Logo

ভোট দিতে ইসরায়েলে ফিরছেন প্রবাসীরা, চাপে নেতানিয়াহু

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
২৬ অক্টোবর, ২০২৬, ২১:৩৭
ভোট দিতে ইসরায়েলে ফিরছেন প্রবাসীরা, চাপে নেতানিয়াহু
ছবি: সংগৃহীত

ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট দিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ৬৭ হাজার ইসরায়েলি নাগরিক দেশে ফিরেছেন। ফিলিস্তিনে দীর্ঘ সামরিক অভিযান, ইরানে হামলা এবং প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকারের কট্টর ডানপন্থী নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষের মধ্যে প্রবাসীদের এই প্রত্যাবর্তন নির্বাচনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

বিজ্ঞাপন

মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস মঙ্গলবার এক প্রতিবেদনে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ফিরে ভোট দিতে আসা এসব নাগরিকের বড় একটি অংশ নেতানিয়াহু ও তাঁর নেতৃত্বাধীন অতি-ডানপন্থী জোটের বিরোধী। তাঁদের অনেকে মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাত এবং সরকারের রক্ষণশীল নীতির পরিবর্তনে ভোট দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভোট দিতে নিউইয়র্ক থেকে ইসরায়েলে এসেছেন মোশে লাভি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) তিনি জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের ওপর তাঁর আস্থা কমে গেছে। ভোটের মাধ্যমে নিজের মতামত প্রকাশ করতে চান তিনি।

লাভির মতে, ইসরায়েল সরকারের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের প্রভাব শুধু দেশের অভ্যন্তরে থাকা নাগরিকদের ওপর পড়ে না; বিদেশে বসবাসরত ইসরায়েলিরাও এর প্রভাব অনুভব করেন। তাই এসব নীতির বিষয়ে মত প্রকাশের জন্য ভোট দেওয়াকে নিজের অধিকার ও দায়িত্ব বলে মনে করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর এটিই প্রথম নির্বাচন। এই নির্বাচনে ভোট দিতে দেশে ফিরেছেন প্রায় ৬৭ হাজার ইসরায়েলি নাগরিক। তাঁদের মধ্যে অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে বসবাস করছেন।

নেতানিয়াহুর বিরোধিতাকারীদের মধ্যে লাভি একা নন। প্রবাসীদের অনেকে মনে করছেন, বর্তমান সরকারের নীতি পরিবর্তন এবং দেশকে ভিন্ন রাজনৈতিক পথে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি করতে এবারের নির্বাচনে অংশ নেওয়া জরুরি।

নির্বাচনের আগে ক্ষমতা ধরে রাখতে নেতানিয়াহু ইরান ও হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে জাতীয়তাবাদী আবেগ জোরদার করার চেষ্টা করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা এবং তাঁর সরকারের অতি-রক্ষণশীল অবস্থানও রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

এসব পদক্ষেপ অতি-রক্ষণশীল ইসরায়েলিদের একটি অংশের সমর্থন পেলেও মধ্যপন্থী নাগরিকদের মধ্যে অসন্তোষ বাড়িয়েছে। বিদেশে বসবাসরত অনেক ইসরায়েলির কাছেও নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব ক্রমেই অগ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছে।

তবে জনমত জরিপে নেতানিয়াহু সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের সঙ্গে প্রায় সমান অবস্থানে রয়েছেন। আইজেনকোট সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াইর লাপিদ ও নাফতালি বেনেটের সঙ্গে জোট গঠন করেছেন।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মাইরাভ জোনজেইন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমস-কে বলেন, ৭ অক্টোবরের হামলার পরসহ বিভিন্ন সময়ে দেশ ছেড়ে যাওয়া অনেক ইসরায়েলি দেশের ভেতরে থাকা মানুষের তুলনায় নিজেদের দেশের প্রতি বৈরিতা ও বিচ্ছিন্নতা আরও তীব্রভাবে অনুভব করছেন। তাঁর মতে, এ কারণে তাঁদের অনেকে ভোটের মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে চাইতে পারেন।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

কানাডার টরন্টোতে বসবাসকারী ইয়েল নাত্রা জানিয়েছেন, গত দুই দশকে তিনি ইসরায়েলের কোনো নির্বাচনে ভোট দেননি। তবে দেশটিতে কট্টর ডানপন্থীদের উত্থান তাঁকে এবার ভোট দিতে দেশে ফিরতে উৎসাহিত করেছে।

নিজেকে ডানপন্থী মতাদর্শের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া নাত্রা বলেন, নব্বইয়ের দশকে তিনি নেতানিয়াহুকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু ৭ অক্টোবরের হামলার জন্য ব্যর্থতার দায় নিতে নেতানিয়াহুর অনীহা এবং অতি-রক্ষণশীল ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর সমর্থন নাত্রার অবস্থান বদলে দিয়েছে।

নাত্রার ভাষায়, “আমি যে ইসরায়েলে বড় হয়েছি, তা হারিয়ে যাচ্ছে। এবার যদি পরিস্থিতির পরিবর্তন না হয়, তবে কী ঘটবে তা জানি না।”

বিজ্ঞাপন

নাত্রার ছোট বোন তামার ইচিলভের অভিযোগ, গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষ বাড়িয়ে তুলেছে। তাঁর মতে, এ পরিস্থিতিও তাঁকে ভোট দেওয়ার জন্য ইসরায়েলে ফিরতে অনুপ্রাণিত করেছে।

যুক্তরাষ্ট্র থেকে চার আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে ভোট দিতে ইসরায়েলে এসেছেন হাদার সাসকিন্দ। তাঁর লক্ষ্য, দেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি সমর্থন জানানো।

এপিকে সাসকিন্দ বলেন, “ইসরায়েল সংকটের গর্তে পড়েছে এবং নেতানিয়াহু ও তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিদিন গর্তটিকে আরও গভীর করছে।” তিনি আরও বলেন, “নতুন সরকারের প্রথম কাজ হবে কোদালটি হাত থেকে নামিয়ে রাখা।”

বিজ্ঞাপন

সাসকিন্দ চান, নতুন সরকার গাজা ও পশ্চিম তীর নিয়ে বর্তমান নীতি পরিবর্তন করুক, বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করুক এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে আনুক।

দ্য টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিশাল লেভিত ও গিলি শাভিত নামের এক যুগল নির্বাচনের আগের দিন বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজন করেছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রায় ৩০ জন অতিথি যেন বিয়েতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।

৪৪ বছর বয়সী এতি উইসোটজকি কোহেন জানিয়েছেন, ইসরায়েলে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির অবনতি এবং উদারপন্থী মতামত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হওয়ায় গত বছর তিনি স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান। তবে নির্বাচনে ভোট দিতে আবারও দেশে ফিরেছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের ‘১২ দিনের যুদ্ধ’-এর সময় তাঁর মনে হয়েছে, ক্ষমতায় টিকে থাকতে নেতানিয়াহুর সরকার যেকোনো পদক্ষেপ নিতে পারে।

কোহেন বলেন, “তারা ইসরায়েলি জনগণকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে দেখছে। আমি ভবিষ্যতে দেশে ফিরে এসে স্থায়ী হতে চাই, কিন্তু নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলে তা কঠিন হবে।”

এক দশকেরও বেশি সময় আগে কানাডায় চলে যাওয়া জোরিক নিতজানও ভোট দিতে ইসরায়েলে ফিরেছেন। তাঁর মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক আন্দোলনকে পরাজিত করে দেশকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার জন্য এবারের নির্বাচনই শেষ সুযোগ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

প্রবাসী ভোটারদের এই প্রত্যাবর্তন নির্বাচনে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা ভোটের ফল প্রকাশের পরই স্পষ্ট হবে। তবে তাঁদের বক্তব্য থেকে বোঝা যাচ্ছে, ইসরায়েলের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি, গাজা ও পশ্চিম তীরের নীতি এবং নেতানিয়াহুর নেতৃত্ব নিয়ে বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের একাংশের মধ্যে গভীর অসন্তোষ তৈরি হয়েছে।

সূত্র: ফার্স্টপোস্ট, দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও দ্য টাইমস।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD