Logo

এক বছরে বিচারাধীন মামলা ২০ লাখে নামানোর আশা আইনমন্ত্রীর

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২১ জুলাই, ২০২৬, ১৬:৫০
এক বছরে বিচারাধীন মামলা ২০ লাখে নামানোর আশা আইনমন্ত্রীর
ছবি: সংগৃহীত

দেশে বিচারাধীন মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমাতে এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা (প্রি-ফাইলিং মেডিয়েশন) কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, এ কার্যক্রম সফলভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে আগামী এক বছরের মধ্যে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা প্রায় সাড়ে ৪৫ লাখ থেকে কমিয়ে প্রায় ২০ লাখে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে।

বিজ্ঞাপন

মঙ্গলবার (২১ জুলাই) আইন মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষ থেকে ভার্চুয়ালি ১০ জেলায় বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রমের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

আইনমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে বিচারকের তুলনায় দেশে মামলার সংখ্যা অত্যন্ত বেশি। প্রায় ৪৫ লাখ মামলা সুপ্রিম কোর্ট থেকে শুরু করে জেলা ও অধস্তন আদালত পর্যন্ত বিচারব্যবস্থার ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে শুধু প্রচলিত আদালতনির্ভর বিচার নয়, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থাকেও আরও কার্যকর ও শক্তিশালী করতে হবে।

তিনি জানান, চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পরিচালিত পরীক্ষামূলক (পাইলট) কার্যক্রমে ইতিবাচক ফল পাওয়া গেছে। বিভিন্ন ধরনের মামলায় উল্লেখযোগ্য হারে নতুন মামলা কমেছে, যা বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতার কার্যকারিতা প্রমাণ করে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পরিসংখ্যান তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, পারিবারিক আদালত আইনে ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় ২০২৬ সালের একই সময়ে মামলা প্রায় ৫১ শতাংশ কমেছে। একইভাবে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইনে মামলার সংখ্যা ২৪ থেকে ১৮-তে নেমে এসেছে।

এছাড়া সিভিল জজ আদালতের এখতিয়ারভুক্ত বণ্টনসংক্রান্ত মামলার সংখ্যা ২ হাজার ১টি থেকে কমে ৬৬১টিতে দাঁড়িয়েছে, যা প্রায় ৬৭ শতাংশ হ্রাসের সমান।

তিনি আরও জানান, স্টেট অ্যাকুইজিশন অ্যান্ড টেন্যান্সি আইনের প্রি-এম্পশন সংক্রান্ত মামলায় সবচেয়ে বেশি অগ্রগতি দেখা গেছে। এ আইনে মামলা ১৭টি থেকে কমে মাত্র ২টিতে নেমে এসেছে, যা প্রায় ৮৮ শতাংশ হ্রাস।

বিজ্ঞাপন

পিতামাতার ভরণপোষণ আইন এবং নন-অ্যাগ্রিকালচারাল টেন্যান্সি আইনেও মামলার সংখ্যা কমেছে বলে জানান মন্ত্রী।

বিশেষ করে যৌতুক নিরোধ আইনের মামলার পরিসংখ্যান উল্লেখ করে তিনি বলেন, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত সময়ে যেখানে ৫ হাজার ৬০৫টি মামলা দায়ের হয়েছিল, সেখানে ২০২৬ সালের একই সময়ে তা কমে ১ হাজার ৮১০টিতে দাঁড়িয়েছে। অর্থাৎ এ ক্ষেত্রে প্রায় ৬৮ শতাংশ মামলা কমেছে।

আইনমন্ত্রী জানান, বিভিন্ন আইনে গড়ে প্রায় ৬২ দশমিক ২ শতাংশ নতুন মামলা কমেছে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আদালতে প্রতিদিন নতুন করে মামলা জমা হওয়ার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে।

বিজ্ঞাপন

তিনি বিচারকদের উদ্দেশে বলেন, যেসব মামলায় আপস-মীমাংসার সুযোগ রয়েছে, সেগুলো প্রাথমিক পর্যায়েই জেলা লিগ্যাল এইড অফিস অথবা অনুমোদিত মধ্যস্থতাকারীদের কাছে পাঠানোর উদ্যোগ নিতে হবে। আদালতে মামলা দায়ের হওয়ার পরও যদি সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তি করা যায়, তাহলে বিচারপ্রার্থীদের সময়, অর্থ ও ভোগান্তি অনেকাংশে কমে আসবে।

মো. আসাদুজ্জামান বলেন, মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকায় সাধারণ মানুষ শুধু মানসিক চাপেই থাকেন না, আর্থিকভাবেও ক্ষতিগ্রস্ত হন। তাই দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

তিনি গণমাধ্যমের প্রতিও আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা প্রদান অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালিত এই মধ্যস্থতা কার্যক্রম সম্পর্কে জনগণকে আরও বেশি জানাতে হবে। সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই সেবা সম্পর্কে মানুষ যত বেশি সচেতন হবে, আদালতের বাইরে আইনসম্মত উপায়ে বিরোধ নিষ্পত্তির প্রবণতাও তত বাড়বে।

বিজ্ঞাপন

আইনমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু মামলার সংখ্যা কমানো নয়; বরং অসহায়, দরিদ্র ও বিচারপ্রার্থী মানুষের জন্য সহজ, দ্রুত এবং সাশ্রয়ী ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি কক্সবাজার জেলার উদাহরণ দিয়ে বলেন, বর্তমানে সেখানে এক লাখেরও বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে, যা উদ্বেগজনক। সংশ্লিষ্ট জেলা জজ, চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট, লিগ্যাল এইড কর্মকর্তা ও বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের আগামী সেপ্টেম্বরের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মামলা মধ্যস্থতার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখানোর আহ্বান জানান তিনি।

অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ আইনগত সহায়তা প্রদান অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো. মনজুরুল হোসেন বলেন, বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য দ্রুত, সহজ এবং কম খরচে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার কার্যকর মাধ্যম। তিনি বলেন, ১০ জেলায় বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক যাত্রা দেশের বিচারব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক।

তিনি আরও জানান, অতীতে অনেক উদ্যোগ পরীক্ষামূলক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমান কার্যক্রমের ইতিবাচক ফলাফলের ভিত্তিতে সরকার এটিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে। এর ফলে আদালতের ওপর মামলার চাপ কমবে এবং সাধারণ মানুষ দীর্ঘমেয়াদি মামলা ও অতিরিক্ত ব্যয়ের বোঝা থেকে অনেকটাই মুক্তি পাবেন।

বিজ্ঞাপন

অনুষ্ঠানে জানানো হয়, বগুড়া, ঠাকুরগাঁও, পটুয়াখালী, ভোলা, নড়াইল, যশোর, ফরিদপুর, কক্সবাজার, পঞ্চগড় এবং টাঙ্গাইল—এই ১০ জেলায় আনুষ্ঠানিকভাবে বাধ্যতামূলক মামলাপূর্ব মধ্যস্থতা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, দ্রুত ও জনবান্ধব করার উদ্যোগ বাস্তবায়নের নতুন ধাপ শুরু হলো।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD