Logo

ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় বদলে যাচ্ছে ভারতের গণপরিবহনের চিত্র

profile picture
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
৮ নভেম্বর, ২০২৬, ১৭:০০
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় বদলে যাচ্ছে ভারতের গণপরিবহনের চিত্র
ছবি: সংগৃহীত

ভারতের নগর পরিবহনে দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে উঠছে ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান বা ই-রিকশা। জ্বালানি খরচ কমানো, সরকারি প্রণোদনা এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াতের চাহিদা বাড়ায় দেশটিতে বৈদ্যুতিক অটোরিকশার ব্যবহার ব্যাপকভাবে বাড়ছে। এমনকি ভারতের একটি কারখানা থেকে প্রতি ৯০ সেকেন্ডে একটি করে বৈদ্যুতিক তিন চাকার যান উৎপাদন হয়ে বের হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বৈদ্যুতিক তিন চাকার যানবাহনের বাজারে পরিণত হয়েছে ভারত।

বিজ্ঞাপন

দেশটির মাহিন্দ্রা লাস্ট মাইল মোবিলিটির একটি আধুনিক কারখানায় শ্রমিকদের পাশাপাশি রোবটও উৎপাদন প্রক্রিয়ায় অংশ নিচ্ছে। কোথাও ব্যাটারির প্যাক তৈরি হচ্ছে, কোথাও গাড়ির কাঠামোয় বিভিন্ন যন্ত্রাংশ সংযোজন করা হচ্ছে, আবার কোথাও লাগানো হচ্ছে চাকা। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দেশের ব্যস্ত ও যানজটপূর্ণ সড়কে পরিবহনের চাহিদা মেটাতে চলছে এই কর্মযজ্ঞ।

বাজারের পরিসংখ্যানেও বৈদ্যুতিক যানবাহনের জনপ্রিয়তার চিত্র স্পষ্ট। গত সেপ্টেম্বরে ভারতে বিক্রি হওয়া নতুন তিন চাকার যানবাহনের অর্ধেকেরও বেশি ছিল বৈদ্যুতিক। একই সময়ে নতুন গাড়ির বাজারে বৈদ্যুতিক গাড়ির অংশ ছিল প্রায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ। দুই চাকার যানবাহনের ক্ষেত্রে এই হার ১১ দশমিক ৬ শতাংশ।

মাহিন্দ্রা লাস্ট মাইল মোবিলিটির প্রধান নির্বাহী সুমন মিশ্র জানান, গত পাঁচ বছরে তাঁদের প্রতিষ্ঠানে বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যবহার ছয় গুণ বেড়েছে। গত দুই বছরে এই প্রবৃদ্ধির গতি আরও বেড়েছে।

বিজ্ঞাপন

তাঁর মতে, সরকারি ভর্তুকি, গাড়ির গুণগত মানের উন্নতি এবং পরিচালন ব্যয় কমে আসার কারণে ক্রেতারা এখন বৈদ্যুতিক যানবাহনের দিকে বেশি ঝুঁকছেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

এক দশকেরও বেশি সময় আগে নয়াদিল্লির রাস্তায় ই-রিকশার প্রচলন শুরু হয়। তখন ছোট ছোট স্থানীয় কারখানায় প্যাডেলচালিত তিন চাকার রিকশায় পরিবর্তন এনে চীনে তৈরি ব্যাটারি সংযোজন করে এসব যান তৈরি করা হতো।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ছোট উদ্যোগই বড় শিল্পে রূপ নিয়েছে। প্রচলিত জ্বালানিচালিত তিন চাকার যানবাহনের বাজারেও জায়গা করে নিয়েছে ই-রিকশা। মাহিন্দ্রার মতো বড় প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণে উৎপাদন ও বিপণন ব্যবস্থাও পেয়েছে নতুন মাত্রা।

বিজ্ঞাপন

এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে ভারতের শহরগুলোর রাস্তাঘাটেও। উত্তর ভারতের বিভিন্ন শহরে রেলস্টেশন ও ব্যস্ত বাজারের বাইরে এখন সারি সারি ই-রিকশা দেখা যায়। এসব যান চলাচল বাড়ায় প্রচলিত টুকটুকের বিকট শব্দও অনেকটা কমেছে।

জ্বালানি সাশ্রয়ে চালকদের আগ্রহ

বৈদ্যুতিক যানবাহনের পরিবেশগত সুবিধা থাকলেও চালকদের কাছে সবচেয়ে বড় আকর্ষণ পরিচালন ব্যয় কমে যাওয়া। অনেকের কাছে এটি সরাসরি আয় বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন

পরিবেশবিষয়ক আর্থশট পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত ১৫টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে রয়েছে মাহিন্দ্রা। আগামী ১৭ নভেম্বর মুম্বাইয়ে প্রিন্স উইলিয়াম এই পুরস্কার প্রদান করবেন।

হায়দরাবাদের ৩১ বছর বয়সী চালক আফরোজ আলম চলতি বছর গ্যাসচালিত অটোরিকশা ছেড়ে বৈদ্যুতিক যান কিনেছেন। নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, “টাকাটা সরাসরি আমার পকেটে আসছে।”

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, গাড়ি চার্জ করতে কম খরচ হওয়ায় প্রতিদিন কয়েক শ রুপি সাশ্রয় হচ্ছে। বেশি দামে বৈদ্যুতিক গাড়ি কেনার জন্য নেওয়া ঋণ পরিশোধেও এই অর্থ কাজে লাগছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

আফরোজের মতে, বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রাথমিক দাম বেশি মনে হলেও জ্বালানির পেছনে নিয়মিত অর্থ ব্যয় করতে হয় না। ফলে দীর্ঘমেয়াদে দুই ধরনের গাড়ির খরচের ব্যবধান অনেকটাই কমে আসে।

বিশ্লেষকদেরও মত, অর্থনৈতিক সাশ্রয়ই ই-রিকশার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান কারণ। ব্যাটারির দাম কমা এবং প্রচলিত জ্বালানির ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বৈদ্যুতিক যান ব্যবহারে আর্থিক সুবিধা বাড়ছে।

ভারতের গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিইইডব্লিউর ২০২৫ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, গাড়ির পুরো ব্যবহারকাল বিবেচনায় নিলে প্রতি কিলোমিটার চলতে পেট্রলচালিত তিন চাকার যানবাহনের ব্যয় বৈদ্যুতিক যানের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি।

বিজ্ঞাপন

দিল্লিভিত্তিক চিন্তন রিসার্চ ফাউন্ডেশনের বিদিশা ভট্টাচার্য বলেন, ই-রিকশাগুলো দিনের অধিকাংশ সময় রাস্তায় চলাচল করে। ফলে জ্বালানি সাশ্রয়ের সুবিধাও দ্রুত জমা হয়।

তেল আমদানি কমানোর কৌশল

ভারতের নীতিনির্ধারকেরাও বৈদ্যুতিক যানবাহনের এই বিস্তারকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। কারণ, দেশটির জ্বালানি চাহিদার বড় অংশ পূরণ করতে হয় আমদানির মাধ্যমে। বিশেষ করে তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের জন্য বিদেশের ওপর নির্ভরশীলতা কমানো ভারতের অন্যতম লক্ষ্য।

বিজ্ঞাপন

গত ফেব্রুয়ারিতে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর জ্বালানির ব্যয় নিয়ন্ত্রণে রাখতে ভারতকে বিভিন্ন উদ্যোগ নিতে হয়েছে।

জলবায়ুবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান এমবারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১২ সালে চীনের মাথাপিছু আয় যে পর্যায়ে ছিল, একই আয়স্তরে ভারতের মানুষ চীনের তুলনায় কম পরিবহন জ্বালানি ব্যবহার করছে। সস্তা সৌরবিদ্যুৎ এবং ব্যাটারির দাম কমে আসাও এ ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে।

প্রতিবেদনটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, তেল আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানোর প্রতিযোগিতায় ভারত ইতিমধ্যে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে।

বিজ্ঞাপন

অবকাঠামো ও যন্ত্রাংশের সংকট

তবে ভারতের সব শহরে বৈদ্যুতিক যানবাহনের প্রসার একই গতিতে হচ্ছে না। লখনৌয়ের মতো শহরে ই-রিকশার ব্যাপক ব্যবহার থাকলেও মুম্বাইয়ে এর সংখ্যা তুলনামূলক কম। পর্যাপ্ত পার্কিং ও চার্জিং সুবিধার অভাবই এর অন্যতম কারণ।

মাহিন্দ্রা লাস্ট মাইল মোবিলিটির প্রধান নির্বাহী সুমন মিশ্র বলেন, মুম্বাইয়ে পার্কিংয়ের জায়গারই সংকট রয়েছে। জ্বালানিচালিত গাড়ি রাস্তার পাশে রাখা গেলেও চার্জ দিতে হয় এমন বৈদ্যুতিক গাড়ির জন্য জায়গা নিশ্চিত করা বড় চ্যালেঞ্জ।

এ ছাড়া যন্ত্রাংশ সরবরাহের ক্ষেত্রেও রয়েছে জটিলতা। গত বছর চীন বৈদ্যুতিক মোটরের গুরুত্বপূর্ণ উপাদান বিরল মৃত্তিকা চুম্বকের রপ্তানিতে বিধিনিষেধ আরোপ করে। এতে ভারতের কয়েকটি গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান উৎপাদন কমাতে কিংবা সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে বাধ্য হয়।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দেশে ব্যাটারির সেলসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ উৎপাদনের উদ্যোগ নিয়েছে ভারত সরকার। তবে এসব সেলের বড় অংশ এখনো চীন ও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে আমদানি করতে হচ্ছে।

আরও পড়ুন

সুমন মিশ্র জানিয়েছেন, ভারতের দুটি প্রতিষ্ঠান নিজস্ব ব্যাটারির সেল বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদনের খুব কাছাকাছি পৌঁছেছে। তবে এ ক্ষেত্রে আরও কিছুটা সময় প্রয়োজন।

ব্যক্তিগত গাড়ি ও ট্রাকেও ছড়াবে বৈদ্যুতিক বিপ্লব?

ই-রিকশার সাফল্যের পর এখন বড় প্রশ্ন, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অধিক জ্বালানি ব্যবহারকারী ট্রাকের ক্ষেত্রেও এই পরিবর্তন কতটা বিস্তৃত করা সম্ভব।

বিদিশা ভট্টাচার্যের মতে, বাণিজ্যিক যানবাহনের বহর বৈদ্যুতিক করার মধ্য দিয়ে পরবর্তী বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে ট্যাক্সিগুলো বৈদ্যুতিক হলে চার্জিং অবকাঠামো সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মধ্যেও বৈদ্যুতিক গাড়ির প্রতি আস্থা বাড়বে।

তবে যারা ইতিমধ্যে ই-রিকশা ব্যবহার করছেন, তাঁদের কাছে এই পরিবর্তনের সুফল বেশ স্পষ্ট।

২৬ বছর বয়সী মোহাম্মদ আলী চলতি বছর একটি ই-রিকশা কিনেছেন। ব্যাটারি নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুললেও নিজের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এক দিন গাড়িটি চালিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, কত টাকা সাশ্রয় হচ্ছে।

ভারতের সড়কে ই-রিকশার ক্রমবর্ধমান উপস্থিতি তাই শুধু পরিবহনব্যবস্থার পরিবর্তন নয়, বরং জ্বালানি ব্যয় কমানো ও তেল আমদানির নির্ভরতা হ্রাসের বৃহত্তর পরিকল্পনারও অংশ হয়ে উঠছে।

সূত্র: এএফপি

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD