Logo

ফের চালুর পথে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, তবে কাটছে না সিন্ডিকেটের ‘ভয়’

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১১ এপ্রিল, ২০২৬, ১৭:০৫
ফের চালুর পথে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার, তবে কাটছে না সিন্ডিকেটের ‘ভয়’
ছবি: সংগৃহীত

প্রায় দুই বছর বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ বাজারটি পুনরায় চালুর উদ্যোগে এগোচ্ছে দুই দেশ। দীর্ঘদিন ধরে রিক্রুটিং এজেন্সির সিন্ডিকেট, অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে স্থগিত থাকা এই শ্রমবাজার খুলতে সাম্প্রতিক বৈঠকগুলো নতুন আশার সঞ্চার করেছে। তবে একইসঙ্গে পুরোনো সমস্যাগুলো আবার ফিরে আসার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

বিজ্ঞাপন

সরকার পরিবর্তনের পর নতুন উদ্যোগের অংশ হিসেবে দ্রুত সময়ের মধ্যে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা জোরদার করা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি কুয়ালালামপুর ও পুত্রজায়ায় অনুষ্ঠিত একাধিক বৈঠকে শ্রমবাজার চালুর বিষয়ে নীতিগত ঐকমত্যে পৌঁছায় দুই দেশের প্রতিনিধিরা।

বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, নির্ভরযোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী পাঠানো হবে এবং অভিবাসন ব্যয় কমানোর দিকে জোর দেওয়া হবে। তবে ‘বিশ্বাসযোগ্য’ এজেন্সির বিষয়টি নিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই শর্তের আড়ালে আবারও সীমিত সংখ্যক এজেন্সির হাতে পুরো প্রক্রিয়া চলে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে, যা অতীতের সিন্ডিকেট ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে।

বিজ্ঞাপন

সরকারি কর্মকর্তারা বলছেন, এবার নিয়োগ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। মালয়েশিয়া প্রযুক্তিনির্ভর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একটি নতুন নিয়োগ পদ্ধতি চালু করতে যাচ্ছে, যার লক্ষ্য মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাব কমানো, অভিবাসন ব্যয় হ্রাস এবং ‘নিয়োগকর্তা ব্যয় বহন করবে’—এই আন্তর্জাতিক নীতির বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।

যদিও এই উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন অনেকেই, তবুও বাস্তবায়ন নিয়ে রয়েছে সংশয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অতীত অভিজ্ঞতা বলছে—‘শূন্য অভিবাসন ব্যয়’ ধারণা কাগজে-কলমে থাকলেও বাস্তবে শ্রমিকদের বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ৩১ মে থেকে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি কর্মী প্রবেশ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। সে সময় দেশটির সরকার পূর্ব অনুমোদিত কর্মীদের নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে প্রবেশের নির্দেশ দেয়। এরপর আর কোনো নতুন কর্মী ভিসা ইস্যু করা হয়নি। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়েও একাধিক চেষ্টা করা হলেও বাজারটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি।

বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে আলোচনা শুরু করে। এ লক্ষ্যে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক ও প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন মালয়েশিয়া সফর করেন। তাদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত বৈঠকগুলোতে শ্রমবাজার পুনরায় চালু, ব্যয় কমানো এবং প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করার বিষয়ে আলোচনা হয়।

দুই দেশের যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, মধ্যস্থতাকারী কমিয়ে খরচ কমানো, নির্ভরযোগ্য সংস্থার মাধ্যমে নিয়োগ নিশ্চিত করা এবং আটকে থাকা শ্রমিকদের দ্রুত পাঠানোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি, এআই-নির্ভর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালুর উদ্যোগের কথাও উল্লেখ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই প্রযুক্তিনির্ভর বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম বাস্তবায়নে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে মানবপাচার সংক্রান্ত চলমান মামলাগুলো নিয়েও আলোচনা হয়েছে এবং আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করা হয়েছে।

কুয়ালালামপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী জানান, প্রবাসীদের সমস্যা সমাধান এবং নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ রাখতে সব প্রস্তাব স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।

অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহদী আমিন বলেন, অতীতের অব্যবস্থাপনা থেকে সৃষ্ট সংকট একদিনে সমাধান সম্ভব নয়। তবে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে, বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকদের অধিকার, নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে।

বিজ্ঞাপন

তবে অভিবাসন খাত সংশ্লিষ্টদের অনেকেই এখনো শঙ্কা কাটিয়ে উঠতে পারছেন না। তাদের মতে, পূর্বের সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী যদি প্রক্রিয়া এগোয়, তাহলে আবারও মালয়েশিয়ার হাতে এজেন্সি বাছাইয়ের ক্ষমতা চলে যাবে, যা সিন্ডিকেট ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারে।

বায়রার সাবেক নেতারা অভিযোগ করেছেন, অতীতেও ‘শূন্য খরচে কর্মী পাঠানো’সহ নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে শ্রমিকদের উচ্চ ব্যয়ের বোঝা বইতে হয়েছে। একই পরিস্থিতি আবার তৈরি হতে পারে বলেও তারা আশঙ্কা করছেন।

বিজ্ঞাপন

অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু বেশি সংখ্যক কর্মী পাঠানোর মানসিকতা থেকে বেরিয়ে এসে টেকসই ও স্বচ্ছ ব্যবস্থার দিকে নজর দেওয়া জরুরি। তাদের মতে, যথাযথ যাচাই-বাছাই ছাড়া তড়িঘড়ি করে বাজার চালু করলে ভবিষ্যতে আবারও সংকট তৈরি হতে পারে।

তারা আরও বলেন, অতীত চুক্তিগুলোর দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে নতুনভাবে কাঠামো সাজানো উচিত ছিল। প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছাড়া বাজার খুললে পুরোনো সমস্যার পুনরাবৃত্তি অনিবার্য হয়ে উঠতে পারে।

বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানির ইতিহাস দীর্ঘ। ১৯৭৮ সালে প্রথমবারের মতো ২৩ জন শ্রমিক সেখানে যান। ১৯৯২ সালে দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে শ্রমিক পাঠানো বাড়তে থাকে। ২০২৩ সালে সর্বোচ্চ ৩ লাখ ৫১ হাজারের বেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় গেছেন।

বিজ্ঞাপন

এখন প্রশ্ন—নতুন উদ্যোগের মাধ্যমে এই শ্রমবাজার কি সত্যিই স্বচ্ছ ও সবার জন্য উন্মুক্ত হবে, নাকি আবারও সীমিত গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে? উত্তর মিলবে বাস্তবায়নের ওপরই।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD