Logo

নাট্যমঞ্চ থেকে বঙ্গভবন, ফখরুলের এক বর্ণাঢ্য জীবনের রূপরেখা

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৩ আগস্ট, ২০২৬, ১৭:৪৫
নাট্যমঞ্চ থেকে বঙ্গভবন, ফখরুলের এক বর্ণাঢ্য জীবনের রূপরেখা
ছবি : এআই দিয়ে তৈরি

ছাত্রজীবনের রাজনীতি, নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেকে কর্মজীবনে শিক্ষকতা—এরপর সরকারি দায়িত্ব, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং বিএনপির মহাসচিব। দীর্ঘ কয়েক দশকের রাজনৈতিক ও পেশাগত পথ পেরিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এখন দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেওয়ার দ্বারপ্রান্তে।

বিজ্ঞাপন

বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের পর বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মির্জা ফখরুলকে দলীয় প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই দিন তার পক্ষে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়।

রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নেন মির্জা ফখরুল। আগামী ২০ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।

ঠাকুরগাঁও থেকে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রে

বিজ্ঞাপন

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি ঠাকুরগাঁওয়ে জন্ম মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। রাজনৈতিক পরিবেশে বেড়ে উঠলেও নিজের রাজনৈতিক পথচলা শুরু করেন ছাত্রজীবনেই।

ঢাকা কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন তিনি। সেখান থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে পড়াশোনার পাশাপাশি ছাত্ররাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন মির্জা ফখরুল। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক ছাত্ররাজনীতিতেও তার সক্রিয় ভূমিকা ছিল।

বিজ্ঞাপন

ছাত্রজীবনে নাট্যচর্চা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন তিনি। ফলে রাজনীতিতে প্রবেশের আগেই তার অভিজ্ঞতার পরিধিতে সংস্কৃতি, নাট্যচর্চা ও ছাত্র আন্দোলন—তিনটি ক্ষেত্রই যুক্ত হয়েছিল।

শিক্ষকতা দিয়ে কর্মজীবনের শুরু

শিক্ষাজীবন শেষ করে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেন মির্জা ফখরুল। ১৯৭২ সালে বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারে যোগ দিয়ে ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরে বিভিন্ন সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করেন।

বিজ্ঞাপন

কর্মজীবনের একটি পর্যায়ে রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের সঙ্গেও যুক্ত হন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তৎকালীন উপপ্রধানমন্ত্রী এস এ বারীর ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তিনি।

পরবর্তী সময়ে আবার শিক্ষকতায় ফিরে গেলেও ১৯৮৬ সালে সরকারি চাকরি ছেড়ে সক্রিয় রাজনীতিতে পুরোপুরি আত্মনিয়োগ করেন।

পৌর রাজনীতি থেকে বিএনপিতে

বিজ্ঞাপন

১৯৮৮ সালের ঠাকুরগাঁও পৌরসভা নির্বাচনে অংশ নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন মির্জা ফখরুল। এরপর এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপির রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত হন।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে বিএনপির সাংগঠনিক রাজনীতিতে তার উত্থান শুরু হয়। ১৯৯২ সালে ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতির দায়িত্ব পান। ধীরে ধীরে তৃণমূলের নেতৃত্ব পেরিয়ে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে উঠে আসেন তিনি।

দলের বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করে একসময় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন। তার রাজনৈতিক পরিচিতির অন্যতম বড় দিক হয়ে ওঠে মাঠের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং দলীয় অবস্থান গণমাধ্যমে তুলে ধরা।

বিজ্ঞাপন

সংসদ সদস্য থেকে প্রতিমন্ত্রী

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে জয়ী হয়ে প্রথমবার সংসদ সদস্য হন মির্জা ফখরুল।

বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী এবং পরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

বিজ্ঞাপন

২০০৮ সালের নির্বাচনে পরাজিত হলেও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তার গুরুত্ব কমেনি। বরং দলীয় সাংগঠনিক কার্যক্রমে তার ভূমিকা আরও দৃশ্যমান হয়।

২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শপথ নেননি। পরে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শপথ না নেওয়ায় আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়।

বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব

বিজ্ঞাপন

২০০৯ সালের জাতীয় কাউন্সিলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হন মির্জা ফখরুল। ২০১১ সালে তৎকালীন মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর তাকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়।

প্রায় পাঁচ বছর ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনের পর ২০১৬ সালের জাতীয় সম্মেলনে বিএনপির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব নির্বাচিত হন তিনি।

এরপর দীর্ঘ সময় ধরে দলের অন্যতম প্রধান নীতিনির্ধারক ও মুখপাত্র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন মির্জা ফখরুল। বিএনপির রাজনৈতিক কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, আন্দোলন এবং দলীয় বক্তব্য তুলে ধরার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন দলের সবচেয়ে পরিচিত মুখগুলোর একজন।

বিজ্ঞাপন

বিরোধী দলের রাজনীতির সময়ে একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাবরণও করতে হয়েছে তাকে। কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দেশে থেকে দলীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনায় তার ভূমিকা বিএনপির অভ্যন্তরে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

২০২৬ সালে নতুন রাজনৈতিক অধ্যায়

২০২৬ সালে বিএনপি সরকার গঠন করার পর মির্জা ফখরুল স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। একই সঙ্গে তিনি বিএনপির মহাসচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন।

এরপর রাষ্ট্রপতি পদে তার মনোনয়ন দেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করেছে।

১৩ আগস্ট বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্বের বৈঠকের পর মির্জা ফখরুলকে রাষ্ট্রপতি পদে দলীয় প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত জানানো হয়। একই দিন তার মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন পাওয়ার পর মহাসচিব ও মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে তার সরে দাঁড়ানোর বিষয়টিও সামনে আসে। ফলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে ঘিরে আলোচনার পাশাপাশি বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সামনে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের চূড়ান্ত ধাপ

নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী ১৬ আগস্ট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই হবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট। একাধিক প্রার্থী বৈধ থাকলে ২০ আগস্ট জাতীয় সংসদে ভোট অনুষ্ঠিত হবে।

আরও পড়ুন

সংসদ সদস্যদের ভোটেই রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। বর্তমান সংসদে বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে দলটির মনোনীত প্রার্থীর নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রাজনৈতিকভাবে শক্তিশালী।

তবে সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মির্জা ফখরুলকে আনুষ্ঠানিকভাবে রাষ্ট্রপতি বলা যাবে না।

ব্যক্তিজীবনেও রাজনৈতিক ঐতিহ্য

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের স্ত্রী রাহাত আরা বেগম। তাদের দুই মেয়ে রয়েছেন। তার পারিবারিক জীবনেও রাজনীতির প্রভাব রয়েছে।

তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন আইনজীবী ও রাজনীতিক। পরিবারের অন্য সদস্যদের মধ্যেও রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের ইতিহাস রয়েছে।

তবে মির্জা ফখরুলের নিজের রাজনৈতিক উত্থান এসেছে দীর্ঘ সময়ের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, মাঠের রাজনীতি এবং কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের ধারাবাহিক অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।

নাট্যমঞ্চ থেকে বঙ্গভবনের সম্ভাব্য যাত্রা

একসময় নাট্যমঞ্চে অভিনয় করা তরুণ, পরে শিক্ষক হিসেবে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান, সরকারি প্রশাসনে দায়িত্ব পালন, পৌরসভার চেয়ারম্যান, সংসদ সদস্য, প্রতিমন্ত্রী এবং দীর্ঘ সময় বিএনপির মহাসচিব—মির্জা ফখরুলের জীবনপথে একাধিক ভিন্ন অধ্যায় রয়েছে।

সেই দীর্ঘ পথচলার পর এবার তার সামনে দেশের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক দায়িত্ব গ্রহণের সম্ভাবনা।

আগামী ২০ আগস্টের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন এবং পরবর্তী সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই নির্ধারণ করবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক যাত্রা শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনে গিয়ে থামে কি না।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD