৫ বছর ফিটনেসবিহীন গাড়ি স্ক্র্যাপ নয়, সড়কে বাড়ছে ঝুঁকি

ফিটনেসবিহীন মোটরযান স্ক্র্যাপ করার ক্ষেত্রে সময়সীমা এক বছর থেকে বাড়িয়ে পাঁচ বছর করেছে সরকার। ফলে কোনো গাড়ি যৌক্তিক কারণ ছাড়া এক বছরের বেশি সময় ফিটনেসবিহীন থাকলেই স্ক্র্যাপ করার আগের বিধান আর থাকছে না। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, পাঁচ বছরের বেশি সময় ফিটনেসবিহীন থাকার পর সেটি স্ক্র্যাপযোগ্য হবে।
বিজ্ঞাপন
নতুন ‘মোটরযান স্ক্র্যাপিং ও রিসাইক্লিং নীতিমালা, ২০২৬’-এ এ পরিবর্তন আনা হয়েছে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ নীতিমালাটি জারি করে এবং একই দিন তা গেজেট আকারে প্রকাশিত হয়। এর আগে ১৩ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এ-সংক্রান্ত নীতিমালা জারি করা হয়েছিল।
নতুন নীতিমালায় স্ক্র্যাপিং প্রক্রিয়ার কয়েকটি ধাপে সময় কমানো, নিলাম ব্যবস্থা চালু, বেসরকারি ভেন্ডরের পাশাপাশি সরকারি প্রতিষ্ঠানকে স্ক্র্যাপিং কাজে যুক্ত করার সুযোগ এবং পুরোনো গাড়ি বাতিলের পর মালিকদের ঋণ বা আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
স্ক্র্যাপিং প্রক্রিয়ায় কমেছে কয়েকটি সময়সীমা
বিজ্ঞাপন
ফিটনেসবিহীন গাড়ি স্ক্র্যাপযোগ্য হওয়ার সময়সীমা বাড়লেও স্ক্র্যাপিংয়ের পরবর্তী ধাপগুলো দ্রুত শেষ করার বিধান করা হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনো স্ক্র্যাপযোগ্য গাড়ি আটক করলে মালিককে নোটিশ দেওয়ার সময় ৩০ দিন থেকে কমিয়ে ১৫ দিন করা হয়েছে। তবে অনুমোদন ছাড়া উৎপাদিত মোটরযানের ক্ষেত্রে কোনো নোটিশ দেওয়ার প্রয়োজন হবে না।
এ ছাড়া স্ক্র্যাপ নিষ্পত্তির সময় ৩০ কার্যদিবস থেকে কমিয়ে ১৫ কার্যদিবস করা হয়েছে। অর্থাৎ কর্তৃপক্ষের কার্যাদেশ পাওয়ার পর নির্ধারিত ভেন্ডরকে আগের তুলনায় কম সময়ে নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে গাড়ি স্ক্র্যাপ করতে হবে।
মোটরযান ধ্বংসের পর স্ক্র্যাপিং সার্টিফিকেট দেওয়ার সময়ও কমানো হয়েছে। আগের নীতিমালায় এ জন্য ৩০ দিন সময় থাকলেও নতুন নীতিমালায় তা সাত দিনে নামিয়ে আনা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কর ও ফি পরিশোধে নতুন বিধান
ইকোনমিক লাইফ নির্ধারিত হয়নি এমন গাড়ি অথবা নির্ধারিত অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ার আগেই কোনো মোটরযান স্ক্র্যাপ করতে চাইলে আগের সব কর ও ফি পরিশোধ করতে হবে।
অন্যদিকে, গাড়ির ইকোনমিক লাইফ শেষ হয়ে যাওয়ার পরবর্তী সময়ের কর ও ফি আর আদায় করা হবে না। ইকোনমিক লাইফের মধ্যে কোনো কর বা ফি বকেয়া থাকলে মালিককে নোটিশ দেওয়ার ৩০ দিনের মধ্যে তা পরিশোধ করতে হবে।
বিজ্ঞাপন
নির্ধারিত সময়ে বকেয়া পরিশোধ না হলে স্ক্র্যাপ বা নিলাম থেকে পাওয়া অর্থের মধ্য থেকে ওই টাকা আদায় করা হবে। এরপরও বকেয়া থাকলে ‘পাবলিক ডিমান্ডস রিকভারি অ্যাক্ট, ১৯১৩’ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে।
স্ক্র্যাপমূল্য নির্ধারণে যুক্ত হয়েছে নতুন প্রতিনিধি
স্ক্র্যাপমূল্য নির্ধারণের জন্য নতুন কমিটিতে পরিবেশ অধিদপ্তর, সরকারি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন যন্ত্র প্রকৌশলী, গণপরিবহন মালিক সমিতি, পণ্যপরিবহন মালিক সমিতি এবং মোটরযান মেরামত কারখানা মালিক সমিতির প্রতিনিধিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পাওয়ার সাত কার্যদিবসের মধ্যে কমিটিকে গাড়ির স্ক্র্যাপমূল্য এবং কোন কোন অংশ পুনর্ব্যবহারযোগ্য বা রিসাইকেল করা যাবে, তা নির্ধারণ করতে হবে।
নতুন নীতিমালায় প্রথমবারের মতো পৃথক নিলাম কমিটির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। স্ক্র্যাপমূল্য নির্ধারণ কমিটির নির্ধারিত দামের ভিত্তিতে নিবন্ধিত স্ক্র্যাপ ভেন্ডরদের অংশগ্রহণে তিন কার্যদিবসের মধ্যে নিলাম শেষ করতে হবে। সর্বোচ্চ দরদাতা ভেন্ডরকে স্ক্র্যাপিংয়ের দায়িত্ব দেওয়া হবে।
এ ছাড়া গাড়ির চেসিসের পাশাপাশি ইঞ্জিন নম্বরও এমনভাবে ধ্বংস করতে হবে, যাতে সেটি অন্য কোনো গাড়িতে ব্যবহার করা না যায়। আগের নীতিমালায় চেসিস ধ্বংসের কথা থাকলেও ইঞ্জিন নম্বর নষ্ট করার বিষয়ে নির্দিষ্ট বিধান ছিল না।
