সবার আঙুলের ছাপ আলাদা হয় কেন?

ডিজিটাল যুগে আমরা স্মার্টফোন, দরজার লক কিংবা গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টে ফিঙ্গারপ্রিন্ট বা আঙুলের ছাপ ব্যবহার করি। এর মাধ্যমে নিরাপত্তা অনেক বেশি নিশ্চিত করা সম্ভব, কারণ কারও কৃত্রিম চেষ্টা দিয়ে সহজে এই লক বা সিস্টেম ভাঙা সম্ভব নয়। জাতীয় পরিচয় পত্র, পাসপোর্ট ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্রেও বায়োমেট্রিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, যা প্রতিটি ব্যক্তিকে এককভাবে শনাক্ত করতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞাপন
তবে কি কখনো ভেবেছেন, কেন একই মানুষের দুই হাতের আঙুলের ছাপও এক নয়? মানুষের আঙুলের ছাপ পৃথিবীর সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি। আঙুলের ডগায় থাকা সূক্ষ্ম উঁচু-নিচু রেখার নকশাকেই আঙুলের ছাপ বলা হয়, যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ফ্রিকশন রিজ (friction ridge) বলা হয়। এই রেখাগুলো শুধু পরিচয় শনাক্ত করার জন্য নয়, বরং জিনিস শক্তভাবে ধরতে ও স্পর্শ অনুভব করতে সাহায্য করে।
বিজ্ঞানীরা জানান, আঙুলের ছাপ গঠিত হতে শুরু করে ভ্রূণের বয়স যখন প্রায় ১০ থেকে ১৬ সপ্তাহ। তখন শিশুর ত্বক দ্রুত বাড়তে থাকে এবং ত্বকের নিচের স্তরের চাপ, রক্ত চলাচল, অ্যামনিয়োটিক তরলের প্রবাহ এবং গর্ভের ভেতরের ক্ষুদ্র পরিবেশগত পরিবর্তন মিলেই তৈরি হয় এই অনন্য নকশা। অর্থাৎ ছাপ তৈরিতে শুধু জিনগত তথ্য নয়, গর্ভের ভেতরের ক্ষুদ্র শারীরিক পরিস্থিতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এ কারণেই একই ডিএনএ থাকা যমজদেরও আঙুলের ছাপ আলাদা হয়।
বিজ্ঞাপন
আঙুলের ছাপ কখনো এক না হওয়ার মূল কারণ হলো এর গঠনপ্রক্রিয়ার জটিলতা। একটি আঙুলের ছাপে শত শত ক্ষুদ্র বৈশিষ্ট্য থাকে যেমন রেখার শেষ হওয়া, শাখা তৈরি হওয়া বা ছোট দ্বীপের মতো বিন্দু। এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সম্ভাব্য সমন্বয় এত বেশি যে পৃথিবীর দুই ব্যক্তির ছাপ পুরোপুরি মিলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কাছাকাছি। সামান্য চাপ বা অবস্থানের পরিবর্তনও ভ্রূণের ত্বকের রেখা বদলে দিতে পারে, ফলে প্রতিটি ছাপ হয়ে ওঠে একেবারে স্বতন্ত্র।
আঙুলের ছাপ যে পরিচয় শনাক্তের নির্ভরযোগ্য মাধ্যম এ ধারণাকে বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করেন ব্রিটিশ গবেষক ফ্ল্যান্সিস গালটন। পরে এটিকে পুলিশি কাজে ব্যবহারযোগ্য পদ্ধতিতে রূপ দেন ব্রিটিশ কর্মকর্তা এডওয়ার্ড হেনরি, যিনি ছাপ শ্রেণিবিন্যাসের একটি কার্যকর ব্যবস্থা তৈরি করেন। বর্তমানে অপরাধ তদন্ত, পাসপোর্ট যাচাই, ভোটার শনাক্তকরণ এবং স্মার্টফোন নিরাপত্তা সব ক্ষেত্রেই আঙুলের ছাপ ব্যবহৃত হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
সাধারণভাবে আঙুলের ছাপ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকে। ছোটখাটো কাটাছেঁড়া বা ঘর্ষণে ছাপ বদলায় না; ত্বক সেরে উঠলে আগের নকশাই ফিরে আসে। তবে গভীর পোড়া বা ত্বকের নিচের স্তর পর্যন্ত আঘাত লাগলে স্থায়ী পরিবর্তন হতে পারে।
শুধু মানুষই নয়, কিছু প্রাণীরও মানুষের মতো অনন্য ছাপ থাকে। যেমন কোয়ালার ছাপ মানুষের ছাপের সঙ্গে এতটাই মিল যে বিশেষ যন্ত্র ছাড়া পার্থক্য বোঝা কঠিন।
আঙুলের ছাপ কেবল নিরাপত্তার জন্য নয়—এটি মানুষের শারীরিক বৈশিষ্ট্য, পরিচয় এবং জীবনের দৈনন্দিন কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
বিজ্ঞাপন
সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া








