বছরের শুরু কেন জানুয়ারি থেকে?

আজ বিশ্বের অধিকাংশ দেশেই নতুন বছর শুরু হয় ১ জানুয়ারি থেকে। কিন্তু ইতিহাস ঘেঁটে দেখলে জানা যায়, বছরের সূচনা সবসময় জানুয়ারি থেকেই ধরা হতো—এমন নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্যালেন্ডার বদলেছে, বদলেছে বছরের শুরু হওয়ার দিনও। তাহলে কীভাবে জানুয়ারি হয়ে উঠল বছরের প্রথম মাস?
বিজ্ঞাপন
প্রাচীন রোমান ক্যালেন্ডারে শুরুতে ছিল মাত্র ১০টি মাস। সে সময় বছরের মোট দিনসংখ্যা ছিল ৩০৪, আর শীতকালকে মাসহীন সময় হিসেবে ধরা হতো। পরে খ্রিস্টপূর্ব প্রায় ৭১৩ সালে রোমের রাজা নুমা পম্পিলিয়াস ক্যালেন্ডারে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি যোগ করেন। এতে বছর দাঁড়ায় ৩৫৪ দিনের, যা চন্দ্র বছরের কাছাকাছি।
তবে তখনও বছরের প্রথম মাস ছিল মার্চ। ইতিহাসবিদদের মতে, পরবর্তীতে প্রশাসনিক প্রয়োজনে জানুয়ারি ধীরে ধীরে বছরের সূচনামাসে পরিণত হয়। যদিও ১৫৩ খ্রিস্টপূর্বাব্দ পর্যন্ত ১ জানুয়ারিকে আনুষ্ঠানিকভাবে নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি।
জানুয়ারিকে প্রথম মাস করার পেছনে ছিল প্রতীকী কারণও। এই মাসের নামকরণ করা হয় রোমান দেবতা জানুস-এর নামানুসারে, যাকে নতুন শুরু, দ্বার ও পরিবর্তনের দেবতা হিসেবে মানা হতো। অন্যদিকে মার্চের নাম এসেছে যুদ্ধের দেবতা মার্স থেকে।
বিজ্ঞাপন
রোমান ক্যালেন্ডার সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ঋতুর সঙ্গে মিল রাখতে ব্যর্থ হচ্ছিল। রাজনৈতিক কারণেও এতে ইচ্ছেমতো দিন যোগ-বিয়োগ করা হতো। এই বিশৃঙ্খলা দূর করতে জুলিয়াস সিজার খ্রিস্টপূর্ব ৪৬ সালে ক্যালেন্ডার সংস্কারের উদ্যোগ নেন।
আলেকজান্দ্রিয়ার জ্যোতির্বিজ্ঞানী সোসিজেনেস-এর পরামর্শে তিনি চন্দ্রচক্র বাদ দিয়ে সৌর বছরের ভিত্তিতে নতুন ক্যালেন্ডার প্রণয়ন করেন। এতে বছর নির্ধারিত হয় ৩৬৫ দিন ও প্রতি চার বছরে এক দিন যোগ করে। এই নতুন ক্যালেন্ডারেই ১ জানুয়ারিকে বছরের প্রথম দিন হিসেবে নির্ধারণ করা হয়, যা পরিচিত হয় জুলিয়ান ক্যালেন্ডার নামে।
রোমান সাম্রাজ্যের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে এই ক্যালেন্ডার ইউরোপসহ বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
বিজ্ঞাপন
রোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর অনেক খ্রিস্টান রাষ্ট্র ধর্মীয় গুরুত্বের কারণে নববর্ষের দিন পরিবর্তন করে। কোথাও ২৫ মার্চ (অ্যানানসিয়েশন দিবস), আবার কোথাও ২৫ ডিসেম্বর (বড়দিন) বছরের শুরু হিসেবে পালিত হতে থাকে।
জুলিয়ান ক্যালেন্ডারে অধিবর্ষ গণনায় সামান্য ত্রুটি ছিল। শত শত বছরে সেই ত্রুটি জমতে জমতে ঋতুর সঙ্গে ক্যালেন্ডারের বড় ধরনের অমিল দেখা দেয়। এই সমস্যার সমাধানে ১৫৮২ সালে পোপ গ্রেগরি ত্রয়োদশ নতুন ক্যালেন্ডার প্রবর্তন করেন—যা আজকের গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার।
এই ক্যালেন্ডারে অধিবর্ষের হিসাব সংশোধন করা হয় এবং আবারও ১ জানুয়ারিকে নববর্ষের প্রথম দিন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়।
বিজ্ঞাপন
প্রথমে ইতালি, স্পেন ও ফ্রান্স এই ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। তবে ব্রিটেন ও তার উপনিবেশগুলো এটি গ্রহণ করে আরও দেরিতে—১৭৫২ সালে। তার আগে সেখানে ২৫ মার্চ থেকেই নতুন বছর শুরু হতো।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে খ্রিস্টান অধ্যুষিত নয়—এমন অনেক দেশও প্রশাসনিক কাজে গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার গ্রহণ করে। তবে পাশাপাশি তারা নিজেদের ঐতিহ্যগত ক্যালেন্ডারও বজায় রেখেছে।
বাংলাদেশে যেমন রয়েছে বাংলা বর্ষপঞ্জি, যার ভিত্তিতে পালিত হয় পহেলা বৈশাখ। চীন গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করলেও আজও চন্দ্র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী চীনা নববর্ষ উদযাপন করে। আবার ইথিওপিয়ায় নতুন বছর শুরু হয় সেপ্টেম্বরে, যা পরিচিত এনকুটাটাশ নামে।
বিজ্ঞাপন
আজ ১ জানুয়ারি বিশ্বব্যাপী নববর্ষ হিসেবে স্বীকৃত হলেও, এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস, সংস্কার আর সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের গল্প। জানুয়ারি শুধু একটি মাস নয়—এটি সময় গণনার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের প্রতীক।








