ব্রেকআপের পর মানসিক অস্থিরতা কমাতে বিশেষজ্ঞের ৫ পরামর্শ

বিচ্ছেদ জীবনের অন্যতম কঠিন ও বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা। দীর্ঘদিনের কোনো সম্পর্ক হঠাৎ শেষ হয়ে গেলে অনেকেই মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। প্রেমের সম্পর্কের সমাপ্তির পর বুকের ভেতর জমে থাকা শোক, একাকিত্ব, হতাশা ও অস্থিরতা ধীরে ধীরে দৈনন্দিন জীবনেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিজ্ঞাপন
বদলে যেতে পারে ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাস, কাজে মনোযোগ কমে যেতে পারে এবং একাকিত্ব ও উদ্বেগ আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। বিশেষ করে বিচ্ছেদের পর প্রথম কয়েকটি দিন অনেকের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় হিসেবে দেখা দেয়। তীব্র আবেগের মুহূর্তে কেউ কেউ এমন সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, যা পরবর্তী সময়ে অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে বিচ্ছেদের পর প্রথম সপ্তাহে নিজেকে সামলে রাখার কয়েকটি কার্যকর উপায় তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ‘মার্গ মাইন্ডকেয়ার’-এর মনোবিজ্ঞানী শিরীন দারগানের পরামর্শ অনুযায়ী, ব্রেকআপের পর প্রথম সপ্তাহের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্রুত প্রাক্তন সঙ্গীকে মন থেকে মুছে ফেলা নয়। বরং এ সময় নিজের মানসিক স্থিরতা ফিরিয়ে আনা, অনুভূতিগুলোকে বুঝতে শেখা এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনের ছন্দে ফিরে আসাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
মনোবিজ্ঞানীর মতে, ব্রেকআপের পর সামনে এগিয়ে যাওয়ার অর্থ নিজেকে আকর্ষণীয় প্রমাণ করার জন্য হঠাৎ কোনো পরিবর্তন আনা কিংবা প্রতিশোধমূলকভাবে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপনের পরিকল্পনা করা নয়। একইভাবে প্রাক্তন সঙ্গী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী করছেন, নতুন কারও সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন কি না কিংবা কী ধরনের ছবি বা বার্তা প্রকাশ করছেন—এসব বারবার পরীক্ষা করাও মানসিকভাবে সুস্থ হয়ে ওঠার পথ নয়।
বিজ্ঞাপন
এমনকি প্রাক্তন সঙ্গী আদৌ আপনাকে ভালোবাসতেন কি না, এখনো আপনাকে মনে করেন কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার জন্য হুট করে আবার যোগাযোগ করার চেষ্টাও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। সাময়িক স্বস্তি পাওয়ার জন্য দ্রুত নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া কিংবা ক্ষতিকর দ্রব্যের অপব্যবহারের মতো ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেওয়াও এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
প্রথম সপ্তাহে লক্ষ্য হওয়া উচিত এক মুহূর্তেই প্রাক্তন সঙ্গীকে ভুলে যাওয়া নয়। বরং নিজের মানসিক অবস্থাকে স্থিতিশীল করা, নিজের অনুভূতিগুলোকে স্বীকার করা এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে আসা। একই সঙ্গে জীবনে নিজের অবস্থান ও নিয়ন্ত্রণের অনুভূতিও আবার ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করা জরুরি।
প্রথম সপ্তাহে নিজেকে সামলাতে পাঁচটি পরামর্শ হলো—
বিজ্ঞাপন
১. নিজের মৌলিক প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিন
মানসিক চাপ বা বিচ্ছেদের কষ্টের সময় ঘুম, খাওয়া এবং শরীরের যত্ন নেওয়ার মতো মৌলিক বিষয়গুলোও অনেকের কাছে গুরুত্ব হারিয়ে ফেলে। কেউ ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করেন না, আবার কেউ ঘুমের স্বাভাবিক সময়সূচি হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু শরীরের প্রয়োজনীয় যত্ন ঠিকভাবে না নিলে মানসিক চাপ, মন খারাপ ও উদ্বেগ আরও বেড়ে যেতে পারে।
তাই বিচ্ছেদের পর প্রথম সপ্তাহে পর্যাপ্ত ঘুমানোর চেষ্টা করা, সময়মতো খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান করা এবং শরীরকে সচল রাখার মতো বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার। এ সময় খুব বেশি কিছু করার মানসিক বা শারীরিক শক্তি না থাকলেও ছোট ছোট কাজ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করা, গোসল করা, ঘর গুছিয়ে নেওয়া কিংবা স্বাস্থ্যকর কিছু খাওয়ার মতো সাধারণ কাজও নিজের যত্ন নেওয়ার অংশ হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
