সুনামিতে স্ত্রী নিখোঁজ, ১৫ বছর ধরে সমুদ্রের গভীরে খুঁজছেন স্বামী

২০১১ সালের ভয়াবহ সুনামিতে স্ত্রী ইউকোকে হারিয়েছিলেন জাপানের ইয়াসুও তাকামাতসু। দীর্ঘ ১৫ বছর পেরিয়ে গেলেও প্রিয়জনকে খুঁজে পাওয়ার আশা ছাড়েননি তিনি। সেই আশাতেই মাসে দুবার সমুদ্রে ডুব দেন ইয়াসুও। এখন পর্যন্ত ৭৬৩ বার পানির নিচে নেমেছেন তিনি। প্রতিবারই তাঁর মনে হয়, হয়তো এবারই সমুদ্রের কোথাও খুঁজে পাবেন হারিয়ে যাওয়া স্ত্রীকে।
বিজ্ঞাপন
জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় মিয়াগি প্রিফেকচারের ওনাগাওয়া বন্দর থেকে নৌকায় করে সমুদ্রে যান ইয়াসুও। স্ত্রীর কোনো চিহ্ন খুঁজে পাওয়ার আশায় পানির গভীরে তল্লাশি চালান তিনি। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তাঁর এই অনুসন্ধান থামেনি।
২০১১ সালের ১১ মার্চ জাপানের উত্তর-পূর্ব উপকূলে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর আঘাত হানে ভয়াবহ সুনামি। বিশাল ঢেউ উপকূলের প্রায় ১০ কিলোমিটার ভেতরে প্রবেশ করে। বিস্তীর্ণ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। প্রাণ হারান বহু মানুষ, নিখোঁজ হন হাজারো মানুষ।
সেই দিন সকালে স্ত্রী ইউকোকে তাঁর কর্মস্থলে পৌঁছে দিয়েছিলেন ইয়াসুও। বিদায়ের আগে দুজনের মধ্যে রাতের খাবার নিয়ে কথা হয়েছিল। কিন্তু স্বাভাবিক সেই সকালই পরে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতিতে পরিণত হয়।
বিজ্ঞাপন
সুনামির সতর্কসংকেত বেজে উঠলে ইউকো তাঁর ১২ সহকর্মীর সঙ্গে ভবনের ছাদে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে স্বামীকে একটি বার্তা পাঠান। তাতে লেখা ছিল, তুমি কি নিরাপদে আছ? আমি বাড়ি যেতে চাই।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
স্ত্রীর বার্তা পেয়ে ইয়াসুও ভেবেছিলেন, ইউকো হয়তো নিরাপদে আছেন। কিন্তু পরদিন আশ্রয়কেন্দ্রে গিয়ে তাঁকে খুঁজে পাননি। পরে জানতে পারেন, সুনামির পানিতে ভেসে গেছেন তাঁর স্ত্রী। সেই থেকে ইউকোর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
প্রায় দুই বছর ধরে জাপানের উপকূলরক্ষী বাহিনীর ডুবুরিদের নিখোঁজ মানুষ ও তাঁদের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র খুঁজতে দেখেছেন ইয়াসুও। কিন্তু স্ত্রীর কোনো খোঁজ না পেয়ে একসময় নিজেই ডুব দেওয়া শেখার সিদ্ধান্ত নেন।
বিজ্ঞাপন
ইয়াসুওর মনে হয়েছিল, যত দিন তিনি সমুদ্রে ডুব দেওয়া চালিয়ে যাবেন, তত দিন স্ত্রীকে খুঁজে পাওয়ার একটি সম্ভাবনা থাকবে। সেই বিশ্বাস থেকেই শুরু হয় তাঁর দীর্ঘ অনুসন্ধান।
মাস্ক, অক্সিজেনের ট্যাংক ও ওজন বেল্ট পরে সমুদ্রের গভীরে নামেন তিনি। পানির নিচে ছড়িয়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের সামনে পড়লে বারবার মনে পড়ে ইউকোর কথা। কখনো তাঁর মনে হয়, ধ্বংসস্তূপের কোথাও আটকে পড়ে হয়তো স্ত্রীর আর ওপরে উঠে আসার সুযোগ হয়নি। এমন চিন্তা তাঁকে আবেগাপ্লুত করে তোলে।
ইউকোর দেহাবশেষ কখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ফলে প্রচলিত রীতিতে স্ত্রীর কবরের কাছে গিয়ে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগও পাননি ইয়াসুও।
বিজ্ঞাপন
তাঁর কাছে সমুদ্রে ডুব দেওয়া এখন শুধু নিখোঁজ একজন মানুষকে খোঁজার চেষ্টা নয়, বরং প্রিয়জনের সঙ্গে মানসিকভাবে সংযুক্ত থাকার একটি ব্যক্তিগত উপায়।
তিনি জানান, বারবার সমুদ্রে নামতে নামতে তাঁর মনে হয়েছে, ইউকো হয়তো আশপাশেই কোথাও আছেন। কবরের কাছে যাওয়ার অভিজ্ঞতার সঙ্গে এর পার্থক্য রয়েছে। পানির নিচে নামলে তাঁর মনে হয়, যেন স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন।
স্ত্রীকে হারানোর পরও সমুদ্রের প্রতি ঘৃণা জন্মায়নি ইয়াসুওর। তাঁর মতে, সমুদ্র যেমন ভয়ংকর হতে পারে, তেমনি এর সৌন্দর্যও অসাধারণ।
বিজ্ঞাপন
সমুদ্রের তলদেশে এখনো পড়ে আছে আধভাঙা গাড়ি ও নানা ধরনের ধ্বংসাবশেষ। সময়ের সঙ্গে সেগুলোর কিছু অংশ কৃত্রিম প্রবালপ্রাচীরের মতো হয়ে উঠেছে। সেখানে মাছ আসে, আশ্রয় নেয় এবং ডিম পাড়ে।
ধ্বংসের চিহ্নের মধ্যেও নতুন প্রাণের উপস্থিতি ইয়াসুওকে প্রকৃতির পরিবর্তনের কথা মনে করিয়ে দেয়। একদিকে সমুদ্র তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় মানুষটিকে কেড়ে নিয়েছে, অন্যদিকে সেই সমুদ্রের বুকেই তিনি খুঁজে পান নতুন জীবনের অস্তিত্ব।
দীর্ঘ ১৫ বছর পরও স্ত্রীর সঙ্গে আবার দেখা হওয়ার কল্পনা করেন ইয়াসুও। এমনকি তাঁদের পুনর্মিলন নিয়ে রসিকতাও করেছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
ইয়াসুওর ধারণা, ইউকোর সঙ্গে আবার দেখা হলে স্ত্রী হয়তো প্রথমেই বলবেন, “তোমার বয়স হয়ে গেছে।”
বেদনাদায়ক স্মৃতির মধ্যেও এমন একটি কল্পনা তাঁর অনুসন্ধানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। বছরের পর বছর ধরে সমুদ্রে নেমে স্ত্রীর খোঁজ চালিয়ে যাওয়া ইয়াসুওর কাছে প্রতিটি ডুবই নতুন আশার সুযোগ।
সুনামির ক্ষত বহু মানুষের জীবন থেকে কেড়ে নিয়েছে প্রিয়জন, ঘরবাড়ি ও স্বাভাবিক জীবনের নিশ্চয়তা। ইয়াসুও তাকামাতসুর জীবনে সেই বিপর্যয়ের স্মৃতি আজও অমলিন। তবু তিনি সমুদ্রে যাওয়া বন্ধ করেননি। হয়তো কোনো একদিন খুঁজে পাবেন ইউকোকে—এই আশাতেই আবারও পানির গভীরে নামবেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
সূত্র: বিবিসি








