দুর্ঘটনার ভয় উপেক্ষা করেই ট্রাক-পিকআপে বাড়ির পথে মানুষ

পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে দেশের মহাসড়কগুলোতে। তবে অতিরিক্ত বাসভাড়া ও সীমিত পরিবহন সংকটের কারণে এখনও অনেক নিম্নআয়ের মানুষ ঝুঁকিপূর্ণ ট্রাক ও পিকআপে করেই বাড়ি ফিরছেন। টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে রডবোঝাই ট্রাক দুর্ঘটনায় ১৫ জন নিহত হওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার পরও থামছে না এই অনিরাপদ ঈদযাত্রা।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (২৬ মে) সকাল থেকে গাজীপুরের চন্দ্রা ত্রিমোড় এবং ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া এলাকায় দেখা গেছে, শত শত মানুষ মালবাহী ট্রাক ও পিকআপে করে উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছেন। জীবনের ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন থাকলেও অতিরিক্ত ভাড়া এড়াতে বাধ্য হয়ে তারা এই পথ বেছে নিচ্ছেন।
গাজীপুরের কালিয়াকৈরের মৌচাক এলাকার একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন রাহেলা বেগম। ঈদ উপলক্ষে পাওয়া বেতন ও বোনাসের টাকা দিয়ে দুই মেয়ের কেনাকাটা শেষ করে এখন বাড়ি ফিরছেন সিরাজগঞ্জে। বাসে জনপ্রতি ৮০০ টাকা ভাড়া হওয়ায় তিনি দুই সন্তানকে নিয়ে একটি ট্রাকে উঠেছেন, যেখানে জনপ্রতি ভাড়া পড়েছে ৪০০ টাকা।
বিজ্ঞাপন
রাহেলা বলেন, সংসারের খরচ সামলে অতিরিক্ত ভাড়া দেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই ঝুঁকি জেনেও কম খরচে ট্রাকে বাড়ি ফিরতে হচ্ছে।
শুধু রাহেলা নন, এমন দৃশ্য এখন গাজীপুরের বিভিন্ন মহাসড়কে নিয়মিত দেখা যাচ্ছে। পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেকে খোলা ট্রাক ও পিকআপে উঠছেন। কেউ কেউ শিশুদের কোলে নিয়েই দীর্ঘ পথ পাড়ি দিচ্ছেন। এতে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়লেও সংশ্লিষ্টদের কার্যকর তৎপরতা খুব একটা চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ যাত্রীদের।
সরেজমিনে দেখা যায়, চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকায় দূরপাল্লার বাসের তুলনায় কম ভাড়ায় যাত্রী তুলছে বিভিন্ন ট্রাক ও পিকআপ। যাত্রীরা বলছেন, ঈদের সময় বাসভাড়া প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় তাদের সামনে বিকল্প খুব কম।
বিজ্ঞাপন
পিকআপচালক শামীম হোসেন জানান, সিরাজগঞ্জগামী যাত্রীদের কাছ থেকে তারা মাথাপিছু ৪০০ টাকা নিচ্ছেন। বাসে একই পথে ভাড়া ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা হওয়ায় যাত্রীরা নিজেরাই পিকআপে উঠছেন। স্থানীয় কিছু দালাল যাত্রী সংগ্রহ করে দেওয়ার বিনিময়ে কমিশনও নিচ্ছেন বলে জানান তিনি।
একই ধরনের তথ্য দেন মালবাহী ট্রাকচালক রাশেদুল। তিনি বলেন, মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দাঁড়ালেই যাত্রী পাওয়া যাচ্ছে। বাসের তুলনায় কম ভাড়া হওয়ায় যাত্রীরা ঝুঁকি নিয়েই ট্রাকে উঠছেন। কিছু মধ্যস্থতাকারী যাত্রী তুলে দেওয়ার কাজ করছেন, যাদের প্রতি যাত্রীর জন্য কমিশন দিতে হচ্ছে।
ট্রাকে বাড়ি ফেরা হাফেজ মিয়া নামে এক যাত্রী বলেন, মাসে মাত্র ১৫ হাজার টাকা আয় করেন তিনি। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে বাসে গেলে প্রায় ১ হাজার ৬০০ টাকা খরচ হতো। তাই বাধ্য হয়েই ট্রাকে উঠেছেন।
বিজ্ঞাপন
আক্ষেপ করে তিনি বলেন, সাধারণ সময়ে যে পথে ৪০০ টাকায় যাওয়া যায়, ঈদের সময় সেখানে ৮০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হচ্ছে। দরিদ্র মানুষের এই কষ্ট দেখার কেউ নেই বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে মহাসড়কে যানজট নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চন্দ্রা এলাকায় বিপুল সংখ্যক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। তবুও বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যেই ট্রাক ও পিকআপে যাত্রী পরিবহন চলতে দেখা গেছে।
বিজ্ঞাপন
গাজীপুর রিজিয়নের নাওজোড় হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সাউগাতুল আলম বলেন, বাস্তবতা অনেক কঠিন। যাত্রীসংখ্যার তুলনায় পর্যাপ্ত পরিবহন না থাকায় মানুষ বিকল্প উপায়ে যাতায়াত করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন হয়ে পড়ছে।
উল্লেখ্য, ঈদযাত্রার প্রথম দিন সোমবার সকালে গাজীপুর থেকে নওগাঁগামী একটি রডবোঝাই ট্রাক টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই ১৫ জন নিহত হন। চলতি ঈদযাত্রায় এটিই এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় সড়ক দুর্ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অতিরিক্ত ভাড়া, পরিবহন সংকট ও তদারকির অভাবের কারণে প্রতিবছরই ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহনে যাত্রী পরিবহনের ঘটনা বাড়ে। কার্যকর নজরদারি ও সাশ্রয়ী গণপরিবহন নিশ্চিত না হলে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধ করা কঠিন হবে।








