Logo

জামায়াতের নারী এমপিদের পোশাক নিয়ে সংসদে তোলপাড়!

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৪ জুন, ২০২৬, ২০:৩৬
জামায়াতের নারী এমপিদের পোশাক নিয়ে সংসদে তোলপাড়!
ছবি: সংগৃহীত

জাতীয় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক ও পরিচয় প্রসঙ্গে করা মন্তব্যকে কেন্দ্র করে কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য মনিরুল হক চৌধুরী ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছেন। তার বক্তব্যের পর সংসদ কক্ষে উত্তেজনা, প্রতিবাদ এবং হট্টগোলের সৃষ্টি হলে ডেপুটি স্পিকার হস্তক্ষেপ করে বক্তব্যের বিতর্কিত অংশ সংসদীয় কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেন।

বিজ্ঞাপন

রবিবার (১৪ জুন) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশন এবং প্রথম বাজেট অধিবেশনের ষষ্ঠ কার্যদিবসে সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনার সময় এ ঘটনা ঘটে। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল।

বাজেট আলোচনায় অংশ নিয়ে মনিরুল হক চৌধুরী জামায়াতে ইসলামীর সমালোচনা করতে গিয়ে প্রায় দুই দশক আগের একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বিরোধী দলের নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক ও পর্দা বিষয়ে মন্তব্য করেন। এ সময় জামায়াতের সংসদ সদস্যরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে আসন ছেড়ে দাঁড়িয়ে যান। মুহূর্তেই অধিবেশন কক্ষে উত্তপ্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

বিজ্ঞাপন

ডেপুটি স্পিকার বারবার সংসদ সদস্যদের শান্ত হওয়ার আহ্বান জানালেও কিছু সময়ের জন্য পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। পরে তিনি সংশ্লিষ্ট বক্তব্যকে সংসদীয় শিষ্টাচারবহির্ভূত উল্লেখ করে কার্যবিবরণী থেকে অপসারণের নির্দেশ দেন।

ঘটনার পর ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, জাতীয় সংসদ ব্যক্তিগত আক্রমণ কিংবা কারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে মন্তব্য করার স্থান নয়। তিনি সবাইকে সংসদের মর্যাদা, শালীনতা এবং আত্মসম্মান বজায় রাখার আহ্বান জানান।

তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের আচরণ দেশের মানুষের কাছে সংসদের ভাবমূর্তি তুলে ধরে। তাই ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও সাংবিধানিক অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো প্রত্যেক সদস্যের দায়িত্ব।

বিজ্ঞাপন

সমালোচনার মুখে মনিরুল হক চৌধুরী সংসদে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, তার বক্তব্যের কোনো অংশে যদি কারও আত্মসম্মান বা অনুভূতিতে আঘাত লেগে থাকে, তাহলে সেই অংশ কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছেন।

এর পাশাপাশি তিনি তার বক্তব্যে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন উদ্যোগ এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বের প্রশংসাও করেন। কুমিল্লা-ঢাকা রেলপথ প্রকল্প ও আঞ্চলিক যোগাযোগ উন্নয়নের বিভিন্ন উদ্যোগের জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানান তিনি।

ঘটনার পর বিরোধীদলীয় হুইপ নাহিদ ইসলাম বিষয়টি নিয়ে সংসদে কঠোর প্রতিক্রিয়া জানান। তিনি অভিযোগ করেন, মনিরুল হক চৌধুরী শুধু নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক নিয়েই মন্তব্য করেননি, বরং বিরোধীদলীয় উপনেতার পরিবারের সদস্যকেও কটাক্ষ করেছেন।

বিজ্ঞাপন

নাহিদ ইসলাম বলেন, সংসদ সদস্যদের ধর্মীয় বিশ্বাস, পোশাক বা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিয়ে বিদ্রূপাত্মক মন্তব্য কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি এ ধরনের বক্তব্যকে অমার্জনীয়, অসাংসদীয় এবং বর্ণবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।

তার মতে, জাতীয় সংসদের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দাঁড়িয়ে কোনো সদস্যের ব্যক্তিগত বা ধর্মীয় পরিচয়কে লক্ষ্য করে মন্তব্য করা সাংবিধানিক মূল্যবোধের পরিপন্থী।

নিজ বক্তব্যে মনিরুল হক চৌধুরী ২০০১ সালের পর একটি পারিবারিক অনুষ্ঠানের স্মৃতিচারণ করেন। সেখানে জামায়াতের এক সাবেক সংসদ সদস্য ও তার স্ত্রীর প্রসঙ্গ তুলে তিনি এমন কিছু মন্তব্য করেন, যা বিরোধী দলীয় সদস্যরা নারীদের প্রতি অসম্মানজনক বলে অভিযোগ করেন।

বিজ্ঞাপন

পরে তিনি বর্তমান সংসদে থাকা জামায়াতের নারী সদস্যদের দিকেও ইঙ্গিত করে কিছু বক্তব্য দেন, যা তাৎক্ষণিকভাবে বিরোধী দলের সদস্যদের ক্ষুব্ধ করে তোলে।

বিতর্কের পর পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি স্পিকারের কাছে কথা বলার সুযোগ নিয়ে মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, সংসদে বিভিন্ন সময় রসিকতা বা রাজনৈতিক কৌতুকের অবকাশ থাকে এবং বিষয়টি সেই প্রেক্ষাপটে দেখা উচিত।

বিজ্ঞাপন

তবে ডেপুটি স্পিকার তাকে থামিয়ে দিয়ে স্পষ্ট করেন যে, কোনো বক্তব্য একবার কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে সেটি নিয়ে নতুন করে ব্যাখ্যা বা সাফাই দেওয়ার সুযোগ নেই।

পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠলে চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সংসদীয় বিধির কথা উল্লেখ করে বলেন, কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ উঠলে তার নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করার সুযোগ থাকা উচিত।

তিনি স্পিকারের কাছে মনিরুল হক চৌধুরীকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার অনুরোধ জানান। জবাবে ডেপুটি স্পিকার পরিস্থিতি শান্ত রাখার স্বার্থে পরবর্তী সময়ে বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দেন।

বিজ্ঞাপন

ঘটনার পর ডেপুটি স্পিকার একটি রুলিং জারি করে বলেন, ভবিষ্যতে কোনো সংসদ সদস্য যেন অন্য কারও ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, পোশাক, ধর্মীয় চর্চা বা ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে মন্তব্য না করেন। তিনি সংসদের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখতে সব সদস্যকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানান।

দিনের শেষে বাজেট আলোচনার চেয়ে মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যকে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কই সংসদ অধিবেশনের প্রধান আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হয়। সংসদে শালীনতা, ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি সম্মান এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD