হরমুজ প্রণালি বন্ধের পর আবারও ইরানে মার্কিন হামলা শুরু

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে। হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা এবং একটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনার পর ইরানের বিভিন্ন স্থাপনায় আবারও সামরিক হামলা চালানোর কথা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। পাল্টাপাল্টি পদক্ষেপে অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচল, জ্বালানি সরবরাহ এবং কূটনৈতিক প্রচেষ্টা নতুন করে অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে, ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে। সংস্থাটির দাবি, একটি জাহাজ অনুমোদিত নৌপথ থেকে সরে গিয়ে নিজস্ব ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বন্ধ করে দেওয়ায় সেটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
আইআরজিসির ভাষ্য অনুযায়ী, জাহাজটিকে একাধিকবার সতর্ক করা হলেও নির্দেশনা মানা হয়নি। পরে সতর্কতামূলক গুলি চালিয়ে সেটিকে থামানো হয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা হয়। একই সঙ্গে সংস্থাটি হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধের সিদ্ধান্ত কার্যকর থাকবে এবং এ বিষয়ে কোনো ধরনের বাহ্যিক চাপ মেনে নেওয়া হবে না।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, সাইপ্রাসের পতাকাবাহী একটি বাণিজ্যিক জাহাজে আইআরজিসির সরাসরি হামলার জবাবে তারা নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করেছে। সেন্টকমের দাবি, চলতি সপ্তাহে এটি ইরানের বিরুদ্ধে তাদের তৃতীয় সামরিক প্রতিক্রিয়া।
বিজ্ঞাপন
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্যমতে, হামলার শিকার এমভি জিএফএস গ্যালাক্সি নামের জাহাজটির ইঞ্জিন কক্ষ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে জাহাজটি নিজ গন্তব্যে যাত্রা অব্যাহত রাখতে পারেনি। এছাড়া একজন বেসামরিক নাবিক নিখোঁজ রয়েছেন বলেও জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
অন্যদিকে, যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) জানিয়েছে, সামরিক কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা গেছে, জাহাজটির নাবিকরা জাহাজ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন এবং তারা বর্তমানে একটি লাইফবোটে নিরাপদে অবস্থান করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে সেন্টকম বলেছে, বাণিজ্যিক জাহাজে আগের হামলার পর আন্তর্জাতিক সমঝোতা অনুসরণ করার জন্য ইরানকে আরেকটি সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তবে সেই সুযোগও তারা কাজে লাগাতে পারেনি।
বিজ্ঞাপন
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সেন্টকমের ওই বিবৃতি শেয়ার করে বলেন, ইরান ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এখন সেই সিদ্ধান্তের মূল্য তাদের দিতে হবে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, একটি জাহাজ অনুমোদিত নয় এমন নৌপথ ব্যবহার করে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করলে তার দিকে নৌ-ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। এরপরই আনুষ্ঠানিকভাবে প্রণালিটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালি বন্ধের সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে যদি যুক্তরাষ্ট্র কোনো সামরিক পদক্ষেপ নেয়, তাহলে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে। পাশাপাশি উপসাগরীয় অঞ্চলে নতুন স্থাপিত সামরিক ঘাঁটিগুলোকেও সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
উল্লেখ্য, চলতি সপ্তাহের শুরুতে ওমান উপকূলের কাছে তিনটি বাণিজ্যিক তেলবাহী ট্যাংকারে হামলার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি হতে থাকে। ইরান বরাবরই দাবি করে আসছে, নিরাপদ নৌপথ বলতে তাদের নিয়ন্ত্রিত জলসীমার নির্ধারিত রুটকেই বোঝায়।
ইরানি কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্যাংকার হামলার ঘটনার পর যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিক কয়েকটি বিমান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। এতে অন্তত ১৭ জন নিহত এবং ১১৫ জন আহত হন বলে দাবি করেছে তেহরান।
এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর কথাও জানিয়েছে ইরান। এই পাল্টাপাল্টি অভিযানে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সাম্প্রতিক হামলার মাধ্যমে কার্যত যুদ্ধবিরতির অবসান ঘটেছে। তবে একই সঙ্গে তিনি জানিয়েছেন, কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি এবং মধ্যস্থতাকারীরা এখনও আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন।
অন্যদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি অভিযোগ করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র পূর্ববর্তী সমঝোতা লঙ্ঘন করেছে। তার মতে, ওয়াশিংটনের সামরিক পদক্ষেপ চলমান কূটনৈতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যমগুলোর খবরে বলা হয়েছে, ইরান অনানুষ্ঠানিক বার্তায় যুক্তরাষ্ট্রকে জানিয়েছে যে বাণিজ্যিক ট্যাংকারে হামলার ঘটনা একটি বিচ্ছিন্ন ভুল ছিল এবং এর জন্য একটি বিপথগামী অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠী দায়ী।
বিজ্ঞাপন
জবাবে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে তেহরানের কাছে কয়েকটি শর্ত পাঠিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—হরমুজ প্রণালি আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত থাকার ঘোষণা এবং ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা বন্ধের প্রকাশ্য অঙ্গীকার।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এদিকে ইরানের নতুন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ মোজতবা খামেনি দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম প্রকাশ্য ভাষণে প্রতিশোধ নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। তার এই বক্তব্যের অল্প সময় পরই হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণা আসে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার প্রথম দিনেই তার বাবা ও সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। সম্প্রতি নিজ শহর মাশহাদে তাকে দাফন করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া ভাষণে নতুন সর্বোচ্চ নেতা বলেন, শহীদদের রক্তের প্রতিশোধ নেওয়া জাতির দাবি। তিনি বলেন, এটি কোনো ব্যক্তির সিদ্ধান্ত নয়; বরং রাষ্ট্রের নীতিগত অবস্থান।
অন্যদিকে সাম্প্রতিক কয়েক দিনে অনুষ্ঠিত জানাজা ও শোকসভায় অংশ নেওয়া কিছু ইরানি নাগরিককে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পবিরোধী স্লোগান ও প্ল্যাকার্ড বহন করতে দেখা গেছে।
এ ঘটনার পর ট্রাম্প সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, তার বিরুদ্ধে যেকোনো হামলার পরিকল্পনা বাস্তবায়নের চেষ্টা হলে যুক্তরাষ্ট্র কঠোর ও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জানাবে।
বিজ্ঞাপন
এদিকে মার্কিন কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইসরায়েল ওয়াশিংটনের কাছে এমন গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছে যেখানে ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে একটি সম্ভাব্য পরিকল্পনার উল্লেখ রয়েছে। তবে এ বিষয়ে নতুন কোনো নির্দিষ্ট পরিকল্পনার তথ্য অস্বীকার করেছে তেহরান।
নিজেও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে ট্রাম্প বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরেই ইরানের সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর তালিকায় রয়েছেন বলে মনে করেন। তবে চলমান সংকট নিরসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ পুরোপুরি থেমে যায়নি বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
হরমুজ প্রণালি বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন রুট। এ পথ বন্ধ থাকলে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশ্লেষকদের আশঙ্কা। ফলে সামরিক উত্তেজনার পাশাপাশি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তাও দ্রুত বাড়ছে।
তথ্য সূত্র: বিবিসি বাংলা








