কিছু ইউরোপীয় দেশের যুদ্ধবিরোধী অবস্থানের মতো বাংলাদেশও আরও স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারত বলে তারা আশা করে।

রাষ্ট্রদূত অবশ্য সে সময় জানান, বাংলাদেশি ছয়টি জাহাজকে হরমুজ পার হওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পরবর্তীতে ৫ এপ্রিল ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান ইরানি রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বৈঠক করে জাহাজের নিরাপদ চলাচলে সহায়তা চান। রাষ্ট্রদূত বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে বলে আশ্বাস দেন।

তবে এরপরও দুই দফা চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় বিষয়টি আবারও উচ্চপর্যায়ে উত্থাপন করা হয় তুরস্কে অনুষ্ঠিত বৈঠকে।

বিজ্ঞাপন

কূটনৈতিক জটিলতা ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা

ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো বলছে, মূলত যুদ্ধ পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অবস্থান নিয়ে তৈরি হওয়া অস্পষ্টতা এখন জাহাজ চলাচল ইস্যুকে প্রভাবিত করছে।

সাবেক কূটনীতিকদের মতে, কোনো দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণ বা আগ্রাসনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান সাধারণত নিরপেক্ষ থাকে। তবে সাম্প্রতিক বিবৃতিতে সেই ভারসাম্য পুরোপুরি বজায় না থাকায় কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

উল্লেখ্য, ‘বাংলার জয়যাত্রা’ জাহাজটি জানুয়ারি মাসে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় প্রবেশ করে এবং বিভিন্ন বন্দরে পণ্য পরিবহন করে। ফেব্রুয়ারির শেষদিকে এটি স্টিল কয়েল নিয়ে দুবাই বন্দরে পৌঁছায়। পরে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে একাধিকবার নিরাপত্তাজনিত জটিলতায় পড়ে জাহাজটি।

বর্তমানে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনা চললেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজটির নিরাপদ পারাপার নিয়ে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি।

বিজ্ঞাপন

সূত্র: বিবিসি বাংলা

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD