ছাত্র আন্দোলনের বড় জয়, সার্বিয়ায় নতুন দিনের সূচনা

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যে বড় ধাক্কা খেয়েছে সার্বিয়ার ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক শিবির। দুর্নীতি, সরকারি অব্যবস্থাপনা ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে প্রায় দুই বছর ধরে চলা ছাত্র আন্দোলন এবার নির্বাচনে বড় সাফল্য পেয়েছে। আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ এগিয়ে থাকায় দেশটির রাজনীতিতে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
রবিবার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, সার্বিয়ার ২৫০ আসনের পার্লামেন্টে স্টুডেন্ট লিস্ট ১৩৫ থেকে ১৪০টি আসন পেতে পারে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা আলেকসান্দার ভুসিচের নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক শিবিরের আসনসংখ্যা ১০৫-এ নেমে আসতে পারে। চূড়ান্ত ফল ঘোষণার আগেই পরাজয় স্বীকার করেন ভুসিচ।
নির্বাচনের ফল সামনে আসার পর রাজধানী বেলগ্রেডসহ বিভিন্ন শহরে ছাত্র আন্দোলনের সমর্থকেরা রাস্তায় নেমে উল্লাস করেন। গাড়ির হর্ন ও স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা। রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে ভোটার উপস্থিতি ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ, যা ১৯৯২ সালের পর সর্বোচ্চ।
সার্বিয়ায় ছাত্র আন্দোলনের সূত্রপাত ২০২৪ সালের ১ নভেম্বর। সেদিন নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। এ দুর্ঘটনার পর সরকারি অব্যবস্থাপনা, দুর্নীতি ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে ব্যাপক প্রশ্ন ওঠে।
বিজ্ঞাপন
ঘটনার প্রতিবাদে রাজপথে নামেন শিক্ষার্থীরা। পরে আন্দোলনে যোগ দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, শ্রমিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণের ফলে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে।
এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় গড়ে ওঠে ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ নামের নির্বাচনী প্ল্যাটফর্ম। দুর্নীতি দমন, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাকে সামনে রেখে নির্বাচনে অংশ নেয় তারা।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
১৯৭০ সালে বেলগ্রেডে জন্ম নেওয়া আলেকসান্দার ভুসিচ ১৯৯৩ সালে উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা ভয়েস্লাভ শেশেলের সার্বিয়ান র্যাডিক্যাল পার্টিতে যোগ দিয়ে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন। পরে দল ছেড়ে ২০০৮ সালে তোমিস্লাভ নিকোলিচের সঙ্গে সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন।
২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী এবং ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর থেকে সার্বিয়ার রাজনীতিতে তার প্রভাব ছিল ব্যাপক। তার শাসনামলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিদেশি বিনিয়োগ এবং মহাসড়ক নির্মাণ ও সম্প্রসারণে অগ্রগতি হয়েছে। তবে একই সময়ে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, দুর্নীতি এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে জনমনে অসন্তোষও বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
নোভি সাদের রেলস্টেশনের দুর্ঘটনা সেই অসন্তোষকে আরও তীব্র করে তোলে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আধিপত্যের বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত নির্বাচনী সাফল্যের পথ তৈরি করেছে।
নির্বাচনের ফল সার্বিয়ার পররাষ্ট্রনীতির ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন আলোচনা তৈরি করেছে। ভুসিচের নেতৃত্বে দেশটি রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখার পাশাপাশি ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদ অর্জনের চেষ্টা চালিয়েছে।
তবে ছাত্র আন্দোলনের সাফল্য মানেই রাশিয়ার সঙ্গে সার্বিয়ার সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে যাওয়া নয়। নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে সহযোগিতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কারের মধ্যে কীভাবে ভারসাম্য বজায় রাখবে, তা নির্ভর করবে তাদের ভবিষ্যৎ নীতি ও পদক্ষেপের ওপর।
বিজ্ঞাপন
সার্বিয়া এখনো ইউরোপীয় ইউনিয়ন, শেনজেন অঞ্চল কিংবা ন্যাটোর সদস্য নয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যপদের পথে অগ্রসর হতে দেশটিকে দুর্নীতি দমন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে অগ্রগতি দেখাতে হবে।
ছাত্র আন্দোলনের এই নির্বাচনী সাফল্য সার্বিয়ার রাজনৈতিক ব্যবস্থায় কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, এখন সেদিকেই নজর থাকবে। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলনের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ পায় কি না, তা-ই হবে নতুন নেতৃত্বের সামনে বড় পরীক্ষা।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান








