স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি ছিলেন যারা

১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদে একাধিক ব্যক্তি দায়িত্ব পালন করেছেন। কেউ নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, আবার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক পরিবর্তনের বিভিন্ন পর্যায়ে কেউ ভারপ্রাপ্ত বা অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও পালন করেছেন।
বিজ্ঞাপন
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিতেও সময়ের সঙ্গে পরিবর্তন এসেছে। ১৯৯১ সালের আগে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সরাসরি জনগণের ভোটের বিধান ছিল। পরে সংসদীয় ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়ার ব্যবস্থা চালু হয়।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রপতি পদে দায়িত্ব পালনকারীদের ধারাবাহিক ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ, সামরিক শাসন, গণতান্ত্রিক আন্দোলন, সরকার পরিবর্তন এবং সাংবিধানিক সংস্কারের নানা অধ্যায় উঠে এসেছে।
শেখ মুজিবুর রহমান
বিজ্ঞাপন
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকার গঠিত হলে শেখ মুজিবুর রহমানকে রাষ্ট্রপতি করা হয়। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি।
তবে ২৫ মার্চের কালরাতে পাকিস্তানি বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে নিয়ে যাওয়ায় তার অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
সৈয়দ নজরুল ইসলাম
বিজ্ঞাপন
শেখ মুজিবুর রহমানের অনুপস্থিতিতে সৈয়দ নজরুল ইসলাম মুজিবনগর সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি এই দায়িত্বে ছিলেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রবাসী সরকারের কার্যক্রম পরিচালনায় তার ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী
১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন বিচারপতি আবু সাঈদ চৌধুরী। স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করেন।
বিচারপতি চৌধুরী এর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।
বিজ্ঞাপন
১৯৭৩ সালের ২৪ ডিসেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
মোহাম্মদউল্লাহ
আবু সাঈদ চৌধুরীর পদত্যাগের পর মোহাম্মদউল্লাহ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৭৪ সালের ২৪ জানুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং ২৭ জানুয়ারি শপথ গ্রহণ করেন।
বিজ্ঞাপন
১৯৭৫ সালের ২৫ জানুয়ারি পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী সময়ে শেখ মুজিবুর রহমানের সরকারে ভূমি প্রশাসন ও ভূমি সংস্কার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান।
খন্দকার মোশতাক আহমদ
১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ৬ নভেম্বর পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির পদে ছিলেন। তার শাসনামল ছিল মাত্র ৮৩ দিনের।
বিজ্ঞাপন
বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম
খন্দকার মোশতাক আহমদের পতনের পর ১৯৭৫ সালের ৬ নভেম্বর বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণের পর সংসদ ও মন্ত্রিপরিষদ ভেঙে দিয়ে দেশে সামরিক আইন জারি করেন এবং প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্বও গ্রহণ করেন।
১৯৭৬ সালের ২৯ নভেম্বর তিনি প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের পদ ছেড়ে সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানকে ওই দায়িত্ব দেন। পরের বছর ২১ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির দায়িত্বও জিয়াউর রহমানের কাছে হস্তান্তর করে তিনি অবসর নেন।
বিজ্ঞাপন
জিয়াউর রহমান
১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ১ নম্বর সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের অধিনায়ক ছিলেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বের জন্য তাকে ‘বীর উত্তম’ খেতাব দেওয়া হয়। ১৯৮১ সালে চট্টগ্রামে এক সামরিক বিদ্রোহের সময় তিনি নিহত হন।
বিচারপতি আব্দুস সাত্তার
বিজ্ঞাপন
জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন উপরাষ্ট্রপতি ও বিচারপতি আব্দুস সাত্তার প্রথমে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। পরে ১৯৮১ সালের ১৫ নভেম্বর অনুষ্ঠিত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে তিনি প্রায় ৬৬ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন।
তবে ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করলে আব্দুস সাত্তার রাষ্ট্রপতির পদ থেকে অপসারিত হন।
এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরী
এরশাদ ক্ষমতা দখলের কয়েক দিন পর ১৯৮২ সালের ২৭ মার্চ এ এফ এম আহসানউদ্দিন চৌধুরী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি হাইকোর্টের অতিরিক্ত বিচারপতি এবং পরে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের বিচারপতি ছিলেন। এরশাদের চাপের মুখে ১৯৮৩ সালের ১১ ডিসেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান।
হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ
আহসানউদ্দিন চৌধুরীর পদত্যাগের পর সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় পার্টি প্রতিষ্ঠা করেন এবং ওই দলের মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন। তার শাসনামলে দেশে সামরিক ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলন তীব্র হয়।
১৯৯০ সালের গণআন্দোলনের মুখে ৬ ডিসেম্বর তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ
এরশাদের পদত্যাগের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নেন। ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৯১ সালের ৯ অক্টোবর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকারের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হয় এবং তিনি আবার প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে ফিরে যান।
পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার তাকে আবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত করে। ১৯৯৬ সালের ৯ অক্টোবর থেকে ২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর পর্যন্ত তিনি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
আবদুর রহমান বিশ্বাস
১৯৯১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর আবদুর রহমান বিশ্বাস রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। তিনি বিএনপি সরকারের সময়ে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তার মেয়াদ শেষ হয় ১৯৯৬ সালের ৮ অক্টোবর।
এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী
২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। তিনি বি. চৌধুরী নামে পরিচিত ছিলেন। ২০০২ সালে রাষ্ট্রপতি ভবনকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট রাজনৈতিক বিতর্কের পর তিনি পদত্যাগ করেন।
পরে তিনি বিকল্পধারা বাংলাদেশ নামে একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করেন।
জমির উদ্দিন সরকার
বি. চৌধুরীর পদত্যাগের পর নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত জমির উদ্দিন সরকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। তিনি পেশায় আইনজীবী ছিলেন এবং জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবেও দুই দফায় দায়িত্ব পালন করেন।
ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ
২০০২ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদ রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। ২০০৬ সালের রাজনৈতিক সংকটের সময় তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার অতিরিক্ত দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি রাজনৈতিক অচলাবস্থার মধ্যে প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়িয়ে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন।
২০০৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেন।
জিল্লুর রহমান
২০০৯ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জিল্লুর রহমান রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এর আগে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা জিল্লুর রহমান দলের কঠিন রাজনৈতিক সময়েও নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
আরও পড়ুন
২০১৩ সালের ২০ মার্চ সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।
আবদুল হামিদ
জিল্লুর রহমান অসুস্থ হয়ে বিদেশে চিকিৎসাধীন থাকার সময় ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ তৎকালীন জাতীয় সংসদের স্পিকার আবদুল হামিদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন এবং বাংলাদেশের ২১তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি দুই মেয়াদে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন।
মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন
২০২৩ সালে আওয়ামী লীগ মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিনকে রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়ন দেয়। ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। জাতীয় সংসদের তৎকালীন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী তাকে শপথ পাঠ করান।
২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর তার পদত্যাগের দাবি জোরালো হয়। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের ২৪ জুলাই তিনি রাষ্ট্রপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রপতি পদে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি পদের ইতিহাস শুধু ব্যক্তিদের দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতা নয়; এর সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তনও গভীরভাবে যুক্ত।
১৯৭২ সালে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা চালুর পর রাষ্ট্রপতির পদ ছিল অনেকাংশে আনুষ্ঠানিক। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর রাষ্ট্রপতি আবার নির্বাহী ক্ষমতার কেন্দ্র হয়ে ওঠেন। এরপর সামরিক শাসনামলে রাষ্ট্রপতির পদ আরও শক্তিশালী রাজনৈতিক ভূমিকা পায়।
১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের পর আবার সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা সীমিত হয় এবং রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের পদ্ধতিও পরিবর্তিত হয়। ১৯৯১ সালের পর সংসদ সদস্যদের ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যবস্থা চালু রয়েছে।
ফলে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিদের ইতিহাস মূলত দেশের রাজনৈতিক বিবর্তনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। মুক্তিযুদ্ধের মুজিবনগর সরকার থেকে শুরু করে সামরিক শাসন, গণআন্দোলন, সংসদীয় গণতন্ত্র এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তন—প্রতিটি পর্যায়ের ছাপ রাষ্ট্রপতি পদটির ইতিহাসে স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়।








