Logo

সিন্ডিকেট ভাঙতে শুরু হতে যাচ্ছে খাদ্য বিভাগে শুদ্ধি অভিযান

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৫ মার্চ, ২০২৬, ১৯:৪৬
সিন্ডিকেট ভাঙতে শুরু হতে যাচ্ছে খাদ্য বিভাগে শুদ্ধি অভিযান
ছবি: সংগৃহীত

দেশের খাদ্য ব্যবস্থাপনা খাতে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা অনিয়ম, দুর্নীতি ও অস্বচ্ছতার অভিযোগের প্রেক্ষাপটে বড় ধরনের শুদ্ধি অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, ঈদের পরপরই খাদ্য বিভাগে একটি সমন্বিত ও বিস্তৃত অভিযান শুরু হতে পারে, যার লক্ষ্য হবে সিন্ডিকেট ভেঙে প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

বিজ্ঞাপন

খাদ্য মন্ত্রণালয় ও প্রশাসনের বিভিন্ন সূত্র জানায়, সরকারি খাদ্য গুদাম পরিচালনা, ধান-চাল সংগ্রহ, সরঞ্জাম ক্রয় এবং কর্মকর্তা বদলি-পদায়নকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অতীতে বিভিন্ন সরকার ক্ষমতায় এলেও এসব সমস্যার বড় ধরনের সমাধান হয়নি। তবে বর্তমান সরকারের শুরুতেই এই খাতে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।

উচ্চপর্যায়ের সূত্র জানায়, খাদ্য বিভাগের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরেও আলোচনা হয়েছে। কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে পৌঁছেছে বলে জানা গেছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে খাদ্য মন্ত্রণালয়।

সম্প্রতি খুলনা বিভাগের আঞ্চলিক ও জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকদের বিরুদ্ধে অফিসে নিয়মিত উপস্থিত না থাকা এবং বদলি বাণিজ্যে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ সামনে এসেছে। গণমাধ্যমে এ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি সরকারের নজরে আসে। এরপর সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে খাদ্যমন্ত্রীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিজ্ঞাপন

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন বিভাগীয় আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মামুনুর রশিদ এবং জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ তানভীর হোসেন। প্রশাসনিক সূত্রে দাবি করা হচ্ছে, তাদের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে, যা বদলি বাণিজ্য, ধান-চাল সংগ্রহ এবং বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রভাব খাটাতো।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে মন্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

বিজ্ঞাপন

খাদ্য অধিদপ্তরের স্থানীয় সরবরাহ ডিপো বা এলএসডি গুদামগুলোকে কেন্দ্র করে একটি অঘোষিত অর্থনৈতিক চক্র তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব গুদামে দায়িত্ব পেলে খাদ্যশস্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও বিতরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ থাকে। ফলে অনেক কর্মকর্তা এসব পদে যাওয়ার জন্য আগ্রহী হন।

সূত্রগুলো বলছে, অতীতে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ছিল। অনেক ক্ষেত্রে ১০ থেকে ২০ লাখ টাকার বিনিময়ে পদায়নের অভিযোগও রয়েছে। বিশেষ করে বিভাগীয় পর্যায়ে প্রভাব খাটিয়ে এই বদলি বাণিজ্য পরিচালিত হতো বলে অভিযোগ উঠেছে।

ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম ও রংপুর বিভাগের কয়েকটি আঞ্চলিক কার্যালয়ে এ ধরনের অভিযোগ বহুবার উঠলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নজির খুব কম বলেই দাবি সংশ্লিষ্টদের।

বিজ্ঞাপন

সরকারি সূত্রে জানা গেছে, ঈদের পর শুরু হতে যাওয়া শুদ্ধি অভিযানে খাদ্য বিভাগের বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তদন্তের আওতায় আসতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে— সরকারি খাদ্য গুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান ও চাল সংগ্রহ কার্যক্রম, বস্তা ও অন্যান্য সরঞ্জাম ক্রয়, কর্মকর্তা বদলি ও পদায়ন প্রক্রিয়া এবং পরিবহন ব্যয় ও ঠিকাদারি কার্যক্রম।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এটি কেবল কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয় নয়; বরং পুরো ব্যবস্থাকে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক করার একটি বড় প্রশাসনিক উদ্যোগ হতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি খাদ্য সচিব ফিরোজ সরকার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করেছেন। বৈঠকে তিনি খাদ্য সরবরাহ, ওএমএস কার্যক্রম, বদলি-পদায়নসহ বিভিন্ন বিষয়ে কঠোর তদারকির নির্দেশ দেন।

তিনি বলেন, দেশের খাদ্য নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এই খাতে কোনো ধরনের অনিয়ম বা দুর্নীতি সহ্য করা হবে না। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

খাদ্য সচিব আরও জানান, সরকার খাদ্য গুদাম ব্যবস্থাপনা, ধান-চাল সংগ্রহ এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে চায়। কোনো অনিয়মের সুযোগ দেওয়া হবে না।

বিজ্ঞাপন

প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, কেবল অভিযান চালিয়ে দীর্ঘদিনের দুর্নীতির সংস্কৃতি পুরোপুরি দূর করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন প্রশাসনিক সংস্কার, শক্তিশালী নজরদারি ব্যবস্থা এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা। একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা এবং দোষ প্রমাণিত হলে দ্রুত শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।

খাদ্য বিভাগে আসন্ন এই শুদ্ধি অভিযানের খবর ইতোমধ্যে প্রশাসনের ভেতরে আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের অনেকেই মনে করছেন, সরকার যদি সত্যিই কঠোর অবস্থানে থাকে, তবে খাদ্য ব্যবস্থাপনা খাতে দীর্ঘদিনের অনিয়ম ও দুর্নীতির সংস্কৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD