Logo

দেশের ইতিহাসে বর্তমান বিরোধী দল সবচেয়ে দুর্বল: মির্জা হাসান

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩ আগস্ট, ২০২৬, ১৮:২৩
দেশের ইতিহাসে বর্তমান বিরোধী দল সবচেয়ে দুর্বল: মির্জা হাসান
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় দেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দুর্বল বিরোধী দল বিদ্যমান রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) জ্যেষ্ঠ গবেষণা ফেলো মির্জা এম হাসান। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগ রাজনীতির সক্রিয় পরিসরে নেই, জামায়াতে ইসলামী এখনো পুরোপুরি আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এখনো তুলনামূলক ছোট রাজনৈতিক শক্তি হওয়ায় বিরোধী রাজনীতির কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়েছে।

বিজ্ঞাপন

সোমবার (৩ আগস্ট) রাজধানীর মহাখালীর ব্র্যাক সেন্টারে আয়োজিত ‘বাংলাদেশে গণতন্ত্রের বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক দিনব্যাপী সম্মেলনের উদ্বোধনী অধিবেশনে ‘ট্রাজেক্টরি অব নন-ডেমোক্রেসি ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তিনি এসব মন্তব্য করেন। পরে প্রশ্নোত্তর পর্বেও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা এম হাসান বলেন, বর্তমানে বাংলাদেশে নিপীড়নের একটি অপেক্ষাকৃত লঘু চিত্র দেখা যাচ্ছে। তবে আগামী এক বছরের মধ্যে এর আরও কঠোর রূপ প্রকাশ পেতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। তাঁর ভাষায়, দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একই ধরনের প্রবণতা বারবার ফিরে এসেছে।

তিনি দাবি করেন, রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ বা প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে শক্তি ও সহিংসতার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, কোনো রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব বিস্তারের সক্ষমতা অনেকাংশেই ক্ষমতার ভারসাম্যের ওপর নির্ভর করে। এ প্রসঙ্গে তিনি বিএনপি, এনসিপি এবং রাষ্ট্রের পারস্পরিক সম্পর্কেরও বিশ্লেষণ তুলে ধরেন।

বিজ্ঞাপন

জামায়াত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দলটি বর্তমানে নিজেদের একটি উদার ও ভদ্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। তবে তারা অপেক্ষাকৃত সংযত অবস্থান গ্রহণ করেছে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।

মির্জা এম হাসান বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কার্যকর ও শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক জোটের অভাব রয়েছে। তাঁর মতে, আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতি, জামায়াতের সতর্ক রাজনৈতিক অবস্থান এবং এনসিপির সীমিত সাংগঠনিক সক্ষমতা—এই তিনটি কারণ মিলেই বিরোধী রাজনীতিকে দুর্বল করে তুলেছে।

সম্মেলনে আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি ‘অ্যাকসেস অর্ডার’ তত্ত্বের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, একটি রাজনৈতিক এলিট জোট তখনই স্থিতিশীল থাকে, যখন ক্ষমতাসীনরা প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিদেরও রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করে। বাংলাদেশে সেই অন্তর্ভুক্তিমূলক কাঠামো গড়ে ওঠেনি বলেই রাজনৈতিক সংঘাত অব্যাহত রয়েছে বলে তিনি মত দেন।

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর সংবিধান সংস্কার এবং রাজনৈতিক পরিবর্তনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা মূলত অভিজাত রাজনৈতিক গোষ্ঠীকেন্দ্রিক ছিল। তাঁর মতে, সে সময়ের প্রক্রিয়ায় নারীদের অংশগ্রহণ এবং বহুমাত্রিক প্রতিনিধিত্ব সীমিত ছিল।

গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের বক্তব্যে মির্জা এম হাসান বলেন, বাংলাদেশে যদি শ্রীলঙ্কা বা ভারতের মতো নির্বাচনী গণতন্ত্রও প্রতিষ্ঠিত হয়, তবুও তা দীর্ঘমেয়াদে ভঙ্গুর হওয়ার ঝুঁকি থাকবে। তাই তিনি নাগরিকদের সরাসরি অংশগ্রহণভিত্তিক ‘ডিরেক্ট ডেমোক্রেসি’ বা প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের ধারণা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন।

তিনি গণতন্ত্রের তিনটি ভিন্ন ধারণা ব্যাখ্যা করে বলেন, প্রথমটি কেবল প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনকেন্দ্রিক, দ্বিতীয়টি নির্বাচন, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের সমন্বয়ে গঠিত এবং তৃতীয়টি সরাসরি গণতন্ত্র, যেখানে নাগরিকরা নীতিনির্ধারণ ও শাসনপ্রক্রিয়ায় সরাসরি অংশগ্রহণ করেন। তাঁর দাবি, ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রেও বর্তমানে প্রত্যক্ষ গণতন্ত্র নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

মূল প্রবন্ধে তিনি আরও উল্লেখ করেন, জুলাই-পরবর্তী সময়ে নতুন রাজনৈতিক ও নাগরিক শক্তির উত্থান ঘটলেও সেগুলো স্থায়ী ও শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হতে পারেনি। এর ফলে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো আবারও সুবিধাজনক অবস্থানে ফিরে এসেছে।

তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের পর বিএনপি ধীরগতির রাজনৈতিক কৌশল অনুসরণ করছে, জামায়াত মূলধারার রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে এবং এনসিপি নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থান সুসংহত করার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে।

অনুষ্ঠানে বিআইজিডির নির্বাহী পরিচালক ইমরান মতিন স্বাগত বক্তব্য দেন। দিনব্যাপী এ সম্মেলনের বিভিন্ন অধিবেশনে ভোটার আচরণ, রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবর্তিত বাস্তবতা এবং বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এতে দ্য ডেইলি স্টারের সম্পাদক মাহফুজ আনাম, আইনজীবী সারা হোসেনসহ বিভিন্ন গবেষক, শিক্ষাবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD