Logo

আজও অনেককে তাড়া করে সেই জুলাই আন্দোলনের ৩৬ দিনের স্মৃতি

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৫ জুলাই, ২০২৬, ১৭:১০
আজও অনেককে তাড়া করে সেই জুলাই আন্দোলনের ৩৬ দিনের স্মৃতি
ছবি: সংগৃহীত

দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ৩৬ দিনের উত্তাল সময় এখনো অনেক মানুষের স্মৃতিতে অমলিন। রাজধানীর মিরপুর, শাহবাগ, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় যারা সেই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলেন, তাদের কাছে টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া, সংঘর্ষ আর আহত মানুষের আর্তনাদ আজও যেন চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

বিজ্ঞাপন

কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন ধীরে ধীরে দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গণআন্দোলনে পরিণত হয়। প্রথমে সরকারি চাকরিতে বৈষম্য দূর করে মেধাভিত্তিক নিয়োগ নিশ্চিত করার দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে নামলেও পরবর্তী সময়ে আন্দোলনের পরিধি ও দাবির ধরন বদলে যায়। শেষ পর্যন্ত এটি তৎকালীন সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে রূপ নেয় এবং টানা ৩৬ দিনের আন্দোলনের পর ৫ আগস্ট সরকারের পতনের মধ্য দিয়ে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে।

কোটা আন্দোলন থেকে গণআন্দোলন

২০২৪ সালের জুনের শেষ দিকে সরকারি চাকরির কোটা বাতিলসংক্রান্ত পরিপত্র অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্ট। এর পরপরই জুলাইয়ের শুরুতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন শুরু করেন।

বিজ্ঞাপন

প্রথম দিকে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, ক্লাস-পরীক্ষা বর্জন এবং সড়ক অবরোধের মতো কর্মসূচি পালিত হলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আন্দোলন আরও বিস্তৃত হয়। দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠনের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। আন্দোলনে টিয়ারশেল, সাউন্ড গ্রেনেড, লাঠিচার্জ ও রাবার বুলেট ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে এবং হতাহতের ঘটনাও ঘটে।

মিরপুর-১০: দোকান ছেড়ে আন্দোলনে যোগ দেন অনেকেই

রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বর এলাকায় চশমা বিক্রেতা মাইনুদ্দিন এখনো সেই দিনের কথা ভুলতে পারেননি।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তার ভাষ্য, প্রতিদিনের মতো সেদিনও সকালেই দোকান খুলেছিলেন। কিছুক্ষণ পর আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নামতে শুরু করেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া শুরু হয়। সারাদিনই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করে এবং পরে সেনাবাহিনী এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।

তিনি জানান, সংঘর্ষ শুরু হওয়ার পর আশপাশের অনেক ফুটপাত ব্যবসায়ী দোকান বন্ধ করে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আন্দোলনে যোগ দেন। তাদের অনেকেই আহতও হয়েছিলেন।

মিরপুর-১০ গোলচত্বর এলাকার আরেক দোকানদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, শিক্ষার্থীরা কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচির অংশ হিসেবে সেখানে অবস্থান নিলে পুলিশ টিয়ারশেল ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। কিছু সময় পর আন্দোলনকারীরা বিভিন্ন গলি থেকে আবারও একত্রিত হন। পরে ওই এলাকায় পুলিশ বক্সে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে বলে তিনি জানান।

বিজ্ঞাপন

শাহবাগে আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার দৃশ্য

শাহবাগ এলাকায় একটি হোটেলে কর্মরত শাহজাহান জানান, আন্দোলনের সময়কার দৃশ্য এখনো তার মনে স্পষ্ট।

তিনি বলেন, একদিন বিকেলে শাহবাগে অবস্থান করার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দিক থেকে শিক্ষার্থীদের একটি মিছিল এগিয়ে আসে। পুলিশ ব্যারিকেড দিলেও আন্দোলনকারীরা সামনে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়।

বিজ্ঞাপন

তার দাবি, সংঘর্ষের সময় টিয়ারশেল নিক্ষেপ করা হচ্ছিল এবং কয়েকজন আহত আন্দোলনকারীকে রক্তাক্ত অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে তিনি বারডেম হাসপাতালের ভেতরে আশ্রয় নেন এবং পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে সেখান থেকে বাসায় ফিরে যান।

মোহাম্মদপুরে সংঘর্ষ ও গোলাগুলির স্মৃতি

রায়েরবাজারের বাসিন্দা আলমগীর স্মরণ করেন, সরকার পতনের আগের দিন সকাল থেকেই মোহাম্মদপুর বাসস্ট্যান্ড এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

তার বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্র নিয়ে এলাকায় অবস্থান নেন। পরে মাদরাসাশিক্ষার্থীসহ আন্দোলনকারীরা রাস্তায় নেমে ব্যারিকেড তৈরি করেন। বিকেলের দিকে সংঘর্ষ আরও তীব্র হয়ে ওঠে।

তিনি বলেন, পুলিশ রাবার বুলেট ও টিয়ারশেল নিক্ষেপ করছিল, অন্যদিকে আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছুড়ছিলেন। গোলাগুলির ঘটনাও ঘটেছিল বলে দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্যমতে, অন্তত ১০ জন আহত হন এবং একজনের মৃত্যুর খবরও সে সময় শুনেছিলেন।

যেভাবে বদলে যায় আন্দোলনের গতিপথ

বিজ্ঞাপন

১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে ছাত্রলীগের সংঘর্ষের পর পরিস্থিতি দ্রুত উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ১৬ জুলাই সংঘর্ষ রাজধানীর বাইরে দেশের বিভিন্ন জেলায় ছড়িয়ে পড়ে। ওই সময় বিভিন্ন স্থানে সংঘর্ষে কয়েকজন নিহত হন।

১৭ জুলাই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে শিক্ষার্থীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু পরদিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন 'কমপ্লিট শাটডাউন' কর্মসূচি ঘোষণা করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

১৮ জুলাই রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষ, প্রাণহানি ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় হামলার ঘটনা ঘটে। এরপর যাত্রাবাড়ী, রামপুরা, উত্তরা, মিরপুর ও মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ১৯ জুলাই রাত থেকে সারা দেশে কারফিউ জারি এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। শুরুতে সীমিত সময়ের জন্য কারফিউ শিথিল করা হলেও পরে ধাপে ধাপে সেই সময় বাড়ানো হয়।

সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ১৭ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত পাঁচ দিনের সহিংসতায় ১৫০ জনের মৃত্যু হয় এবং আহত হন কয়েকশ মানুষ। সংঘর্ষের পর শুরু হয় গ্রেফতার অভিযান। এর জবাবে আন্দোলনকারীরা হত্যার বিচার, গ্রেফতার বন্ধসহ নতুন নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেন।

একপর্যায়ে আন্দোলনের মূল দাবি পরিবর্তিত হয়ে তৎকালীন সরকারপ্রধান ও মন্ত্রিসভার পদত্যাগের এক দফা দাবিতে পরিণত হয়। দেশজুড়ে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হলে পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠে।

দুই বছর পরও স্মৃতি অম্লান

জুলাই আন্দোলনের দুই বছর পরও সেই সময়ের প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, এটি শুধু একটি আন্দোলন ছিল না; বরং বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানুষের সম্মিলিত প্রতিবাদের প্রতীক হয়ে উঠেছিল। ধর্ম, বর্ণ ও রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিন্নতা ভুলে বিপুলসংখ্যক মানুষ এতে অংশ নিয়েছিলেন।

রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের ভাষ্যমতে, টানা ৩৬ দিনের সেই আন্দোলনের প্রতিটি দিন ছিল অনিশ্চয়তা, আতঙ্ক ও প্রতিরোধের গল্পে ভরা। সময় পেরিয়ে গেলেও রাজপথের সেই সংঘর্ষ, আহত মানুষের আর্তনাদ এবং উত্তাল দিনগুলোর স্মৃতি আজও তাদের মনে গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD