Logo

এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ, দীর্ঘ হচ্ছে গ্যাস সংকটের দুর্ভোগ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৯ জুলাই, ২০২৬, ১৪:০৯
এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ, দীর্ঘ হচ্ছে গ্যাস সংকটের দুর্ভোগ
ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজারের মহেশখালীতে অবস্থিত একটি ভাসমান এলএনজি (তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস) টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। মেরামতকাজ শুরু হলেও চলতি মাসের মধ্যে টার্মিনালটি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা না থাকায় আবাসিক, শিল্প ও পরিবহন—সব খাতেই গ্যাস সংকট আরও কিছুদিন অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।

বিজ্ঞাপন

গত ২১ জুলাই মহেশখালীতে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে আগুন লাগে। ঘটনার পরপরই টার্মিনালটির কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। এর ফলে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গেছে, যা দেশের সামগ্রিক জ্বালানি পরিস্থিতিকে আরও চাপে ফেলেছে।

বাংলাদেশে আমদানিকৃত এলএনজি পুনঃবাষ্পীভবনের মাধ্যমে জাতীয় গ্যাস গ্রিডে সরবরাহের জন্য দুটি ভাসমান টার্মিনাল রয়েছে। এ দুটি টার্মিনালের সম্মিলিত সরবরাহ সক্ষমতা দৈনিক প্রায় ১ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে একটি টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

পেট্রোবাংলা সূত্র জানায়, টার্মিনালের বয়লার থেকে বের হওয়া সিগন্যালবাহী বৈদ্যুতিক তারে শর্টসার্কিটের কারণে অগ্নিকাণ্ডের সূত্রপাত হয়। ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতে বিদেশি প্রকৌশলীরা ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছেন। তবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাংশ প্রতিস্থাপন এবং নিরাপত্তা পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত টার্মিনালটি পুনরায় চালু করা সম্ভব হবে না।

বিজ্ঞাপন

বর্তমানে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে সরবরাহ করা হয় প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দুটি এলএনজি টার্মিনাল থেকেই আসে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাস। একটি টার্মিনাল অচল হয়ে পড়ায় প্রায় ৪৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ কমে গিয়ে মোট সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ২২০ কোটি ঘনফুটে। ফলে আগে যেখানে চাহিদার তুলনায় ঘাটতি ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ, এখন তা বেড়ে প্রায় ৪৫ শতাংশে পৌঁছেছে।

পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইনস) মো. রফিকুল ইসলাম জানিয়েছেন, টার্মিনালটি মেরামতের কাজ চলমান থাকলেও এ মাসের মধ্যে তা চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। পুরোপুরি কার্যক্রমে ফিরতে আরও কিছু সময় লাগবে।

আবাসিক গ্রাহকদের দুর্ভোগ চরমে

বিজ্ঞাপন

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে আবাসিক গ্রাহকদের ওপর। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত চুলায় গ্যাস না থাকায় রান্নাবান্না কার্যত ব্যাহত হচ্ছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে বাইরে থেকে খাবার কিনে খাচ্ছেন কিংবা গভীর রাতে গ্যাস এলে রান্নার কাজ সারছেন।

রাজধানীর মগবাজারের এক বাসিন্দা জানান, দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাস থাকে না। ফলে প্রতিদিনের খাবার প্রস্তুত করাই কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে মোহাম্মদপুরের আরেক বাসিন্দা বলেন, গ্যাসের চাপ এত কম যে একটি সাধারণ রান্নাও শেষ করতে অনেক বেশি সময় লেগে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার বিকল্প হিসেবে এলপিজি সিলিন্ডার কিংবা ইনডাকশন চুলা ব্যবহার শুরু করেছেন। তবে এতে মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। একদিকে নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে, অন্যদিকে বিকল্প জ্বালানির জন্য অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

তিতাস গ্যাসের মহাব্যবস্থাপক (অপারেশন) কাজী মোহাম্মদ সাইদুল হাসান জানান, তিতাসের অধীন এলাকায় দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুট হলেও বর্তমানে সরবরাহ নেমে এসেছে প্রায় ১২০ কোটি ঘনফুটে। এলএনজি টার্মিনাল সচল না হওয়া পর্যন্ত এই ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে না।

সিএনজি স্টেশনেও দীর্ঘ অপেক্ষা

গ্যাসের সংকটের প্রভাব পড়েছে সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতেও। রাজধানীর অধিকাংশ স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে। অনেক চালক প্রয়োজনীয় পরিমাণ গ্যাস না পেয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন।

বিজ্ঞাপন

সিএনজিচালকদের অভিযোগ, এক স্টেশন থেকে আরেক স্টেশনে ঘুরেও অনেক সময় পর্যাপ্ত গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে দৈনিক নির্ধারিত ট্রিপ কমাতে হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে তাদের আয়-রোজগারের ওপর।

দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধানে জোর দেওয়ার পরামর্শ

জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে এ ধরনের সংকট আরও প্রকট হয়ে উঠছে। তারা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদে সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, নতুন কূপ খনন এবং উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই।

বিজ্ঞাপন

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ইজাজ হোসেইনের মতে, দেশে গ্যাসের সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও দীর্ঘদিন ধরে দেশীয় অনুসন্ধানের চেয়ে আমদানির ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান ও উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগ আরও আগে নেওয়া হলে বর্তমান সংকটের মাত্রা অনেকটাই কমানো সম্ভব হতো। তাঁর মতে, ভবিষ্যতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশীয় সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করাই হবে সবচেয়ে কার্যকর ও টেকসই সমাধান।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD