দুই যুগ ধরে ইরাকের তেল বিক্রির টাকা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে

ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের শেষ ধাপ বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সম্পন্ন হয়েছে। দুই দশকের বেশি সময়ের সামরিক উপস্থিতির অবসানের মধ্যেও দেশটির তেল আয়ের ডলার ব্যবস্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়ে গেছে। ২০০৩ সালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন আগ্রাসনের পর যে আর্থিক কাঠামো তৈরি হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ এখনো নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের মাধ্যমে ব্যবস্থাপিত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
২০০৩ সালের আগ্রাসনের পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন কোয়ালিশন প্রভিশনাল অথরিটি (সিপিএ) ইরাকের তেল আয়ের অর্থ ব্যবস্থাপনার জন্য ডেভেলপমেন্ট ফান্ড ফর ইরাক (ডিএফআই) গঠন করে। তেল বিক্রির অর্থ পুনর্গঠন ও উন্নয়নকাজে ব্যবহারের পাশাপাশি সাদ্দাম হোসেনের শাসনামলের সঙ্গে সম্পর্কিত বিভিন্ন মামলা ও দাবির ঝুঁকি থেকে অর্থ সুরক্ষিত রাখাও ছিল এই ব্যবস্থার অন্যতম উদ্দেশ্য।
ডিএফআই নিউইয়র্ক ফেডে রাখা হয়। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশ এ ব্যবস্থা চালুর জন্য নির্বাহী আদেশ জারি করেছিলেন। পরবর্তী মার্কিন প্রেসিডেন্টরা সেটি নবায়ন করে আসেন। সময়ের সঙ্গে ডিএফআই ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি হিসাবে রূপ নেয়, যা নিউইয়র্ক ফেডেই পরিচালিত হচ্ছে।
ইরাকের ওপর এর প্রভাব কতটা
বিজ্ঞাপন
ইরাকের রাষ্ট্রীয় আয়ের প্রধান উৎস তেল। দেশটির বাজেটের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল থেকে আসে। ফলে তেল বিক্রির অর্থ কীভাবে ব্যবস্থাপিত হবে এবং ডলারে দেশটির প্রবেশাধিকার কীভাবে পরিচালিত হবে, তা ইরাকের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
২০২০ সালে ইরাক সরকার মার্কিন সেনাদের প্রত্যাহারের দাবি তুললে ওয়াশিংটন নিউইয়র্ক ফেডে থাকা ইরাকের তহবিলে প্রবেশাধিকার সীমিত করার হুমকি দিয়েছিল বলে রয়টার্স জানিয়েছে। শেষ পর্যন্ত বাগদাদ সেই অবস্থান থেকে সরে আসে। তবে সামরিক উপস্থিতির শুরুর সময়ের তুলনায় নিজেদের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় ইরাকের নিয়ন্ত্রণ অনেক বেড়েছে।
কেন এত বছরেও ব্যবস্থা বদলায়নি
বিজ্ঞাপন
ইরাকি সরকারি কর্মকর্তাদের মতে, নিউইয়র্ক ফেডের মাধ্যমে তেল আয়ের অর্থ ব্যবস্থাপনা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করেছে। এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ইরাকের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর আস্থা তৈরি হয়েছে এবং বাণিজ্য ও আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় মার্কিন ডলারে প্রবেশাধিকার সহজ হয়েছে।
এ ছাড়া ঋণদাতাদের দাবি, মামলা-মোকদ্দমা ও অন্যান্য আর্থিক ঝুঁকি থেকে তেল আয়ের অর্থ সুরক্ষিত রাখতেও এই ব্যবস্থা ভূমিকা রেখেছে। বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা এবং ইরাকের অর্থনীতির ওপর আস্থা বজায় রাখার ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা রয়েছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।
তবে এই ব্যবস্থার কারণে ইরাকের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক প্রভাবও বজায় রয়েছে। বিশেষ করে ইরানের সঙ্গে যুক্ত গোষ্ঠীগুলোর অর্থনৈতিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণে ডলার ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গত বছর ইরানের হয়ে অর্থপাচারের অভিযোগে ইরাকের কয়েকটি ব্যাংক ও ব্যক্তির ওপর যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল।
বিজ্ঞাপন
ডলার সংকটে কালোবাজার
মার্কিন ডলারের সরবরাহে কঠোর বিধিনিষেধের কারণে ইরাকে একটি সমান্তরাল অনানুষ্ঠানিক ডলার বাজার তৈরি হয়েছে। এতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্ধারিত সরকারি বিনিময় হার এবং কালোবাজারের দামের মধ্যে ব্যবধান তৈরি হয়েছে।
ইরাকের কেন্দ্রীয় ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে ডলার সরবরাহের প্রধান মাধ্যম হিসেবে ‘ডলার নিলাম’ বা ফরেন কারেন্সি উইন্ডো ব্যবহার করত। বেসরকারি ব্যাংক ও মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠানগুলো ইরাকি দিনার দিয়ে মার্কিন ডলার কেনার জন্য এতে অংশ নিত।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে ২০২৫ সালের শুরুতে ইরাক আনুষ্ঠানিকভাবে এই ডলার নিলাম ব্যবস্থা বন্ধ করে দেয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা পক্ষগুলোর কাছে ডলার পাচারের অভিযোগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মধ্যে এই ব্যবস্থা বন্ধ করা হয়।
এখন কোথায় ইরাকের তেল বিক্রির অর্থ
মার্কিন সেনাদের ইরাক থেকে প্রত্যাহার সম্পন্ন হলেও দেশটির তেল বিক্রির ডলার এখনো নিউইয়র্কের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের হেফাজতে রয়েছে। অর্থাৎ ইরাকের মাটিতে মার্কিন সামরিক উপস্থিতির অবসান হলেও দেশটির তেল আয়ের ডলার ব্যবস্থাপনায় নিউইয়র্ক ফেডের ভূমিকা অব্যাহত রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ফলে ২৩ বছর পর ইরাকের সামনে সামরিক উপস্থিতি ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়ে গেছে—নিজস্ব তেল আয়ের অর্থ ব্যবস্থাপনায় দেশটি কতটা আর্থিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পারে। মার্কিন সেনা প্রত্যাহার ইরাকের নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় তৈরি করলেও তেল আয়ের ডলার ব্যবস্থাপনার বর্তমান কাঠামো এখনো দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
সূত্র: রয়টার্স








