ডিজেলের দাম বাড়ায় কিমি প্রতি ৪.০৫ টাকা ভাড়া চান বাস মালিকরা

দেশে চলমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে পরিবহন খাতে। এই পরিস্থিতিতে বাস ও ট্রাক মালিকরা ভাড়া পুনর্নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন। তারা দূরপাল্লার বাসের ক্ষেত্রে প্রতি কিলোমিটারে ভাড়া বাড়িয়ে ৪ টাকা ৫ পয়সা নির্ধারণের প্রস্তাব দিয়েছেন।
বিজ্ঞাপন
শনিবার (১৮ এপ্রিল) রাতে সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১১৫ টাকা নির্ধারণ করে, যা প্রায় ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি। এর ফলে পরিবহন খাতে পরিচালন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে রবিবার (১৯ এপ্রিল) মালিক সমিতির নেতারা দ্রুত ভাড়া সমন্বয়ের জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানান।
পূর্বের হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালের আগস্টে ডিজেলের দাম বড় পরিসরে বাড়ানো হলে পরিবহন ভাড়াও পুনর্নির্ধারণ করা হয়েছিল। সে সময় দূরপাল্লার বাসের ভাড়া ২ টাকা ২০ পয়সা নির্ধারণ করা হলেও পরে তা কমিয়ে ২ টাকা ১২ পয়সা করা হয়, যা এখন পর্যন্ত কার্যকর রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পরিবহন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু জ্বালানি নয়, সামগ্রিক ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বর্তমান ভাড়া দিয়ে যানবাহন পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক বাস মালিক জানান, গাড়ির যন্ত্রাংশ, রক্ষণাবেক্ষণ, টায়ার, ইঞ্জিন অয়েলসহ প্রায় সব খরচই গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। আগে যেখানে একটি টায়ারের জোড়া ৫০ হাজার টাকায় কেনা যেত, এখন তা ৭৪ থেকে ৮০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। একইভাবে ছোট যন্ত্রাংশ থেকে শুরু করে বড় স্পেয়ার পার্টস—সবকিছুর দাম প্রায় দ্বিগুণ বা তারও বেশি বেড়েছে।
গাড়ি কেনার খরচও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে বলে জানান তিনি। কয়েক বছর আগে একটি বাসের চেসিসের দাম ছিল প্রায় ২৪ লাখ টাকা, যা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৬ লাখ টাকায়। বডি নির্মাণ ব্যয়ও ১১ লাখ টাকা থেকে বেড়ে প্রায় ২০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। এর পাশাপাশি ব্যাংক ঋণের সুদের হারও ৯ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৩ শতাংশ হওয়ায় আর্থিক চাপ আরও বেড়েছে।
বিজ্ঞাপন
পরিবহন মালিকদের মতে, এসব বিবেচনায় ভাড়া অন্তত সাড়ে ৩ টাকা না হলে ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে। তবে তারা প্রস্তাবিত নতুন ভাড়া ৪ টাকা ৫ পয়সা নির্ধারণের বিষয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনায় যেতে চান।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির একটি সূত্র জানায়, ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে যন্ত্রাংশের খরচ বেড়েছে—এই বিবেচনায় আগে থেকেই কিলোমিটারপ্রতি ৩ টাকা ৭৫ পয়সা ভাড়ার প্রস্তাব দেওয়া ছিল। নতুন করে জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে সেটির সঙ্গে সমন্বয় করে এখন ৪ টাকা ৫ পয়সা প্রস্তাব করা হচ্ছে। এ বিষয়ে শিগগিরই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
সমিতির মহাসচিব মো. সাইফুল আলম বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাড়ার একটি দিকনির্দেশনা গেজেটে উল্লেখ করা হলে ভালো হতো। বর্তমানে মালিকরা বেশি দামে জ্বালানি কিনলেও আগের ভাড়ায় যাত্রী পরিবহন করতে হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে লোকসানের কারণ হতে পারে। দ্রুত এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, প্রতি বছর বাজেটের আগে একটি সমন্বিত হিসাব করে ভাড়া নির্ধারণ করা হলে তা দীর্ঘ সময়ের জন্য কার্যকর থাকতে পারে। এতে হঠাৎ পরিবর্তনের কারণে সৃষ্ট অস্থিরতা কমবে। বড় ধরনের অর্থনৈতিক পরিবর্তন হলে তখন আলাদাভাবে সমন্বয় করা যেতে পারে।
এদিকে, বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভাড়া বৃদ্ধির প্রস্তাব এলেই তা চূড়ান্ত হয়ে যায় না।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও যোগাযোগ বিশ্লেষক মো. হাদিউজ্জামান মনে করেন, প্রস্তাবটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে বিস্তারিতভাবে যাচাই-বাছাই করা প্রয়োজন। প্রতিটি ব্যয়ের খাত পৃথকভাবে বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
তিনি সতর্ক করে বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার ফলে শুধু পরিবহন নয়, সাধারণ মানুষের জীবনের অন্যান্য ক্ষেত্রেও ব্যয় বাড়বে। তাই ভাড়া নির্ধারণে যাত্রীদের ওপর অতিরিক্ত চাপ কতটা পড়বে, সেটিও গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করতে হবে। যেসব খাতের সঙ্গে জ্বালানির সরাসরি সম্পর্ক নেই, সেসব ক্ষেত্রে অযৌক্তিক ভাড়া বৃদ্ধি না করার পরামর্শ দেন তিনি।
তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) চেয়ারম্যানের নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ থাকায় কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।








