ঈদযাত্রা ঘিরে সদরঘাটে বাড়ছে যাত্রীচাপ, নিরাপত্তায় তৎপর পুলিশ

আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছেন ঘরমুখো মানুষ। সোমবার (১৬ মার্চ) ছিল সরকারি-বেসরকারি অফিসের শেষ কর্মদিবস। মঙ্গলবার (১৭ মার্চ) থেকে টানা সাত দিনের ছুটি শুরু হওয়ায় পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে অনেকে রাজধানী ছাড়ছেন। সড়ক ও রেলপথের পাশাপাশি নৌপথেও বাড়ির উদ্দেশে যাত্রা করছেন বিপুলসংখ্যক মানুষ। এর ফলে রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে বাড়তে শুরু করেছে যাত্রীদের উপস্থিতি।
বিজ্ঞাপন
সোমবার সন্ধ্যায় সদরঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, দেশের দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার জন্য যাত্রীদের ভিড় ধীরে ধীরে বাড়ছে। শিশু, নারী ও বৃদ্ধসহ সব বয়সী যাত্রীরা লঞ্চঘাটে ভিড় করছেন। সদরঘাট থেকে বর্তমানে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে ৩৬টি রুটে ছোট-বড় বহু লঞ্চ চলাচল করছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত কয়েক বছরের তুলনায় এখনো যাত্রীচাপ খুব বেশি নয়।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) ট্রাফিক ইন্সপেক্টর মোবারক হোসেন বলেন, সোমবার যাত্রীসংখ্যা তুলনামূলক কম থাকলেও আগামীকাল সকাল থেকে তা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে। বর্তমানে ৪১টি রুটের মধ্যে ৩৬টি রুটে লঞ্চ চলাচল করছে এবং রাত পর্যন্ত প্রায় ৬০ থেকে ৭০টি লঞ্চ বিভিন্ন গন্তব্যে ছেড়ে যাবে।
বিজ্ঞাপন
বরিশালগামী যাত্রী মারুফ বলেন, পরিবার নিয়ে ভ্রমণের জন্য লঞ্চ যাত্রা তুলনামূলক আরামদায়ক হওয়ায় অনেকেই নৌপথ বেছে নিচ্ছেন। লঞ্চের ভাড়া আগের মতোই রয়েছে। গুলিস্তান থেকে রায় সাহেব বাজার পর্যন্ত বাসে আসা গেলেও এরপর সদরঘাট পর্যন্ত যেতে অনেককে রিকশা বা হেঁটে যেতে হচ্ছে। কিছুটা যানজট থাকলেও এবারের ঈদযাত্রা মোটামুটি স্বস্তিদায়ক বলেই মনে হচ্ছে।
অন্যদিকে ভোলার বোরহানউদ্দিনগামী গাজী সালাউদ্দিন লঞ্চের সুপারভাইজার কবির আহমেদ বলেন, সোমবার অফিস-আদালত বন্ধ হওয়ায় যাত্রীসংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। আগামীকাল থেকে চাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের কাছে সড়কপথের তুলনায় নৌপথ বেশি স্বস্তিদায়ক এবং ভাড়াও তুলনামূলক কম হওয়ায় যাত্রীদের আগ্রহ বেশি।
যাত্রীসেবায় নতুন উদ্যোগ
বিজ্ঞাপন
এদিকে ঈদকে সামনে রেখে যাত্রীদের সুবিধা বাড়াতে নতুন কিছু উদ্যোগ নিয়েছে বিআইডব্লিউটিএ। সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে এবার চালু করা হয়েছে বিনামূল্যে কুলি (প্রোটার) সেবা, ট্রলি এবং হুইলচেয়ার সুবিধা। এর মাধ্যমে যাত্রীদের ভোগান্তি কমানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।
বিআইডব্লিউটিএর বন্দর পরিচালক এ কে এম আরিফ উদ্দিন বলেন, নতুন সরকারের সময়ে যাত্রীসেবার মান উন্নত করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আগে সদরঘাটের কিছু অংশ পরিষ্কার থাকলেও ভেতরের পরিবেশ তেমন ভালো ছিল না। এবার পুরো টার্মিনাল এলাকায় শৃঙ্খলা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিআইডব্লিউটিএর যুগ্ম পরিচালক মোবারক হোসেন মজুমদার বলেন, ঈদের আগে পাঁচ দিন এবং ঈদের পরে পাঁচ দিন—মোট ১০ দিনের জন্য যাত্রীদের বিনামূল্যে কুলি সেবা দেওয়া হবে। আগে যারা কুলি হিসেবে কাজ করতেন তাদেরকেই বিআইডব্লিউটিএর তত্ত্বাবধানে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, যাতে যাত্রীরা কোনো ধরনের হয়রানির শিকার না হন।
বিজ্ঞাপন
স্বেচ্ছাসেবকদের পারিশ্রমিক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যারা এ সেবায় যুক্ত হয়েছেন তাদের মজুরির বিষয়টি সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের লেবার হ্যান্ডেলিং ইজারাদার দেখবেন।
এ বিষয়ে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালের লেবার হ্যান্ডেলিং ইজারাদার এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণ শ্রমিকদলের আহ্বায়ক সুমন ভূইয়া বলেন, যাত্রীদের সেবা নিশ্চিত করতে প্রায় ৩০০ স্বেচ্ছাসেবক কাজ করছেন। তাদের পারিশ্রমিক তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রদান করবেন। পাশাপাশি ভবিষ্যতে এই সেবার জন্য সরকারি বরাদ্দ পাওয়ার আশাও প্রকাশ করেন তিনি।
নিরাপত্তায় অতিরিক্ত পুলিশ
বিজ্ঞাপন
ঈদযাত্রাকে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন করতে সদরঘাট এলাকায় বাড়ানো হয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা। কোতোয়ালি-সূত্রাপুর জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার নাজিম উদ্দিন আল আজাদ জানান, যাত্রীদের নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছাতে পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আরও পড়ুন: একদিনেই পুলিশের ২১ কর্মকর্তাকে বদলি
তিনি বলেন, গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া থেকে সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল পর্যন্ত এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে এবং যানজট নিয়ন্ত্রণে অতিরিক্ত ২০০ পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। কোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে তারা সার্বক্ষণিক প্রস্তুত রয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
যানজট কমাতে বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত টার্মিনাল সংলগ্ন এলাকায় পণ্যবাহী ট্রাক চলাচল সীমিত করা হয়েছে। এই ব্যবস্থা আগামী ৩১ মার্চ পর্যন্ত কার্যকর থাকবে বলে জানান তিনি।
এদিকে টার্মিনালের প্রবেশপথ বাংলাবাজার মোড়ে যান চলাচলে নতুন ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে। সেখানে এক লেনে রিকশা, ভ্যান ও ব্যক্তিগত গাড়ি চলাচল করছে। যানবাহনগুলো টার্মিনালের সামনে দিয়ে ঘুরে কোতোয়ালি থানার পাশের সড়ক দিয়ে বের হয়ে যাচ্ছে। তিন দিন আগে থেকে এই ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা কার্যকর করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানে দায়িত্বে থাকা ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা।
সব মিলিয়ে ঈদকে সামনে রেখে সদরঘাটে যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নানা প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। আগামী কয়েক দিনে যাত্রীচাপ আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্টরা।








