অস্ট্রেলিয়া বসে চীনে ক্যানসারের অস্ত্রোপচার করলেন চিকিৎসক

অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে বসে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরে চীনের সাংহাইয়ে রোবট নিয়ন্ত্রণ করে ক্যানসারের অস্ত্রোপচার করেছেন শল্যচিকিৎসক রুবান থানিগাসালাম। দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটিক অস্ত্রোপচারের এই প্রদর্শনী চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার পথ খুলে দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
অস্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম সেভেন নিউজকে চিকিৎসক থানিগাসালাম জানিয়েছেন, এই প্রযুক্তির মাধ্যমে ভৌগোলিক দূরত্ব পেরিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সেবা রোগীদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব হতে পারে। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যন্ত অঞ্চলে বসবাসকারী রোগীদের জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
থানিগাসালামের ভাষায়, এটি একটি যুগান্তকারী অস্ত্রোপচার। অস্ট্রেলিয়ার আয়তন অনেক বড় হওয়ায় দেশটির বিভিন্ন শহর ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের পক্ষে উচ্চ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত রোবটিক সার্জনের সেবা পাওয়া সব সময় সহজ নয়। দূর থেকে রোবট নিয়ন্ত্রণের প্রযুক্তি সেই বাধা কমাতে সহায়তা করতে পারে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, এখন অনেক রোগী অস্ত্রোপচারের জন্য নিজ শহর ছেড়ে সিডনিতে আসেন। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি কার্যকরভাবে চালু করা গেলে রোগীরা নিজ শহরে থেকেই বিশেষজ্ঞ সার্জনের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করানোর সুযোগ পেতে পারেন।
বিজ্ঞাপন
দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রোপচারে চিকিৎসক একটি নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে রোবটের যন্ত্রপাতি পরিচালনা করেন। নেটওয়ার্কের সাহায্যে চিকিৎসকের নির্দেশনা রোগীর কাছে থাকা রোবটের কাছে পৌঁছায়। ফলে সার্জন ও রোগী আলাদা শহর কিংবা দেশেও অবস্থান করতে পারেন।
প্রদর্শনীর আগে থানিগাসালাম জানিয়েছিলেন, এ কাজে ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করা হচ্ছে। এ ধরনের অস্ত্রোপচারে চিকিৎসকের নির্দেশনা পাঠানো এবং রোবটের প্রতিক্রিয়া ফিরে আসার মধ্যে বিলম্ব বা ল্যাটেন্সি কম রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে, আদর্শ পরিস্থিতিতে এই বিলম্ব ৫০ মিলিসেকেন্ডের কম হওয়া উচিত। এতে চিকিৎসক রোবটের প্রতিক্রিয়ায় যতটা সম্ভব কম দেরি অনুভব করবেন।
বিজ্ঞাপন
অস্ত্রোপচারের আগে নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা যাচাই করতে একাধিক পরীক্ষা চালানো হয়। মূল সংযোগে সমস্যা দেখা দিলে ব্যবহার করার জন্য বিকল্প সংযোগের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল বলে জানান তিনি।
প্রদর্শনী শেষে নিজের অভিজ্ঞতা নিয়ে সন্তোষ প্রকাশ করেন থানিগাসালাম। তিনি জানান, সিডনিতে বসেই সাংহাইয়ে থাকা রোবটটি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়েছে এবং অস্ত্রোপচারটি ভালোভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুই শহরের মধ্যে প্রায় ৭ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দূরত্ব থাকলেও নেটওয়ার্কে ল্যাটেন্সি ছিল প্রায় ১৫০ মিলিসেকেন্ড। তাঁর দাবি, রোবটের প্রতিক্রিয়ার গতিতে এমন কোনো পার্থক্য তাঁরা অনুভব করেননি, যা কাজের ক্ষেত্রে সমস্যা তৈরি করেছে।
বিজ্ঞাপন
প্রত্যাশার তুলনায় ফল কেমন ছিল—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “অবশ্যই। আমি বেশ অবাক হয়েছি এবং এই প্রযুক্তি নিয়ে আরও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার অপেক্ষায় আছি।”
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
তবে ১৫০ মিলিসেকেন্ডের বিলম্বকে আদর্শ ৫০ মিলিসেকেন্ডের সীমার সঙ্গে এক করে দেখার সুযোগ নেই। অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে সংযোগের গতি ছাড়াও স্থিতিশীলতা, নির্ভরযোগ্যতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ।
দূর থেকে রোবট নিয়ন্ত্রণ করে অস্ত্রোপচার করার প্রযুক্তি একেবারে নতুন নয়। সেভেন নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘তৌমাই’ (Toumai) নামের রোবট ব্যবহার করে বিভিন্ন দেশে এ ধরনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এর একটি উদাহরণ হলো, লন্ডনে বসে রোবট নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে জিব্রাল্টারে এক রোগীর প্রোস্টেট ক্যানসারের অস্ত্রোপচার। এ ছাড়া চীন থেকে মরক্কো এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে অ্যাঙ্গোলায়ও দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রোপচার হয়েছে বলে জানিয়েছেন থানিগাসালাম।
তাঁর মতে, গত দুই বছরে এই প্রযুক্তির ব্যবহার ও উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। অস্ট্রেলিয়ায় এ ধরনের অস্ত্রোপচারের প্রদর্শনী করতে পেরে তাঁরা গর্বিত।
সফল প্রদর্শনী হলেও অস্ট্রেলিয়ার হাসপাতালগুলোতে এখনই নিয়মিতভাবে এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করা যাবে না। এর জন্য আরও কিছু অনুমোদন, নিরাপত্তা যাচাই এবং হাসপাতালভিত্তিক প্রস্তুতি প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
থানিগাসালাম জানান, রোবটটি ব্যবহারের অনুমতি তাঁরা পেয়েছেন। তবে হাসপাতালের অভ্যন্তরীণ পরিচালনা ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত অনুমোদন, চিকিৎসাসংক্রান্ত আইনি ছাড়পত্র এবং সম্ভাব্য ক্ষতিপূরণ বা দায়বদ্ধতার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ইনডেমনিটি অনুমোদনের প্রক্রিয়া এখনো সম্পন্ন হয়নি।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর পাশে একটি পৃথক চিকিৎসক দল প্রস্তুত রাখতে হবে। দূর থেকে অস্ত্রোপচার চলাকালে কোনো জটিলতা দেখা দিলে বা তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হলে ওই দল রোগীর পাশে থেকে ব্যবস্থা নেবে।
থানিগাসালামের আশা, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ও অনুমোদন সম্পন্ন হলে আগামী ছয় মাসের মধ্যে অস্ট্রেলিয়ায় এই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হতে পারে। তবে এটি সম্ভাব্য সময়সীমা; বাস্তবে প্রযুক্তিটির ব্যবহার শুরু হওয়া নির্ভর করবে বাকি প্রক্রিয়াগুলো কত দ্রুত সম্পন্ন হয় তার ওপর।
বিজ্ঞাপন
অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন হাসপাতালে দূরনিয়ন্ত্রিত অস্ত্রোপচারের রোবট স্থাপন করতে অর্থায়ন, হাসপাতালের অবকাঠামোগত প্রস্তুতি এবং প্রয়োজনীয় অনুমোদন নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত সার্জন, সহায়ক কর্মী এবং নির্ভরযোগ্য নেটওয়ার্কব্যবস্থা গড়ে তোলাও জরুরি।
এই প্রযুক্তির সম্ভাবনা শুধু দূর থেকে অস্ত্রোপচার করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অভিজ্ঞ সার্জনরা অন্য হাসপাতালে থাকা চিকিৎসকদের দূর থেকে পরামর্শ দিতে, অস্ত্রোপচারের সময় তাঁদের কাজ পর্যবেক্ষণ করতে এবং প্রশিক্ষণ দিতে পারবেন।
থানিগাসালাম বলেন, দূর থেকে তত্ত্বাবধান ও পরামর্শ দেওয়ার পাশাপাশি এই প্রযুক্তির সাহায্যে অন্য সার্জন ও হাসপাতালগুলোকে শেখানো এবং প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব হবে। তাঁর মতে, এর মূল লক্ষ্য হলো রোগীদের সর্বোত্তম চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা।
দূরনিয়ন্ত্রিত রোবটিক অস্ত্রোপচার ব্যাপকভাবে চালু করা গেলে ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত রোগীদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর বিস্তৃত ব্যবহারের আগে প্রযুক্তিগত নিরাপত্তা, নেটওয়ার্কের নির্ভরযোগ্যতা, জরুরি চিকিৎসার প্রস্তুতি এবং আইনি দায়বদ্ধতার বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
সূত্র: সেভেন নিউজ








