গাজায় যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে মানুষের ঘরবাড়ি, বৃষ্টি নিল তাঁবু

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় ইসরায়েলের দীর্ঘদিনের যুদ্ধ কেড়ে নিয়েছে মানুষের ঘরবাড়ি। এবার ভারি বৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় শেষ আশ্রয়টুকুও হারাচ্ছেন বাস্তুচ্যুত বাসিন্দারা। গত দুই দিনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে উপত্যকাটিতে অন্তত ৭০ হাজার তাঁবু প্লাবিত হয়েছে। এতে হাজার হাজার পরিবার নতুন করে আশ্রয়সংকটে পড়েছে।
বিজ্ঞাপন
যুদ্ধের কারণে আগে থেকেই বিপর্যস্ত গাজায় উদ্ধার ও জরুরি সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করতে হিমশিম খাচ্ছেন কর্মীরা। অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি এবং প্রয়োজনীয় উদ্ধার সরঞ্জামের অভাবে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
শুক্রবার গভীর রাত থেকে শুরু হওয়া ঝড়-বৃষ্টিতে গাজার বিভিন্ন এলাকায় কয়েক ডজন ভবনের দেয়াল ধসে পড়েছে। গাজার সরকারি গণমাধ্যম কার্যালয়ের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০ লাখ ডলার।
চিকিৎসাসংশ্লিষ্ট সূত্র তুর্কি সংবাদ সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে জানিয়েছে, ইসরায়েলি হামলায় আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত দুটি ভবনের দেয়াল ঝড়ের সময় ধসে পড়ে। এর মধ্যে একটি ভবনের ঢেউটিন উড়ে গিয়ে পাঁচ ফিলিস্তিনি আহত হয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
গাজা সিটি পৌরসভার মুখপাত্র হোসনি মুহান্না জানিয়েছেন, যেসব পরিবারের তাঁবু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের জন্য বিকল্প আশ্রয়ের ব্যবস্থা নেই। বর্তমানে প্রায় ১০ লাখ বাসিন্দা ও বাস্তুচ্যুত মানুষ গাজা সিটির মাত্র ৩০ শতাংশ এলাকায় বসবাস করছেন। ফলে যুদ্ধের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মুহান্না জানান, মাত্র ১২ ঘণ্টায় গাজা সিটিতে ৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে। শহরটির বার্ষিক মোট বৃষ্টিপাতের প্রায় ১৫ শতাংশ এই অল্প সময়েই হয়েছে। প্রবল বাতাসে অনেক তাঁবু উড়ে গেছে, আবার কিছু ছিঁড়ে গেছে। বৃষ্টির পানিতে ডুবে গেছে অস্থায়ী আশ্রয়শিবিরগুলো।
জলাবদ্ধ সড়ক, ভূমিক্ষয় ও নালা বন্ধ হয়ে যাওয়ার বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষের কাছে প্রায় ২৫০টি অভিযোগ জমা পড়েছে। সীমিত সক্ষমতা নিয়েই বিভিন্ন এলাকায় পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করছেন পৌরসভার কর্মীরা।
বিজ্ঞাপন
গাজা সিটির ২৭০টি শরণার্থীশিবির ও আশ্রয়কেন্দ্র বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে বলেও সতর্ক করেছেন মুহান্না। যুদ্ধের সময় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শহরটির পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার কার্যক্ষমতা কমে মাত্র ২০ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে নিচু এলাকাগুলোতে জলাবদ্ধতা ও বন্যার আশঙ্কা আরও বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে শীতকালীন সামগ্রী, ত্রাণ ও ভারী উদ্ধার সরঞ্জাম গাজায় প্রবেশের সুযোগ দিতে সীমান্ত ক্রসিংগুলো সম্পূর্ণ খুলে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের জনসংযোগ পরিচালক আবদুল্লাহ আল-মাজদালাউই জানান, ঝড় শুরু হওয়ার পর থেকে উদ্ধারকর্মীদের কাছে শত শত জরুরি সহায়তার আবেদন এসেছে। পানিতে ডুবে যাওয়া তাঁবু ও আশ্রয়শিবিরের পাশাপাশি বাস্তুচ্যুত মানুষের বসবাসের স্থানের ওপর ধসে পড়ার ঝুঁকিতে থাকা ভবন ও দেয়াল নিয়ে সবচেয়ে বেশি ফোন পেয়েছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, তাৎক্ষণিক প্রাণহানির আশঙ্কা মোকাবিলা করতে পারলেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নতুন আশ্রয়ের ব্যবস্থা করে দেওয়ার মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম ও সক্ষমতা তাদের নেই।
এর আগে গত বৃহস্পতিবার জাতিসংঘের ফিলিস্তিনি শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনআরডব্লিউএ জানিয়েছে, গাজার ১৯ লাখ ৮০ হাজার মানুষের, অর্থাৎ মোট জনসংখ্যার প্রায় ৯৪ শতাংশের আশ্রয় ও অন্যান্য জরুরি সহায়তা প্রয়োজন। সংস্থাটির জুন মাসের জরিপে দেখা গেছে, এসব মানুষের মধ্যে ৫৮ শতাংশের আশ্রয়সংকট গুরুতর কিংবা বিপর্যয়কর পর্যায়ে রয়েছে।
অন্যদিকে, গত অক্টোবর মাসে জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয়বিষয়ক কার্যালয় (ওসিএইচএ) সতর্ক করেছিল, গাজার প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি এমন বাস্তুচ্যুত শিবিরে বসবাস করছেন, যেগুলো মাঝারি থেকে উচ্চমাত্রার বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে। তাঁদের মধ্যে চার লাখের বেশি মানুষ রয়েছেন উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায়।
বিজ্ঞাপন
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া ইসরায়েলের যুদ্ধে গাজার অসংখ্য বাড়িঘর ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও আশ্রয় ও পুনর্গঠনের চাহিদা পূরণে প্রয়োজনীয় সহায়তার ঘাটতি রয়ে গেছে।
এ ছাড়া অস্থায়ী আবাসন নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত বাড়িঘর মেরামতের উপকরণ গাজায় প্রবেশে ইসরায়েলের অব্যাহত বিধিনিষেধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞ থেকে বেঁচে ফেরা হাজারো মানুষের কাছে এখন বৃষ্টিও নতুন দুর্ভোগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।








