নারী ও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহতা তুলে ধরল ঢামেকের পরিসংখ্যান

দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান জানিয়েছেন, শুধু ২০২৫ সালেই ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে ১১০০ নারী ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এসেছেন। তার মতে, এই সংখ্যা সমাজে নারী ও শিশু নির্যাতনের বর্তমান বাস্তবতাকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
শনিবার (৬ জুন) রাজধানীতে আয়োজিত একটি গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ তথ্য তুলে ধরেন। শিশু সুরক্ষা, নারী নির্যাতন প্রতিরোধ এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে আয়োজিত এ আলোচনায় বিভিন্ন পর্যায়ের নীতিনির্ধারক, জনপ্রতিনিধি, চিকিৎসক, আইনজীবী ও গণমাধ্যমকর্মীরা অংশ নেন।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন, সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নিপুণ রায় চৌধুরী, জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি হাসান হাফিজ, আইনজীবী রাশনা ইমামসহ বিভিন্ন অঙ্গনের প্রতিনিধিরা। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বিএনপির স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম।
বিজ্ঞাপন
আলোচনায় অধ্যাপক কাজী গোলাম মোখলেছুর রহমান বলেন, ধর্ষণের অভিযোগ নিয়ে হাসপাতালে আসা নারীদের সংখ্যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এটি সমাজে বিদ্যমান সহিংসতা, নির্যাতন ও নিরাপত্তাহীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত। তিনি মনে করেন, নারী ও শিশুদের বিরুদ্ধে অপরাধ প্রতিরোধে আরও কার্যকর সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
গোলটেবিল বৈঠকে সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন শিশুদের সুরক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তুলতে পরিবারের ভূমিকার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, শিশুদের নৈতিক শিক্ষা এবং মানবিক আচরণের ভিত্তি পরিবার থেকেই গড়ে ওঠে। তাই শিশুদের দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে পরিবারকে আরও সক্রিয় হতে হবে। সামাজিক অবক্ষয় রোধে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজের সম্মিলিত ভূমিকা অপরিহার্য।
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে একটি জাতীয় পর্যায়ের শিশু সুরক্ষা টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন। তিনি বলেন, শিশু সুরক্ষা শুধু রাষ্ট্রের একক দায়িত্ব নয়; বরং সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে শিশুদের জন্য আরও নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব হবে।
বিজ্ঞাপন
আলোচনায় অংশগ্রহণকারীরা বলেন, শিশু ও নারী নির্যাতনের পেছনে সামাজিক অবক্ষয়, মাদকাসক্তি এবং অপরাধপ্রবণতা বড় ভূমিকা রাখছে। তারা মনে করেন, মাদকসহ সমাজের কয়েকটি প্রধান সমস্যা নিয়ন্ত্রণে আনা গেলে নির্যাতনের ঘটনাও উল্লেখযোগ্য হারে কমে আসতে পারে।
বক্তারা বলেন, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক আন্দোলন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নৈতিক মূল্যবোধের চর্চা জোরদার করা প্রয়োজন। সমাজের প্রতিটি স্তরে সচেতনতা তৈরি না হলে শুধু আইন দিয়ে এ ধরনের অপরাধ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হবে।
গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা আরও বলেন, নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। যদি মানুষ নিজেকে নিরাপদ মনে না করে, তাহলে উন্নয়ন ও অগ্রগতির নানা সূচকও অর্থবহ হয়ে ওঠে না। নারী ও শিশুদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করতে হলে শুধু অপরাধ সংঘটনের পর ব্যবস্থা নিলেই হবে না, বরং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বিজ্ঞাপন
সম্প্রতি আলোচিত শিশু রামিসা হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গও উঠে আসে আলোচনায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত রামিসার বাবা তার মেয়ের ওপর নির্যাতন ও হত্যার ঘটনায় দ্রুত বিচার এবং দোষীদের সর্বোচ্চ শাস্তি কার্যকরের দাবি জানান।
তার বক্তব্যে উপস্থিত অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি।
বিজ্ঞাপন
আলোচনায় অংশ নেওয়া বিশেষজ্ঞ, চিকিৎসক, আইনজীবী ও জনপ্রতিনিধিরা একমত পোষণ করেন যে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে কেবল কঠোর আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, প্রশাসন ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
তাদের মতে, সচেতনতা বৃদ্ধি, নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক প্রতিরোধ এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে শিশু ও নারীদের জন্য একটি নিরাপদ পরিবেশ গড়ে তোলা সম্ভব।
গোলটেবিল বৈঠকের শেষে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়। পাশাপাশি শিশু সুরক্ষা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় সামাজিক আন্দোলন জোরদার করার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।