বিজ্ঞাপন
সরকারি প্রতিষ্ঠানও পাবে স্ক্র্যাপিংয়ের দায়িত্ব
সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের অকেজো ঘোষিত গাড়ি কর্তৃপক্ষের ডাম্পিং স্টেশনে পাঠানোর বিধান রাখা হয়েছে।
উপযুক্ত বেসরকারি ভেন্ডর না পাওয়া গেলে সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানকে স্ক্র্যাপ ভেন্ডর হিসেবে নিয়োগ করা যাবে। পাশাপাশি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) চাইলে নিজস্ব ব্যবস্থাপনাতেও স্ক্র্যাপিং কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।
বিজ্ঞাপন
বাণিজ্যিক যাত্রী ও পণ্যবাহী গাড়ির মালিকদের জন্যও নতুন সুবিধা রাখা হয়েছে। স্ক্র্যাপ সার্টিফিকেটের বিপরীতে সহজ শর্তে ও স্বল্পসুদে ঋণ অথবা প্রযোজ্য ক্ষেত্রে আর্থিক প্রণোদনা দেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে পুরোনো গাড়ি স্ক্র্যাপ করার পর নতুন বা তুলনামূলক আধুনিক যানবাহন কেনায় মালিকদের আর্থিক সহায়তার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পুরোনো যানবাহন নিয়ে বিশ্বব্যাংকের উদ্বেগ
বাংলাদেশে পুরোনো যানবাহন ও সীমিত নির্গমন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণেও উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
বিশ্লেষণ অনুযায়ী, দেশে মোটরযানের সংখ্যা দ্রুত বাড়ার পাশাপাশি পুরোনো যানবাহন, বিশেষ করে ডিজেলচালিত বাস ও ট্রাক বায়ুদূষণের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। ২০২৪ সালে দেশে নিবন্ধিত যানবাহনের সংখ্যা ৬০ লাখের বেশি ছিল। ভারী যানবাহনের মধ্যে বাসের গড় বয়স ২০ বছরের বেশি এবং ট্রাকের গড় বয়স ১৫ বছরের বেশি।
পুরোনো যানবাহন নিয়ন্ত্রণে দুর্বলতা এবং গাড়ির বহর আধুনিকায়নে প্রণোদনার ঘাটতির বিষয়টিও বিশ্বব্যাংকের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে। এ অবস্থায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি স্ক্র্যাপের সময়সীমা এক বছর থেকে পাঁচ বছর করায় অযোগ্য ও পুরোনো যানবাহন সরিয়ে নেওয়ার গতি কমতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা।
যাত্রী কল্যাণ সংগঠনের আপত্তি
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, ‘পরিবহন খাতের তো সব সিদ্ধান্ত মালিকরা একতরফা নিয়ে নেন। আপনি ফিটনেসের টাকা-পয়সা জনগণের কাছ থেকে নিয়ে নেবেন, এটা তো ভাড়ার ওপর নির্ধারণ করা, তাই না? এখন নিয়ে নেবেন, আপনি দেবেন না, দীর্ঘদিন বকেয়া রাখবেন, আবার দীর্ঘদিন ফিটনেসবিহীন গাড়ি চালানোর সুযোগ নেবেন। আসলে মালিকদের সুবিধা দেওয়ার জন্য এ পরিবর্তন হচ্ছে।’
আরও পড়ুন
তিনি আরও বলেন, ‘এক বছর ফিটনেস খেলাপি থাকার পর গাড়ি স্ক্র্যাপ করার বিধান পরিবর্তন করে পাঁচ বছর করা হলে তা পরিবহন মালিকদের বাড়তি সুবিধা দেবে। এর ফলে ফিটনেসবিহীন গাড়ি রাস্তায় চলাচলে উৎসাহিত হবে এবং তা ঝুঁকি তৈরি করবে।’
আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্যের কথা বলছে কর্তৃপক্ষ
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আনিসুর রহমান বলেন, নতুন মোটরযান স্ক্র্যাপিং নীতিমালায় আইনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কিছু পরিবর্তন করা হয়েছে। আগে এক বছরের বেশি সময় ফিটনেসবিহীন থাকলে মোটরযান স্ক্র্যাপ করার সুযোগ ছিল। এখন তা পাঁচ বছর করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘নিলামের কয়েকটা জিনিস নতুন নীতিমালায় ঢোকানো হয়েছে। আগে স্ক্র্যাপ করা মোটরযান ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে শুধু ভেন্ডরের মাধ্যমে কাজ করার সুযোগ ছিল। এখন ভেন্ডর না পাওয়া গেলে সরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এ কাজ করা যাবে। পাশাপাশি বিআরটিএ চাইলে নিজেরাও এ কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।’
নীতিমালায় কয়েকটি ধাপে সময়সীমা কমানোর কথা উল্লেখ করে আনিসুর রহমান বলেন, নতুন ব্যবস্থার মাধ্যমে মোটরযান স্ক্র্যাপিংয়ের ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।








