Logo

‘যদি মৃত্যুই নিয়তি হয়, তাহলে নিজের দেশেই মরাই ভালো’

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৯ জুন, ২০২৬, ১৪:২৭
‘যদি মৃত্যুই নিয়তি হয়, তাহলে নিজের দেশেই মরাই ভালো’
ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ আফ্রিকায় ভালো আয়ের আশায় পাড়ি জমিয়েছিলেন মালাউইয়ের হাজারো মানুষ। অনেকের স্বপ্ন ছিল উপার্জিত অর্থ দিয়ে নিজ দেশে বাড়ি নির্মাণ, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়া কিংবা ছোট ব্যবসা শুরু করা। কিন্তু বিদেশিবিরোধী সহিংসতা সেই স্বপ্নকে মুহূর্তেই দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছে। জীবন বাঁচাতে সবকিছু ফেলে এখন খালি হাতে দেশে ফিরছেন হাজারো মালাউই নাগরিক।

বিজ্ঞাপন

তাদেরই একজন ২৭ বছর বয়সী জ্যানেট কাপিটো। তিন সন্তানের এই মা ২০২২ সালে মালাউইয়ের লোলো গ্রাম ছেড়ে দক্ষিণ আফ্রিকায় যান। উদ্দেশ্য ছিল কিছু অর্থ সঞ্চয় করে নিজের দেশে জমি কিনে একটি বাড়ি নির্মাণ করা। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হয়ে দাঁড়ায়। সহিংসতার মুখে আট মাস বয়সী সন্তানকে নিয়ে তাঁকে তড়িঘড়ি করে দেশে ফিরতে হয়।

কাপিটোর দুর্ভোগ এখানেই শেষ হয়নি। ফেরার পথে যে অল্প কিছু জিনিসপত্র সঙ্গে আনতে পেরেছিলেন, সেগুলোও মালাউইগামী বাসে চুরি হয়ে যায়। ফলে প্রায় নিঃস্ব অবস্থায় নিজ গ্রামে ফিরতে হয়েছে তাঁকে।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে কাপিটো বলেন, সহিংসতা শুরু হওয়ার পর নিরাপত্তার অভাবে তিনি ঘর থেকে বের হতে পারেননি। ফলে কর্মস্থলেও যাওয়া সম্ভব হয়নি এবং আয় বন্ধ হয়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

নিজ গ্রামের অসমাপ্ত বাড়ির ভিত্তির পাশে দাঁড়িয়ে তিনি জানান, দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি নাইজেরীয় মালিকানাধীন রেস্তোরাঁয় কাজ করতেন। সেখানে মাসে প্রায় দুই হাজার র‌্যান্ড আয় হতো। সেই অর্থ দিয়েই ধীরে ধীরে নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছিলেন।

হামলার সময় দীর্ঘক্ষণ খোলা মাঠে আশ্রয় নেওয়ার কারণে ধুলাবালিতে তাঁর গলায় সমস্যা দেখা দিয়েছে বলেও জানান তিনি। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকায় পরিচিত হওয়া তাঁর মালাউইয়ান স্বামী এখনো দেশে ফেরার পথে রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

দেশে ফিরে সরকারি নিবন্ধন সম্পন্ন করার পর কাপিটো ৭০ হাজার মালাউইয়ান কওয়াচা, অর্থাৎ প্রায় ৪০ মার্কিন ডলার সমপরিমাণ আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন। তবে নতুন করে জীবন শুরু করার জন্য এই সহায়তা যে যথেষ্ট নয়, সেটিও স্পষ্ট তাঁর কথায়।

দেশে ফিরছেন হাজারো মালাউই নাগরিক

বিদেশিবিরোধী সহিংসতার কারণে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বিপুলসংখ্যক মালাউই নাগরিককে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকার পুনর্বাসন কর্মসূচি চালু করেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন ব্যক্তি ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন অর্থ সংগ্রহ করে আটকে পড়াদের বাসযোগে দেশে ফেরাতে সহায়তা করছে।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরুর পর এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৯৩৬ জন মালাউই নাগরিক দেশে ফিরেছেন।

এর আগে মালাউইয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগ জানিয়েছিল, দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় ১০ হাজার মালাউই নাগরিক সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছেন। তাঁদের নিরাপদ, সুশৃঙ্খল ও সম্মানজনকভাবে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য একটি সমন্বিত পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত ১৫ হাজার ১৬২ জন মালাউই নাগরিককে প্রত্যাবাসন অথবা বহিষ্কারের আওতায় আনা হয়েছে।

ঋণ নিয়ে বিদেশে, ফিরে এলেন নিঃস্ব হয়ে

দেশে ফেরা অনেকেই জানিয়েছেন, উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে তাঁরা দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু করোনা মহামারির সময় দীর্ঘ লকডাউনের কারণে আয় কমে যাওয়ায় ঋণ পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়ে। এরপর সহিংসতা শুরু হলে তারা ঘরবাড়ি ছেড়ে ডারবানের বিভিন্ন খোলা স্থানে আশ্রয় নিতে বাধ্য হন।

বিজ্ঞাপন

মালাউইয়ের থাইলো জেলার লোমোলা এলাকার বাসিন্দা ৩৩ বছর বয়সী থোকোজানি এমফোলাও এমনই একজন প্রত্যাবর্তনকারী।

দেশে ফিরে মায়ের বাড়ির সামনে আত্মীয়-স্বজনদের আলিঙ্গনে আবেগাপ্লুত হয়ে তিনি বলেন, একসময় মনে হয়েছিল, যদি মৃত্যুই নিয়তি হয়, তাহলে নিজের দেশেই মরাই ভালো।

২০২৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে একটি ছোট কারখানায় ভাজা বাদাম প্যাকেটজাত করার কাজ পেয়েছিলেন এমফোলা। তিনি জানান, জীবন সহজ ছিল না, তবে অন্তত নিজের খরচ চালানো এবং সন্তানদের জন্য নিয়মিত টাকা পাঠানো সম্ভব হতো।

বিজ্ঞাপন

শেষবার যে বেতন পেয়েছিলেন, সেটিই দেশে ফেরার যাত্রাপথে ব্যয় করতে হয়েছে বলে জানান তিনি।

এমফোলার ভাষ্য, বিদেশি নাগরিকদের প্রকাশ্যে মারধরের বহু ঘটনা তিনি নিজের চোখে দেখেছেন। তাই পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও আর কখনো দক্ষিণ আফ্রিকায় ফিরে যাওয়ার ইচ্ছা নেই তাঁর।

তিনি বলেন, দেশে ফিরতে পেরেছেন, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় স্বস্তি। সঙ্গে রয়েছে কেবল কয়েকটি কাপড়। একসময় নিজের বাড়ি করার স্বপ্ন দেখলেও এখন সেটি অনিশ্চিত। ভবিষ্যতে পুঁজি জোগাড় করতে পারলে ছোট একটি ব্যবসা শুরু করতে চান তিনি।

বিজ্ঞাপন

নির্বাচন ঘিরেই বাড়ে বিদেশিবিরোধী হামলা

দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাসরত মালাউই কমিউনিটির কয়েকজন সদস্যের দাবি, দেশটিতে নির্বাচন ঘনিয়ে এলে বিদেশিবিরোধী বক্তব্য ও হামলার ঘটনা বেড়ে যায়।

বিজ্ঞাপন

দেশে ফিরে আসা অনেকেই গণমাধ্যমের সামনে কথা বলতে অনীহা প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে বহিষ্কৃত হয়ে ফিরে আসাকে সমাজের অনেকেই নেতিবাচকভাবে দেখেন। ফলে নতুন করে জীবন শুরু করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক পরিস্থিতির কারণে আগামী কয়েক সপ্তাহে আরও কয়েক হাজার মালাউই নাগরিক দেশে ফিরতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আগুনে পুড়ে ছাই জীবনের সঞ্চয়

বিজ্ঞাপন

দেশে ফেরা ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন দুই সন্তানের বাবা ইদ্রিসাহ আকিলেমুও। তিনি জানান, জোহানেসবার্গে গভীর রাতে তাঁর বাড়িতে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়।

মালাউইয়ে ফিরে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ঘটনাটি কোনো সাধারণ বিক্ষোভ ছিল না; বরং যুদ্ধের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। কারণ হামলাকারীরা দিনের বেলায় নয়, রাতের অন্ধকারে এসে তাঁদের ওপর আক্রমণ চালায়।

তিনি জানান, প্রাণে বেঁচে ফিরতে পারাই তাঁর সবচেয়ে বড় সৌভাগ্য। সব সঞ্চয় হারিয়ে এখন নতুন করে ছোট একটি ব্যবসা শুরু করার স্বপ্ন দেখছেন।

আকিলেমু বলেন, আশ্রয়কেন্দ্রে স্বেচ্ছাসেবকদের দেওয়া পোশাক পরেই তাঁকে দেশে ফিরতে হয়েছে। জীবনের পরিশ্রমে অর্জিত প্রায় সব সম্পদ লুট হয়ে গেছে কিংবা আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে।

তাঁর কথায়, দক্ষিণ আফ্রিকা যে তাদের নিজস্ব দেশ, তা তাঁরা বোঝেন। কিন্তু সেখানে যা ঘটেছে, তাতে হাজারো মানুষ আজ শিশুদের মতো খালি হাতে নিজ দেশে ফিরতে বাধ্য হয়েছেন। বহু বছরের শ্রমে গড়া স্বপ্ন এক নিমিষেই ধ্বংস হয়ে যাওয়ার এই বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD