হাওরপারে অর্পনা রানীর লড়াই, ছোট দোকানেই চলছে সংসার

স্বামীর অসুস্থতা, সংসারের অভাব আর মেয়েদের পড়াশোনার খরচ—সব মিলিয়ে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি মৌলভীবাজারের অর্পনা রানী সরকার। তবে প্রতিকূলতার কাছে হার না মেনে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ঘরের এক পাশে ছোট্ট মুদিদোকান গড়ে তুলেছেন। সেই দোকানের আয়েই চলছে সংসারের খরচ, চালিয়ে যাচ্ছেন এক মেয়ের পড়াশোনা।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৬ নম্বর একাটুনা ইউনিয়নের ইটা বড়বাড়ি গ্রামে অর্পনা রানীর বাড়ি। কাউয়াদীঘি হাওরপারের এই গ্রামে প্রায় ৮০ থেকে ৮৫টি পরিবারের বসবাস। তাঁদের অধিকাংশই কৃষিজীবী।
অর্পনা রানীর স্বামী জিতেন্দ্র সরকার পেশায় কাঠমিস্ত্রি ছিলেন। হঠাৎ তাঁর পিত্তথলিতে পাথর ধরা পড়লে চিকিৎসার খরচ জোগাতে পরিবারের শেষ সম্বল দুটি গরু বিক্রি করতে হয়। অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসক তাঁকে কিছুদিন ভারী কাজ থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দেন। এতে সংসারের আয় কমে যায়, দেখা দেয় আর্থিক সংকট।
বিজ্ঞাপন
এ অবস্থায় সংসারের হাল ধরতে একটি বেসরকারি সংস্থা থেকে ২০ হাজার টাকা ঋণ নেন অর্পনা। সেই টাকা দিয়ে টিনের বসতঘরের এক পাশে শুরু করেন ছোট্ট একটি মুদিদোকান। ব্যবসার অভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথম ছয়-সাত মাস তাঁকে লোকসান গুনতে হয়। পরে ধীরে ধীরে ব্যবসার ধরন বুঝে উঠতে শুরু করেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে দোকান থেকে মাসে প্রায় পাঁচ থেকে ছয় হাজার টাকা আয় করছেন তিনি। ঋণের কিস্তিও পরিশোধ করেছেন পুরোপুরি।
বিজ্ঞাপন
তাঁর দোকানে লবণ, মরিচ, তেল, বিস্কুট, চিপস, চানাচুরসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় বিভিন্ন পণ্য পাওয়া যায়। গ্রামের মানুষ নিয়মিত এই দোকান থেকে কেনাকাটা করেন। কখনো বাকিতে পণ্য বিক্রি করলেও ক্রেতারা পরে তা পরিশোধ করেন। এভাবেই সীমিত আয়ের মধ্যে সংসার চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন অর্পনা।
তবে এই আয়ে সংসারের সব প্রয়োজন মেটানো কঠিন। দুই মেয়ের মধ্যে একজনের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে গেছে। অন্য মেয়ের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের দৈনন্দিন খরচ সামলাতে হচ্ছে তাঁকে।
জিতেন্দ্র সরকার জানান, প্রায় আড়াই বছর ধরে অসুস্থ থাকায় তিনি নিয়মিত কাজ করতে পারছেন না। এতে পরিবারের আর্থিক সংকট আরও বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
অর্পনা রানী সরকার বলেন, ছোট দোকানটি চালিয়ে সংসারের খরচ ও ছোট মেয়ের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন তিনি। বড় মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাঁর কষ্টেরও শেষ নেই। সীমিত আয়ের মধ্যেই প্রতিদিনের প্রয়োজন মেটাতে হচ্ছে তাঁকে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, হাওরপারের অনেক পরিবারেই অসুস্থতা ও আর্থিক সংকটের কারণে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এসব পরিবারের জন্য সরকারি সহায়তা কিংবা সুদমুক্ত ঋণের ব্যবস্থা করা হলে তাঁদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হতে পারে।
মৌলভীবাজার সদর উপজেলার ৬ নম্বর একাটুনা ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান সৈয়দ রুমেন আলী বলেন, অর্পনা রানীর স্বামী অসুস্থ এবং তাঁর দুই মেয়ে রয়েছে। দোকানের আয় দিয়ে সংসার চালানো কঠিন। এ অবস্থায় তাঁর আর্থিক চাপ কমাতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
অভাবের সঙ্গে প্রতিদিনের এই লড়াইয়ে অর্পনা রানী নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী সংসারকে আগলে রাখার চেষ্টা করছেন। তাঁর প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সহায়তা পেলে মেয়েদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবারের জীবনযাত্রাও কিছুটা সহজ করতে পারবেন।








