বিশ্বজুড়ে গাঁজার নেশায় ডুবে সাড়ে ২৫ কোটির বেশি মানুষ!

মাদকাসক্তি এখন বিশ্বের অন্যতম বড় জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। মাদকের ভয়াল ছোবলে প্রতি বছর লাখো মানুষ শারীরিক, মানসিক ও সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে তরুণ প্রজন্ম। আর বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক হিসেবে এখনও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছে গাঁজা। বর্তমানে বিশ্বজুড়ে সাড়ে ২৫ কোটিরও বেশি মানুষ নিয়মিত গাঁজা সেবন করছেন। এই সংখ্যা আফিম, অ্যামফিটামিন, কোকেন ও এক্সট্যাসিসহ অন্যান্য প্রধান মাদকের মোট ব্যবহারকারীর সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে গেছে।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধবিষয়ক কার্যালয়ের প্রকাশিত ‘বিশ্ব মাদক প্রতিবেদন ২০২৬’-এ উঠে এসেছে এসব তথ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক দশকে বিশ্বব্যাপী গাঁজা ব্যবহারকারীর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে এবং এই প্রবণতা এখনও অব্যাহত রয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৪ সালে ১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী মানুষের মধ্যে গাঁজা ব্যবহারের হার ছিল ৩ দশমিক ৮ শতাংশ। এক দশক পর ২০২৪ সালে সেই হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ দশমিক ৮ শতাংশেরও বেশি। অর্থাৎ মাত্র ১০ বছরে গাঁজা ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘের পর্যবেক্ষণ বলছে, গত ১০ থেকে ১২ বছরে গাঁজাকে ঘিরে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। একই সঙ্গে উৎপাদন, পাচার এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় নতুন নতুন কৌশল যুক্ত হওয়ায় বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে গাঁজার ব্যবহার দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, গাঁজার উৎপাদন, পাচার ও ব্যবহার—তিন ক্ষেত্রেই উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটছে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন দেশে গাঁজাকে বৈধ করা কিংবা অপরাধের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার নীতির ফলে এর ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। এসব নীতিগত পরিবর্তনের প্রভাব এখন বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও পড়তে শুরু করেছে।
একসময় গাঁজার পাচার মূলত নিজ নিজ অঞ্চলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু বর্তমানে উত্তর আমেরিকা থেকে ব্যাপক সরবরাহের কারণে আন্তঃআঞ্চলিক পাচার ও বাণিজ্য উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে উত্তর আমেরিকার বাইরে ৫৭টি দেশ বা অঞ্চল গাঁজা জব্দের উৎস হিসেবে উত্তর আমেরিকাকে চিহ্নিত করেছে। অথচ আগের দশকে এই সংখ্যা ছিল মাত্র ১১টি।
বিজ্ঞাপন
গত বছরের হিসাব অনুযায়ী, গাঁজা ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি উত্তর আমেরিকায়। ২০২৪ সালে কানাডার ৩২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ২৬ দশমিক ৪ শতাংশ মানুষ গাঁজা ব্যবহার করেছেন। সব মিলিয়ে এই মহাদেশে নিয়মিত গাঁজা সেবনকারীর সংখ্যা প্রায় ৬ কোটি ৯৩ লাখ।
মহাদেশভিত্তিক পরিসংখ্যানে উত্তর আমেরিকার পরেই রয়েছে এশিয়া। এখানে নিয়মিত গাঁজা সেবন করেন ৬ কোটি ৮৫ লাখের বেশি মানুষ। এরপর রয়েছে আফ্রিকা, যেখানে গাঁজাসেবীর সংখ্যা ৬ কোটি ৫১ লাখেরও বেশি।
অন্যদিকে ইউরোপে নিয়মিত গাঁজা ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৩ কোটি ১৩ লাখ। দক্ষিণ আমেরিকায় প্রায় ১ কোটি ৫৭ লাখ মানুষ গাঁজা সেবন করেন। ওশেনিয়াতেও সাড়ে তিন কোটির বেশি মানুষ নিয়মিত এই মাদক ব্যবহার করছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
দেশভিত্তিক পরিসংখ্যানেও উত্তর আমেরিকার দেশগুলো শীর্ষে রয়েছে। কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও নিউজিল্যান্ডে ১৪ দশমিক ১ শতাংশ, স্পেনে ১২ দশমিক ৬ শতাংশ, উরুগুয়েতে ১২ দশমিক ৩ শতাংশ এবং অস্ট্রেলিয়ায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশ মানুষের মধ্যে গাঁজা ব্যবহারের প্রবণতা পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশেও উদ্বেগজনক চিত্র
বিজ্ঞাপন
বিশ্ব পরিস্থিতির পাশাপাশি বাংলাদেশেও মাদক ব্যবহারের চিত্র ক্রমেই উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশে বর্তমানে আনুমানিক ৮২ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবহার করেন, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে শুধু গাঁজা ব্যবহারকারীর সংখ্যাই প্রায় ৬১ লাখ। এছাড়া ইয়াবা, মদ, কফ সিরাপ, হেরোইনসহ বিভিন্ন ধরনের মাদকও ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্টস লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তত্ত্বাবধানে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশজুড়ে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণার জন্য দেশের আটটি বিভাগ, ১৩টি জেলা এবং ২৬টি উপজেলা থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, মাদক ব্যবহারের হার সবচেয়ে বেশি ময়মনসিংহ বিভাগে, যেখানে হার ৬ দশমিক ২ শতাংশ। এরপর রয়েছে রংপুরে ৬ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। তবে ব্যবহারকারীর সংখ্যার বিচারে ঢাকা বিভাগ সবচেয়ে এগিয়ে। সেখানে প্রায় ২২ লাখ ৯০ হাজার মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদক ব্যবহার করেন।
বিজ্ঞাপন
গবেষণার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো, অধিকাংশ মাদকসেবীই তরুণ। তথ্য অনুযায়ী, ৩৩ শতাংশ ব্যবহারকারী ৮ থেকে ১৭ বছর বয়সে এবং ৫৯ শতাংশ ১৮ থেকে ২৫ বছর বয়সে প্রথম মাদক গ্রহণ শুরু করেন। বেকারত্ব, পারিবারিক অস্থিরতা, মানসিক চাপ, বন্ধুদের প্রভাব এবং সামাজিক নানা সমস্যাকে মাদক গ্রহণের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যবহারকারী জানিয়েছেন, তাদের কাছে মাদক সহজেই পাওয়া যায়।
গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, মাত্র ১৩ শতাংশ মাদকসেবী চিকিৎসা বা পুনর্বাসনের সুযোগ পেয়েছেন। ফলে অধিকাংশই চাইলেও মাদক ছাড়তে পারছেন না। ৬৯ শতাংশ অংশগ্রহণকারী চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা এবং ৬২ শতাংশ কাউন্সেলিং সেবার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ডা. মো. শাহিনুল আলম বলেন, মাদকাসক্তি কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি একটি জটিল জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট। তাই গবেষণাভিত্তিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে এই সমস্যা মোকাবিলা করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. হাসান মারুফ জানান, দেশে মাদকাসক্তির ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। এ পরিস্থিতি বিবেচনায় সরকার ইতোমধ্যে সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দিয়েছে। পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সমাজ এবং রাষ্ট্রের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয় বলেও তিনি মত দেন।