২. আবেগকে চেপে রাখবেন না
ব্রেকআপের পর দুঃখ, রাগ, হতাশা, শূন্যতা কিংবা একাকিত্ব অনুভব করা অস্বাভাবিক নয়। সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর এসব অনুভূতি থেকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা না করে সেগুলোকে স্বাভাবিক আবেগ হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।
প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট নিজের অনুভূতির জন্য আলাদা করে রাখা যেতে পারে। এই সময় ডায়েরিতে মনের কথা লেখা, কান্না করা অথবা নিরিবিলিতে নিজের অনুভূতিগুলো নিয়ে ভাবার সুযোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে নিজের আবেগ কোথা থেকে আসছে, তা বোঝা সহজ হতে পারে। একই সঙ্গে আবেগকে চেপে রাখার পরিবর্তে ধীরে ধীরে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতাও তৈরি হতে পারে।
বিজ্ঞাপন
৩. প্রাক্তনকে ঘিরে ডিজিটাল ট্রিগার এড়িয়ে চলুন
ব্রেকআপের পর প্রাক্তন সঙ্গীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বারবার দেখা, পুরোনো ছবি বা মেসেজ ঘাঁটা কিংবা তিনি কখন অনলাইনে আসছেন তা খেয়াল করা মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
তাই কিছুদিনের জন্য এসব যোগাযোগ সীমিত করা যেতে পারে। প্রয়োজনে আনফলো, মিউট বা অন্যান্য গোপনীয়তা সেটিং ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি প্রতিহিংসার প্রকাশ নয়; বরং নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি করার একটি উপায়।
বিজ্ঞাপন
৪. কাছের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন
ব্রেকআপের পর নিজেকে সবার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু পুরোপুরি একা হয়ে যাওয়ার বদলে অন্তত এক বা দুজন বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ভালো।
সবসময় নিজের সমস্যা নিয়ে আলোচনা বা সমাধান খোঁজার প্রয়োজন নেই। কাছের কারও সঙ্গে কিছুক্ষণ বসে থাকা, একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া কিংবা একবেলা খাবার খাওয়াও একাকীত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে। এতে একই চিন্তা বারবার মাথায় ঘুরতে থাকার প্রবণতাও কিছুটা কমতে পারে।
বিজ্ঞাপন
৫. আবেগের বশে বড় সিদ্ধান্ত নেবেন না
ব্রেকআপের পর মানসিক অস্থিরতার মধ্যে হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দেওয়া, প্রাক্তনকে বারবার মেসেজ পাঠানো, অতিরিক্ত মাদক বা অন্য ক্ষতিকর উপায়ে আশ্রয় নেওয়া কিংবা দ্রুত নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।
এ সময় কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়া জরুরি। কারণ তীব্র আবেগের মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকতে পারে।
বিজ্ঞাপন
মনে রাখবেন, সেরে ওঠার পথ সবার একরকম নয়
ব্রেকআপের পর মানসিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে ওঠা কোনো সরলরেখার মতো প্রক্রিয়া নয়। একদিন হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ভালো লাগতে পারে, বাইরে গিয়ে আনন্দও হতে পারে। কিন্তু পরদিন আবার পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে মন খারাপ হতে পারে কিংবা কান্না চলে আসতে পারে। এমন আবেগের ওঠানামা স্বাভাবিক।
কোনো একটি দিন খারাপ যাওয়ার অর্থ এই নয় যে আপনি আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছেন। মানসিকভাবে সেরে ওঠার প্রক্রিয়ায় ভালো ও খারাপ—দুই ধরনের দিনই আসতে পারে। তাই নিজেকে সময় দেওয়া এবং নিজের অনুভূতির প্রতি সহানুভূতিশীল থাকা গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
তবে দীর্ঘ সময় ধরে তীব্র বিষণ্ণতা বা উদ্বেগ থাকলে, ঘুম ও খাওয়ার সমস্যা অব্যাহত থাকলে কিংবা নিজের ক্ষতি করার চিন্তা দেখা দিলে বিষয়টি হালকাভাবে নেওয়া উচিত নয়। এমন পরিস্থিতিতে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন। সময়মতো পেশাদার সহায়তা নেওয়া মানসিক সুস্থতার পথে ফিরে আসতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।







