কলকাতায় হোটেল বন্ধে বিপাকে বাংলাদেশি পর্যটক ও রোগীরা

কলকাতার নিউমার্কেট এলাকায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর একের পর এক হোটেল ও গেস্ট হাউজ বন্ধ করে দেওয়ায় বিপাকে পড়েছেন বাংলাদেশি নাগরিকরা। আগে থেকে কক্ষ বুকিং করেও কলকাতায় পৌঁছে অনেকেই নির্ধারিত হোটেলে থাকার সুযোগ পাচ্ছেন না। এর মধ্যে বিকল্প আবাসনের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় কোথাও কোথাও ভাড়া কয়েক গুণ বাড়ানোর অভিযোগও উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
নিউমার্কেটের মির্জা গালিব স্ট্রিটের ‘শিখা ইন’ আবাসিক হোটেলে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নয়জনের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে সাতজন বাংলাদেশি নাগরিক ছিলেন। চিকিৎসা ও পর্যটনের উদ্দেশ্যে তারা কলকাতায় গিয়েছিলেন।
ঘটনার পর নিউমার্কেট এলাকার হোটেল ও গেস্ট হাউজগুলোর নিরাপত্তা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে তৎপর হয়েছে কলকাতা পুলিশ, কলকাতা পৌরসভা ও দমকল বিভাগ। কয়েক দফা পরিদর্শনের পর প্রায় ১৭টি হোটেল বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে শোকজ নোটিশও দেওয়া হয়েছে।
এতে সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন আগে থেকে আবাসন বুকিং করে কলকাতায় যাওয়া বাংলাদেশিরা। নির্ধারিত হোটেলে জায়গা না পেয়ে তাদের নতুন করে থাকার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
বেড়েছে বিকল্প হোটেলের ভাড়া
হোটেল বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং নতুন বুকিং সীমিত থাকায় আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় আবাসনের চাহিদা বেড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগে কিছু হোটেল ও গেস্ট হাউজ কর্তৃপক্ষ ভাড়া বাড়িয়ে দিয়েছে।
আগে যে কক্ষের দৈনিক ভাড়া প্রায় এক হাজার ভারতীয় রুপি ছিল, কোনো কোনো জায়গায় এখন সেটির জন্য ২ হাজার থেকে আড়াই হাজার রুপি পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে। একইভাবে ৫০০ থেকে ৬০০ রুপির কক্ষের ভাড়াও বেড়ে ১ হাজার ৫০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ রুপি পর্যন্ত হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
বিজ্ঞাপন

বিশেষ করে চিকিৎসার জন্য কলকাতায় যাওয়া বাংলাদেশিদের বাড়তি খরচের মুখে পড়তে হচ্ছে। কম ব্যয়ে চিকিৎসা নেওয়ার প্রত্যাশায় গিয়ে আবাসন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেকের বাজেটও এলোমেলো হয়ে পড়েছে।
‘আগে ৭০০ রুপি, এখন ১ হাজার ৫০০’
ঢাকার বাসিন্দা জাফর ইকবাল চিকিৎসার জন্য কলকাতায় গিয়ে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন। তিনি জানান, এর আগে বহুবার চিকিৎসার প্রয়োজনে কলকাতায় গেলেও এবারকার মতো সমস্যায় পড়েননি।
বিজ্ঞাপন
তার দাবি, আগে যে হোটেলের দৈনিক ভাড়া ৭০০ রুপি ছিল, একই হোটেলে এখন ১ হাজার ৫০০ রুপি পর্যন্ত চাওয়া হচ্ছে।
অগ্নিনিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
শুধু ভাড়া নয়, নিউমার্কেট এলাকার অনেক হোটেলের অগ্নিনিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন জাফর ইকবাল। তার ভাষ্য, বেশ কিছু গেস্ট হাউজের অভ্যন্তরীণ কাঠামো জটিল এবং অনেকটা গোলকধাঁধার মতো। জরুরি পরিস্থিতিতে কোন পথ দিয়ে দ্রুত বের হতে হবে, তা বোঝা কঠিন হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, অনেক হোটেলে বৈদ্যুতিক তার ও ওয়্যারিংয়ের অবস্থা ভালো নয়। কোথাও কোথাও তার ঝুলে থাকতে দেখা যায়। কিছু ভবনের লিফটও অনেক পুরোনো।
এ ছাড়া কোনো কোনো হোটেলে কক্ষগুলোর মধ্যকার চলাচলের পথ অত্যন্ত সরু। অনেক ভবনে পর্যাপ্ত ব্যালকনি বা জরুরি বহির্গমনের জন্য বিকল্প সিঁড়িও নেই বলে অভিযোগ করেন তিনি।
জাফর ইকবালের দাবি, বছরের পর বছর ধরে নিউমার্কেট এলাকার অনেক আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউজে এ ধরনের অবস্থা চলে আসছে।
বিজ্ঞাপন
নতুন বুকিং বন্ধ, বাড়ছে ভোগান্তি
শিখা ইন-এ অগ্নিকাণ্ডের পর নিউমার্কেট এলাকার অধিকাংশ হোটেল নতুন করে কক্ষ বুকিং নেওয়া বন্ধ করেছে বলে জানা গেছে। ফলে আগে থেকে বুকিং করা বাংলাদেশি নাগরিকদেরও বিকল্প আবাসন খুঁজতে হচ্ছে।
কম খরচে থাকার জায়গা খুঁজতে কেউ কেউ শিয়ালদহ স্টেশন ও আশপাশের এলাকাতেও যাচ্ছেন। অন্যদিকে মুকুন্দপুর, আনন্দপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বিকল্প গেস্ট হাউজে জায়গা নিতে গিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
‘মিনি বাংলাদেশ’-এর হোটেল নিয়ে নতুন প্রশ্ন
কলকাতার ‘মিনি বাংলাদেশ’ হিসেবে পরিচিত নিউমার্কেট ও আশপাশের এলাকায় বিপুলসংখ্যক হোটেল ও গেস্ট হাউজ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, কলিন স্ট্রিট, মির্জা গালিব স্ট্রিট, ফ্রি স্কুল স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট ও মার্কুইস স্ট্রিটসহ আশপাশের এলাকায় ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০টি হোটেল রয়েছে।
ঘনবসতিপূর্ণ এ এলাকার অনেক ভবনই পুরোনো। এসব ভবনে পরবর্তীতে একের পর এক আবাসিক হোটেল ও গেস্ট হাউজ গড়ে উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ভবনের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ হলেও বাইরে সাজসজ্জার দিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। সানমাইকা, প্লাইউডসহ বিভিন্ন উপকরণ দিয়ে অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্যায়ন করা হলেও অগ্নিনিরাপত্তা, জরুরি বহির্গমন ও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয় বলে অভিযোগ উঠেছে।
শিখা ইন-এর অগ্নিকাণ্ডের পর এসব হোটেলের নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে এসেছে। প্রশাসনের পরিদর্শন ও হোটেল বন্ধের সিদ্ধান্তের পাশাপাশি বিকল্প আবাসনের ভাড়া বেড়ে যাওয়ায় কলকাতায় চিকিৎসা ও ভ্রমণে যাওয়া বাংলাদেশিদের ভোগান্তি আরও বাড়ছে।








