Logo

জীবনের তোয়াক্কা না করে স্পেনে কেন যাচ্ছেন মরক্কোর হাজার তরুণ?

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২ আগস্ট, ২০২৬, ১৫:১০
জীবনের তোয়াক্কা না করে স্পেনে কেন যাচ্ছেন মরক্কোর হাজার তরুণ?
ছবি: সংগৃহীত

উন্নত জীবনের আশা, কর্মসংস্থানের সংকট, সামাজিক হতাশা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ইউরোপের চাকচিক্যময় জীবনের ছবি—সব মিলিয়ে মরক্কোর হাজারো তরুণ জীবনের ঝুঁকি নিয়েও স্পেনে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন। অনেকেই জানেন, এই পথ মৃত্যুঝুঁকিতে ভরা। তবুও তাঁদের বিশ্বাস, নিজ দেশে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের চেয়ে সেই ঝুঁকি নেওয়াই হয়তো বেশি সম্ভাবনাময়।

বিজ্ঞাপন

দক্ষিণ মরক্কোর উপকূলীয় শহর ইমসোয়ানে বসবাসকারী ২৬ বছর বয়সী হামজা (ছদ্মনাম) এমন বাস্তবতারই একজন নীরব সাক্ষী। স্থানীয় একটি সার্ফিং সরঞ্জামের দোকানে কাজ করা এই তরুণ জানান, তাঁর শৈশবের কয়েকজন বন্ধু স্পেনে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন। কেউ সীমান্ত পেরোতে সক্ষম হয়েছেন, আবার কেউ ব্যর্থ হয়েছেন। তাঁদের অনেকের জীবনই ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। তারপরও তারা সেই সিদ্ধান্তকে ভুল মনে করেন না।

হামজার ভাষ্য, তাঁর অনেক বন্ধু বছরের পর বছর দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও সীমিত সুযোগের মধ্যে আটকে আছেন। তাঁদের ধারণা, দেশে থেকে ভবিষ্যৎ গড়ার সুযোগ ক্রমেই কমে যাচ্ছে। ফলে ইউরোপে পাড়ি জমানোর স্বপ্নই হয়ে উঠেছে একমাত্র বিকল্প।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

গত বছরের সেপ্টেম্বরে মরক্কোর বিভিন্ন অঞ্চল থেকে প্রায় চার হাজার তরুণ স্পেনের স্বায়ত্তশাসিত শহর সেউতায় প্রবেশের চেষ্টা করেন। তাঁদের সঙ্গে সাব-সাহারা আফ্রিকার কয়েকজন অভিবাসীও ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া আহ্বানে সাড়া দিয়ে শত শত কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে সীমান্ত এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন তারা।

উত্তর আফ্রিকায় অবস্থিত স্পেনের সেউতা ও মেলিইয়া ইউরোপীয় ইউনিয়নের একমাত্র আফ্রিকান স্থলসীমান্ত। দীর্ঘদিন ধরেই উন্নত জীবনের আশায় এসব সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টা করে আসছেন বহু মানুষ।

বিজ্ঞাপন

মরক্কো কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ওই সময় সীমান্ত অতিক্রমের চেষ্টাকালে কয়েক হাজার মানুষকে আটক করা হয়। পাশাপাশি এ ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তারও করা হয়। তবে অভিযান চলাকালে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে বলপ্রয়োগ ও নির্যাতনের অভিযোগও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে, যদিও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ তা অস্বীকার করেছে।

হামজা জানান, তাঁর ছয় বন্ধু শেষ পর্যন্ত সেউতায় পৌঁছাতে সক্ষম হলেও তাদের বর্তমান জীবন সহজ নয়। বৈধ কাগজপত্রের অভাবে তারা স্থায়ী কাজ কিংবা স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। অনেকেই নিরাপত্তাজনিত কারণে পরিবারের সঙ্গেও খুব বেশি যোগাযোগ করেন না।

তাঁর এক বন্ধু, যিনি ফুটবল খেলোয়াড়, বর্তমানে স্পেনে অবস্থান করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর হাসিমুখের ছবি দেখে অনেকেই মনে করেন, তিনি সুখে আছেন। কিন্তু বাস্তবে বৈধ কাগজপত্র না থাকায় কোনো ক্লাবেই সুযোগ পাচ্ছেন না বলে জানান হামজা।

বিজ্ঞাপন

নিজে উচ্চশিক্ষিত হওয়ায় এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থা তুলনামূলক ভালো হওয়ায় অবৈধভাবে ইউরোপে যাওয়ার কথা কখনো ভাবেননি হামজা। তবে তিনি স্বীকার করেন, বন্ধুদের হতাশা ও বাস্তবতা তাঁদের এমন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বর্তমানে অভিবাসনের অন্যতম বড় প্রভাবক হয়ে উঠেছে। টিকটক, ইনস্টাগ্রামসহ বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে ইউরোপে পৌঁছানো ব্যক্তিদের ভিডিও ও ছবি তরুণদের মধ্যে নতুন স্বপ্ন তৈরি করছে। সেখানে বাস্তব জীবনের সংগ্রামের চেয়ে বিলাসী মুহূর্তগুলোই বেশি তুলে ধরা হয়।

মরক্কোর অভিবাসনবিষয়ক গবেষক আলী জুবেইদির মতে, সাম্প্রতিক সময়ে যে অভিবাসনের প্রবণতা দেখা গেছে, তা আগের চেয়ে ভিন্ন। এবার মানবপাচারকারী চক্রের চেয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমই বড় ভূমিকা রেখেছে। অনেক তরুণ নিজেরাই পরিকল্পনা করে সীমান্তে জড়ো হয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, আগে অবৈধ অভিবাসনের সঙ্গে সাধারণত বেকার বা সুবিধাবঞ্চিত তরুণদের নাম জড়াত। এখন দেখা যাচ্ছে, চাকরি থাকা এবং মাসিক আয় থাকা অনেক তরুণও দেশ ছাড়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে তিনি হতাশা, সামাজিক বৈষম্য এবং ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেন।

ফেনিদেকসহ সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দাদের জীবনে কোভিড-১৯ মহামারি বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। সীমান্ত বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ফলে বহু পরিবার আয় হারিয়েছে এবং বেকারত্ব বেড়েছে।

১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থী বুশরা আবজাইউর মনে করেন, মহামারির পর থেকে তরুণদের মধ্যে হতাশা আরও বেড়েছে। তাঁর মতে, আশপাশের অধিকাংশ তরুণই বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া তথাকথিত সফলতার গল্প তাঁদের আরও উৎসাহিত করছে।

বিজ্ঞাপন

অন্যদিকে, সেউতার একটি আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা কিশোর ইব্রাহিম (ছদ্মনাম) জানান, দারিদ্র্যই তাঁকে সমুদ্রে ঝাঁপ দিতে বাধ্য করেছিল। প্রায় সাত কিলোমিটার সাঁতরে সীমান্ত অতিক্রমের সময় তিনি ভেবেছিলেন হয়তো আর বেঁচে ফিরতে পারবেন না। সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা আজও তাঁর মনে গেঁথে আছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

অভিবাসন পর্যবেক্ষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে সমুদ্রপথে সেউতায় পৌঁছানোর চেষ্টা করতে গিয়ে অন্তত ৩৭ জন প্রাণ হারিয়েছেন। অনেককে আবার মরক্কো পুলিশ আটক করে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পাঠিয়ে দিয়েছে।

মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদার করতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মরক্কোর মধ্যে হওয়া বিভিন্ন চুক্তির কারণে মানবিক সংকট আরও বেড়েছে। শরণার্থী ও অভিবাসনপ্রত্যাশীদের নিরাপত্তা এবং মানবাধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও উদ্বেগ রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়, রাজনৈতিক অসন্তোষ, মতপ্রকাশের সীমাবদ্ধতা, মূল্যস্ফীতি, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতের দুর্বল অবস্থাও তরুণদের দেশত্যাগে উৎসাহিত করছে। অনেকেই অভিবাসনকে প্রতিবাদের একটি নীরব ভাষা হিসেবে দেখছেন।

বিজ্ঞাপন

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, মরক্কোর উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছেন। একই সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, কোভিড-১৯–এর পর দেশটিতে দারিদ্র্য ও বেকারত্ব আরও বেড়েছে।

তবে ইউরোপে পৌঁছানো মানেই স্বপ্নপূরণ নয়। অনেক অভিবাসী বৈধ কাগজপত্রের অভাবে কাজ পান না, কেউ কেউ রাস্তায় রাত কাটান। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই বাস্তবতা খুব কমই প্রকাশ পায়। বরং সুন্দর ছবি ও ভিডিও দেখে নতুন প্রজন্মের মধ্যে ইউরোপে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আরও বাড়ছে।

হামজা নিজে বৈধভাবে ইউরোপে উচ্চশিক্ষার জন্য আবেদন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কিন্তু তিনি জানেন, তাঁর অনেক বন্ধুর সে সুযোগ নেই। তাই তারা জীবন বাজি রেখেই সীমান্ত পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করছেন। বাস্তবের কষ্ট আড়াল করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুখের ছবি প্রকাশ করলেও, তাঁদের অনেকের জীবন এখনো অনিশ্চয়তা, সংগ্রাম ও ভয় নিয়ে এগিয়ে চলছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD