ছাত্র আন্দোলনে আরও এক প্রভাবশালী বিশ্বনেতার পতন

সার্বিয়ার দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী নেতা আলেক্সান্দার ভুসিচের রাজনৈতিক আধিপত্যে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। প্রায় দুই বছর ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের পর আগাম পার্লামেন্ট নির্বাচনে তাঁর নেতৃত্বাধীন জোটকে হারিয়েছে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’। নির্বাচনে পরাজয়ের কথা স্বীকার করেছেন ভুসিচ।
বিজ্ঞাপন
রবিবার (২৫ অক্টোবর) অনুষ্ঠিত নির্বাচনের নমুনা গণনার ফল অনুযায়ী, ২৫০ আসনের পার্লামেন্টে ভুসিচের নেতৃত্বাধীন জোট পেতে পারে ১০৫টি আসন। বিপরীতে, স্টুডেন্ট লিস্টের সম্ভাব্য আসনসংখ্যা ১৩৫ থেকে ১৪০টি। ভোটার উপস্থিতিও ছিল ৩০ বছরের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ।
ফলাফলের এই চিত্র সামনে আসার পর সমর্থকদের উদ্দেশে ভুসিচ বলেন, নির্বাচনে তাঁদের পরাজয় হয়েছে—এটি স্পষ্ট।
২০২৪ সালের ১ নভেম্বর সার্বিয়ার নোভি সাদ শহরের একটি রেলস্টেশনের ছাউনি ধসে ১৬ জন নিহত হন। এই দুর্ঘটনার পর সরকারের জবাবদিহি ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুরু করেন শিক্ষার্থীরা।
বিজ্ঞাপন
ধীরে ধীরে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, চিকিৎসক, শ্রমিকসহ সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে। একপর্যায়ে বিক্ষোভের এই ধারা ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’ নামে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপ নেয়।
দুর্নীতি দমন, সরকারি প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করা এবং নাগরিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা ছিল তাদের নির্বাচনী অঙ্গীকারের অন্যতম বিষয়। নির্বাচনী প্রচারে আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন নোভি সাদের মেডিসিন অনুষদের অধ্যাপক ইলিয়া সার্দানোভিচ।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
অন্যদিকে, ভুসিচ আন্দোলনকারীদের ‘ব্লকেডার’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। তাঁর অভিযোগ ছিল, বিক্ষোভকারীরা সার্বিয়াকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছেন।
বিজ্ঞাপন
১৯৭০ সালে বেলগ্রেডে জন্ম নেওয়া ভুসিচ বেলগ্রেড বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদ থেকে স্নাতক হন। ১৯৯৩ সালে উগ্র জাতীয়তাবাদী নেতা ভয়েস্লাভ শেশেলের সার্বিয়ান র্যাডিক্যাল পার্টিতে যোগ দেওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়।
১৯৯০-এর দশকে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে জাতীয়তাবাদী অবস্থান স্পষ্ট ছিল। ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে বসনিয়ার স্রেব্রেনিৎসা গণহত্যার নয় দিন পর সার্বিয়ার পার্লামেন্টে দেওয়া তাঁর একটি বক্তব্য বিশেষভাবে আলোচিত হয়। ওই বক্তব্যে তিনি মুসলিমদের বিরুদ্ধে সহিংসতার হুমকি দিয়েছিলেন।
পরবর্তী সময়ে র্যাডিক্যাল পার্টি ছেড়ে ভুসিচ ও তোমিস্লাভ নিকোলিচ ২০০৮ সালে সার্বিয়ান প্রগ্রেসিভ পার্টি (এসএনএস) প্রতিষ্ঠা করেন। দলটি পরে ইউরোপের মূলধারার রাজনীতির কাছাকাছি যাওয়ার চেষ্টা করে।
বিজ্ঞাপন
২০১২ সালে দুর্নীতি, সংগঠিত অপরাধ ও আগের সরকারের অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসে এসএনএস। ভুসিচ ২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রথম উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৪ সালে প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০১৭ সালে সার্বিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ২০২২ সালে তিনি পুনর্নির্বাচিত হন।
সার্বিয়ার সাংবাদিক সাফেতা বিসেভাচের মতে, ভুসিচের রাজনৈতিক উত্থানের শুরুর দিকে দলের সহপ্রতিষ্ঠাতা তোমিস্লাভ নিকোলিচ সাধারণ মানুষের কাছে বেশি জনপ্রিয় ছিলেন। সে সময় ভুসিচ মূলত দল সংগঠিত করার দায়িত্ব পালন করতেন।
ক্ষমতায় আসার পর দুর্নীতি দমনে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও এসব পদক্ষেপের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ২০১২ সালে ব্যবসায়ী মিরোস্লাভ মিসকোভিচ ও তাঁর ছেলে মার্কোকে আর্থিক অনিয়ম ও কর ফাঁকির সন্দেহে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাঁরা খালাস পান। পরে রাষ্ট্রকে তাঁদের ক্ষতিপূরণও দিতে হয়।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
বিসেভাচের ভাষ্য অনুযায়ী, দুর্নীতি দমনে সীমিত অগ্রগতির পাশাপাশি সরকার রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বাড়িয়েছে।
বিজ্ঞাপন
ছাত্র আন্দোলনের চাপে ভুসিচ সেপ্টেম্বরে পদত্যাগ করেন এবং আগাম নির্বাচনের ঘোষণা দেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাঁর প্রেসিডেন্ট হিসেবে মেয়াদ ২০২৭ সাল পর্যন্ত থাকার কথা থাকলেও দল ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণে তাঁর প্রভাব ছিল ব্যাপক।
২০১২ সালের পর ভুসিচের নেতৃত্বে সার্বিয়ার অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি হয়েছে। রয়টার্সের বরাতে প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বেকারত্বের হার ২৬ শতাংশ থেকে কমে ৮ থেকে ৯ শতাংশে নেমেছে।
একই সময়ে সার্বিয়ার নামমাত্র মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রায় তিন গুণ বেড়ে ৯০ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে। বিদেশি সরাসরি বিনিয়োগও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১২ সালে এর পরিমাণ ছিল প্রায় ৮০০ মিলিয়ন ইউরো, যা ২০২৪ সালে রেকর্ড ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছায়। এ সময়ে দেশটিতে আধুনিক মহাসড়কের নেটওয়ার্কও সম্প্রসারিত হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি। মজুরি বাড়লেও বেড়েছে জীবনযাত্রার ব্যয়। সরকারি ঋণও অর্থনীতি নিয়ে বিতর্কের অন্যতম বিষয়ে পরিণত হয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী দুস্কো রাদোসাভলিয়েভিচের মতে, শিক্ষার্থীরা মূলত নাগরিকদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ প্রকাশের সুযোগ তৈরি করেছেন। তাঁর অভিযোগ, গত এক দশকে সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়েছে। রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নজরদারিতে বেশি মনোযোগ দিয়েছে এবং গণমাধ্যমে স্বাধীন চিন্তার পরিসর সংকুচিত হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলনের নির্বাচনী সাফল্য সার্বিয়ার রাজনীতিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে। দুর্নীতি দমন, সরকারি প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের সমর্থন পেয়েছে স্টুডেন্ট লিস্ট।
বিজ্ঞাপন
দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় প্রভাব বিস্তার করা ভুসিচের জন্য এই নির্বাচনী ফল বড় রাজনৈতিক ধাক্কা। একই সঙ্গে ফলাফলটি দেখিয়েছে, দুর্নীতি ও জবাবদিহি নিয়ে নাগরিক অসন্তোষ নির্বাচনী রাজনীতিতেও বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
সূত্র: আল-জাজিরা








