Logo

‘পদ্মা ব্যারাজ’ কী, দেশজুড়ে কেন এত আলোচনা?

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ মে, ২০২৬, ২০:১০
‘পদ্মা ব্যারাজ’ কী, দেশজুড়ে কেন এত আলোচনা?
ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ ছয় দশকের পরিকল্পনা, সমীক্ষা ও নানা জটিলতা পেরিয়ে অবশেষে চূড়ান্ত অনুমোদন পেয়েছে বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় অনুমোদনের মধ্য দিয়ে দেশের অন্যতম বৃহৎ পানি ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি হলো।

বিজ্ঞাপন

পদ্মা ব্যারাজ নিয়ে আলোচনা নতুন নয়। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান পানি ও বিদ্যুৎ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ প্রথম এ বিষয়ে সমীক্ষা শুরু করে। এরপর কয়েক দশকে একাধিক সম্ভাব্যতা যাচাই, কারিগরি বিশ্লেষণ ও নকশা প্রণয়ন করা হয়। নানা সময় প্রকল্পটি আলোচনায় এলেও এবারই প্রথম বাস্তবায়নের জন্য আনুষ্ঠানিক অনুমোদন মিলল।

পদ্মা ব্যারাজ মূলত একটি বৃহৎ পানি সংরক্ষণ ও নদী পুনরুজ্জীবন প্রকল্প। এর মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি ধরে রেখে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের নদীগুলোতে স্বাদু পানির প্রবাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাজবাড়ীর পাংশায় নির্মিত হবে মূল ব্যারাজ। এখানে প্রায় ২৯০ কোটি ঘনমিটার পানি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে পানির সংকটে থাকা বহু এলাকায় নদীর প্রবাহ ফিরবে এবং কৃষি ও পরিবেশে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।

প্রকল্পের আওতায় ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি ব্যারাজ নির্মাণ করা হবে। এতে থাকবে ৭৮টি স্পিলওয়ে বা পানি নির্গমন পথ, ১৮টি আন্ডার স্লুইস কাঠামো, মাছ চলাচলের জন্য বিশেষ ফিশ পাস, নৌযান চলাচলের লক এবং নদীতীর সুরক্ষা অবকাঠামো।

এ ছাড়া গড়াই, চন্দনা ও হিসনা নদীর জন্য পৃথক পানি গ্রহণ কাঠামো নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পের বড় একটি অংশজুড়ে রয়েছে নদী পুনঃখনন ও পানি প্রবাহ পুনরুদ্ধার কার্যক্রম। গড়াই-মধুমতি নদী ব্যবস্থায় প্রায় ১৩৫ দশমিক ৬ কিলোমিটার খনন এবং হিসনা নদী ব্যবস্থায় প্রায় ২৪৬ দশমিক ৪৬ কিলোমিটার পুনঃখননের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়া ব্যারাজের মাধ্যমে প্রায় ১৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ জলাধার তৈরি হবে, যা শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণে সহায়ক হবে।

পদ্মা ব্যারাজকে শুধু পানি নিয়ন্ত্রণ কাঠামো হিসেবেই দেখা হচ্ছে না। সরকার এটিকে বহুমুখী করিডর হিসেবে গড়ে তুলতে চায়। পরিকল্পনায় রয়েছে ব্যারাজের ওপর সড়ক নির্মাণ, বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইন স্থাপন এবং গ্যাস পাইপলাইন সংযোগ।

বিজ্ঞাপন

এ প্রকল্পের আওতায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থাও থাকবে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, ভবিষ্যতে এ প্রকল্প থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকারের হিসাবে, প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ২৩ লাখ ৯০ হাজার টন ধান এবং প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার টন মাছ উৎপাদন বাড়তে পারে।

বিজ্ঞাপন

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের প্রভাব বিস্তৃত হবে দেশের চারটি বিভাগের ২৬ জেলার ১৬৩ উপজেলায়। তবে প্রথম ধাপে সরাসরি সুবিধা পাবে অন্তত ১৯ জেলা ও ১২০ উপজেলা।

এর মধ্যে খুলনা বিভাগের কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, মাগুরা, যশোর, নড়াইল, বাগেরহাট, খুলনা ও সাতক্ষীরা; ঢাকা বিভাগের রাজবাড়ী, ফরিদপুর ও গোপালগঞ্জ; রাজশাহী বিভাগের পাবনা, রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ এবং বরিশাল বিভাগের পিরোজপুর উল্লেখযোগ্য।

প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে হিসনা-মাথাভাঙ্গা, গড়াই-মধুমতি, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল ও ইছামতি— এই পাঁচটি নদী ব্যবস্থায় পানিপ্রবাহ বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সরকার বলছে, এতে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততার প্রভাব কমবে, সুন্দরবনের প্রতিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সহায়তা মিলবে এবং নদীগুলোতে নাব্যতা ফিরবে।

এ ছাড়া যশোরের ভবদহসহ জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকাগুলোর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থাও উন্নত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ফারাক্কা ব্যারাজ নির্মাণের পর বাংলাদেশে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় পানিপ্রবাহ কমে যাওয়ায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু নদী শুকিয়ে যেতে শুরু করে। শুষ্ক মৌসুমে কৃষি, পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর এর বড় প্রভাব পড়ে।

বিজ্ঞাপন

এ বাস্তবতায় পদ্মা ব্যারাজকে দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনা সমাধান হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে প্রকল্পটি ঘিরে ভূ-রাজনৈতিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কারণ, ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে স্বাক্ষরিত গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরে শেষ হচ্ছে। ফলে ভবিষ্যৎ পানি বণ্টন পরিস্থিতিও প্রকল্পটির বাস্তবতায় প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে পদ্মা বা গঙ্গা ব্যারাজ নিয়ে চারটি প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা পরিচালিত হয়। পরে ২০০২ সালে পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ী অথবা রাজবাড়ীর পাংশায় ব্যারাজ নির্মাণের সুপারিশ করে।

বিজ্ঞাপন

এরপর ২০০৯ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বিস্তারিত সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও প্রকৌশল নকশা প্রণয়ন করা হয়। একই সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চলতে থাকে।

পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৫০ হাজার ৪৪৩ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। তবে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী প্রথম পর্যায়ে ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

বিজ্ঞাপন

২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে প্রথম ধাপের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

বুয়েটের বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মাশফিকুস সালেহীন মনে করেন, এটি দীর্ঘমেয়াদি পানি ব্যবস্থাপনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। তার মতে, শুষ্ক মৌসুমে পানিপ্রবাহ বাড়ানো গেলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ ও কিছু এলাকায় পরিবেশগত পুনরুদ্ধার সম্ভব হতে পারে।

তবে তিনি বলেন, পদ্মার মতো বড় নদীর গতিপ্রকৃতি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়। তাই প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নিয়মিত সমীক্ষা ও হালনাগাদ তথ্য বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD