পাকিস্তানিদের ওপর কঠোরতা, গণহারে তাড়িয়ে দিচ্ছে আরব আমিরাত!

মধ্যপ্রাচ্যের গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাতে পাকিস্তানি নাগরিকদের বিরুদ্ধে হঠাৎ কঠোর অবস্থান নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে পাকিস্তানি শ্রমিকদের গ্রেপ্তার, ভিসা নবায়ন বন্ধ এবং দ্রুত দেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে পাকিস্তানে। বিশ্লেষকরা বলছেন, এর ফলে দেশটির অর্থনীতি ও বৈদেশিক আয়ের ওপর বড় ধরনের চাপ তৈরি হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (১১ মে) মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার সাম্প্রতিক সংঘাত নিরসনে পাকিস্তানের মধ্যস্থতার উদ্যোগ এবং আঞ্চলিক কূটনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে আবুধাবির সঙ্গে ইসলামাবাদের সম্পর্কে টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। এর জের ধরেই পাকিস্তানি শ্রমিকদের প্রতি কঠোরতা বাড়িয়েছে আমিরাত প্রশাসন।
খবরে বলা হয়, গত ৮ এপ্রিল ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতির পর থেকেই পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে ধরপাকড় ও ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়। এতে সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সাধারণ শ্রমিকরা, যাদের উপার্জনের ওপর পাকিস্তানের লাখো পরিবার নির্ভরশীল।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টা করছে পাকিস্তান। তবে আমিরাতের অভিযোগ, ইরানি হামলার বিষয়ে পাকিস্তান পর্যাপ্ত কঠোর অবস্থান নেয়নি। যুদ্ধ চলাকালে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার মুখে পড়ে আমিরাত, আর সেই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদের নরম কূটনৈতিক অবস্থান আবুধাবিকে অসন্তুষ্ট করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, গত এক মাসে আমিরাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ২০ জনের বেশি পাকিস্তানি শিয়া কর্মীর সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে। তাদের অনেকেই অভিযোগ করেছেন, হঠাৎ গ্রেপ্তার করে আটক কেন্দ্রে নেওয়ার পর কোনও ব্যাখ্যা ছাড়াই নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পাকিস্তানের শিয়া ধর্মীয় নেতাদের দাবি, এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে এ পর্যন্ত কয়েক হাজার শিয়া শ্রমিককে আমিরাত ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। যদিও এই অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট কিছু জানায়নি আবুধাবি।
পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি অবশ্য গণহারে পাকিস্তানিদের বহিষ্কারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তার দাবি, কেবল অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদেরই ফেরত পাঠানো হচ্ছে। তবে শিয়া সম্প্রদায়ের সদস্যদের আলাদা করে টার্গেট করা হচ্ছে কি না—সেই প্রশ্নে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।
এদিকে, আমিরাত সরকারের পক্ষ থেকেও আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে আমিরাতঘনিষ্ঠ বিশ্লেষক নাদিম কোটেইচের ভাষ্য অনুযায়ী, আমিরাতের সঙ্গে যথেষ্ট সমন্বয় না করেই পাকিস্তান শান্তি উদ্যোগে সক্রিয় হয়েছিল, যা দুই দেশের সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে।
বিজ্ঞাপন
শুধু শ্রমবাজার নয়, আর্থিক ক্ষেত্রেও এর প্রভাব দেখা যাচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত মাসে আমিরাত পাকিস্তানের কাছে ৩৫০ কোটি ডলারের ঋণ ফেরত চেয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের জন্য বড় চাপ তৈরি করতে পারে। তবে সংকট সামাল দিতে সৌদি আরব পাকিস্তানের রিজার্ভে ৩০০ কোটি ডলার জমা রাখার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে।
আবুধাবিভিত্তিক আনোয়ার গারগাশ ডিপ্লোম্যাটিক অ্যাকাডেমির সিনিয়র ফেলো হুসেইন হাক্কানি বলেন, ইরান ইস্যুতে পাকিস্তানের অবস্থানে আমিরাত বিস্মিত হয়েছে, আবার পাকিস্তানও অবাক হয়েছে আমিরাতের প্রতিক্রিয়া দেখে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরাতে ২০ লাখের বেশি পাকিস্তানি বসবাস করেন। গত বছর তারা প্রায় ৮০০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স দেশে পাঠিয়েছেন, যা পাকিস্তানের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাকিস্তানের সাবেক অর্থমন্ত্রী মিফতাহ ইসমাইল বলেছেন, আমিরাতের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখা ইসলামাবাদের জন্য অপরিহার্য। তবে চলমান আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের বিকল্প পথও খুব সীমিত ছিল বলে তিনি মন্তব্য করেন।
বিতাড়িত শ্রমিকদের অভিযোগ, তাদের অনেককে ব্যক্তিগত মালপত্র গুছিয়ে নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি। ২৫ বছর বয়সী আলী হামজা জানান, গত ১৩ এপ্রিল তাকে অফিস থেকে আটক করে আল-আউইর ডিটেনশন সেন্টারে নেওয়া হয় এবং কয়েকদিন পর পাকিস্তানে ফেরত পাঠানো হয়।
বিজ্ঞাপন
উত্তর-পশ্চিম পাকিস্তানের বাসিন্দা ও পেশায় ট্যাক্সিচালক হায়দার আলী বঙ্গশ বলেন, কেন আটক করা হয়েছে সে বিষয়ে কিছু জানানো হয়নি। তবে তাদের ধারণা, শিয়া পরিচয়ের কারণেই তারা লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছেন।
দুবাইয়ে পাকিস্তানি কনস্যুলেটের কিছু নথিতে বিতাড়নের কারণ হিসেবে ‘জেলে থাকা বা পলাতক’ উল্লেখ করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
বিজ্ঞাপন
এছাড়া আমিরাতের অন্তত ১২টি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, পাকিস্তানি কর্মীদের ভিসা নবায়ন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে এবং নতুন ভিসা ইস্যুতেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সরাসরি কর্মীদের দেশত্যাগের নির্দেশও দেওয়া হচ্ছে।
আবুধাবির একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মালিক জানান, তার প্রতিষ্ঠানে কর্মরত এক পাকিস্তানি শিয়া টেকনিশিয়ানকে ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে দেশ ছাড়ার নির্দেশ দেয়।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, বর্তমানে পাকিস্তান সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার সূক্ষ্ম আঞ্চলিক প্রতিযোগিতার মাঝখানে অবস্থান করছে। ইয়েমেন যুদ্ধসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই উপসাগরীয় শক্তির মধ্যে মতপার্থক্য বাড়ছে। এর মধ্যেই পাকিস্তান গত বছর সৌদির সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে, যা আমিরাতের উদ্বেগ বাড়িয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
আটলান্টিক কাউন্সিলের সিনিয়র ফেলো মাইকেল কুগেলম্যানের মতে, পাকিস্তান একদিকে সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বজায় রাখছে, অন্যদিকে ইরানের সঙ্গেও সম্পর্ক উন্নয়নের চেষ্টা করছে। এই দ্বিমুখী কূটনৈতিক কৌশল আমিরাত ভালোভাবে নেয়নি।








