জ্বালানি সংকট: ইরানে নয়, যুদ্ধ যেন বাংলাদেশেই চলছে

রাজধানীতে জ্বালানি তেল সংগ্রহে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে ভোগান্তিতে পড়া মানুষের অভিজ্ঞতা এখন যেন এক ধরনের অস্থিরতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে। অনেকের ভাষায়, পরিস্থিতি এমন যে মনে হচ্ছে ইরানে নয়, দেশেই যুদ্ধ চলছে।
বিজ্ঞাপন
বৃহস্পতিবার (১৬ এপ্রিল) সকালে আজিমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে পলাশীগামী সড়কে কয়েক কিলোমিটারজুড়ে যানবাহনের সারি দেখা গেছে। ব্যক্তিগত গাড়ির জন্য অকটেন নিতে এসে দীর্ঘ লাইনে পড়েন হাজারীবাগের বাসিন্দা মুক্তার হোসেন। তিনি বলেন, জীবনে অনেক সংকট দেখেছেন, কিন্তু তেলের জন্য এমন দীর্ঘ অপেক্ষা আগে কখনও দেখেননি। তার মতে, মানুষের মধ্যে এখন এক ধরনের আতঙ্ক ও অস্থিরতা কাজ করছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, গার্হস্থ্য অর্থনীতি কলেজের সামনে থেকে শুরু হওয়া গাড়ির লাইন আজিমপুর, পলাশী হয়ে নীলক্ষেত পর্যন্ত বিস্তৃত। প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাস ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি রাস্তার একাংশ দখল করে রেখেছে।
বিজ্ঞাপন
শুধু একটি এলাকা নয়, রাজধানীর বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পেই একই চিত্র। অনেকেই ভোর থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ছেন। সকাল ৮টার দিকে তেল সরবরাহ শুরু হলেও দেরিতে আসা মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। প্রচণ্ড রোদে দাঁড়িয়ে থাকতে গিয়ে অনেকে ক্লান্ত হয়ে পড়ছেন; কেউ ছাতা ব্যবহার করছেন, কেউ গাছের ছায়ায় আশ্রয় নিচ্ছেন।

এদিকে লাইনে দাঁড়ানোকে কেন্দ্র করে কোথাও কোথাও উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। নীলক্ষেতে এক মোটরসাইকেল আরোহীকে ঘিরে বাগ্বিতণ্ডার ঘটনা ঘটে। অভিযোগ ওঠে, তিনি নিয়ম ভেঙে সামনে ঢোকার চেষ্টা করেন। পরে পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
পাম্প মালিকরা বলছেন, তারাও সংকটে রয়েছেন। একজন মালিক জানান, ডিপো থেকে প্রয়োজন অনুযায়ী তেল সরবরাহ করা হচ্ছে না। আগে যেখানে প্রতিদিন কয়েক হাজার লিটার তেল পাওয়া যেত, এখন তার অর্ধেকও মিলছে না। এতে করে পাম্প বন্ধ রাখতে হচ্ছে, আর গ্রাহকদের সঙ্গে ভুল বোঝাবুঝি বাড়ছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, ডিপো থেকে তেল লোড নিতে দীর্ঘ সময় লাগছে। সরবরাহে বিলম্ব হওয়ায় অনেক পাম্পে ‘তেল নেই’ নোটিশ ঝোলাতে হচ্ছে। এতে ব্যবসায়িক ক্ষতির পাশাপাশি সুনামও ক্ষুণ্ন হচ্ছে।
যদিও সরকারি পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, দেশে জ্বালানি তেলের কোনো ঘাটতি নেই। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে পর্যাপ্ত পরিমাণ ডিজেল, অকটেন, পেট্রোল ও ফার্নেস অয়েল মজুত রয়েছে এবং আগামী কয়েক মাসেও সংকটের আশঙ্কা নেই।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের এক কর্মকর্তা জানান, বৈশ্বিক পরিস্থিতির প্রভাব থাকলেও দেশে সরবরাহ ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখা হয়েছে। তবে অনেকেই আতঙ্কে প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। পাশাপাশি অবৈধ মজুতদারদের বিরুদ্ধেও অভিযান চালানো হচ্ছে।

ডিলার ও পাম্প মালিকদের সংগঠনের এক প্রতিনিধি বলেন, বাজারে তদারকি জোরদার হওয়ায় অবৈধভাবে মজুত করা তেল ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসছে। তবুও পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সংকটের পেছনে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং মানুষের মধ্যে আতঙ্ক—দুই-ই ভূমিকা রাখছে। তাদের মতে, চাহিদা বাড়লেও পাম্পের সংখ্যা বাড়েনি, ফলে চাপ তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে যারা পেশাগতভাবে জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল—যেমন রাইডাররা—তাদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেওয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
বিজ্ঞাপন
আন্তর্জাতিক পরিস্থিতির প্রভাবও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। ইরান-সংক্রান্ত উত্তেজনা ও হরমুজ প্রণালিতে জটিলতার কারণে অপরিশোধিত জ্বালানি আমদানি বিঘ্নিত হয়েছে। নির্ধারিত সময়েও কিছু জাহাজ তেল নিয়ে আসতে পারেনি, ফলে সরবরাহ চেইনে চাপ তৈরি হয়েছে।
সরকার বলছে মজুত রয়েছে, কিন্তু মাঠের চিত্র ভিন্ন—এই দ্বৈত বাস্তবতায় রাজধানীর মানুষ এখন দীর্ঘ লাইন, অপেক্ষা আর অনিশ্চয়তার মধ্যেই জ্বালানি সংগ্রহ করছে।








