বিদ্যুৎ অফিসে বইছে ভয়ের স্রোত, ফেসবুকে আকুতি কর্মকর্তাদের

দেশজুড়ে তীব্র লোডশেডিংয়ের প্রভাব শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাতেই পড়ছে না, চরম চাপের মুখে পড়েছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও। বিদ্যুৎ না থাকার জন্য গ্রাহকদের ক্ষোভ, ফোনে গালাগালি, এমনকি হামলার হুমকির অভিযোগও উঠছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে গিয়ে অনেক কর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের অসহায়ত্ব প্রকাশ করে গ্রাহকদের কাছে বাস্তব পরিস্থিতি বোঝানোর চেষ্টা করছেন।
বিজ্ঞাপন
কর্মীদের বক্তব্যের মূল কথা—পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না। জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়া যায়, সেটিই গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করা হয়। ফলে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ কমে গেলে তাদের পক্ষেও স্বাভাবিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয় না।
‘আজকের লোডশেডিংয়ের ভার আমার কাঁধে দিয়েন না’
মাঠপর্যায়ে কর্মরত বিদ্যুৎকর্মীদের মানসিক চাপের বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন পোস্টেও উঠে এসেছে। মাদারীপুর এলাকার এক কর্মী ‘বিদ্যুৎ প্রতিদিন’ নামের ফেসবুক পেজে নিজের ছবি প্রকাশ করে লিখেছেন, ‘আজকে রাতের লোডশেডিংয়ের ভার আমার কাঁধে দিয়েন না।’
বিজ্ঞাপন

রাজশাহীর বিদ্যুৎকর্মীদের নিয়ে পরিচালিত ‘রাজশাহীর লাইনম্যান পিবিএস এর প্রাণ’ নামের একটি পেজেও নিরাপত্তাহীনতার কথা তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়েছে, অফিসে ভাঙচুর কিংবা কর্মীদের ওপর হামলার আশঙ্কায় তারা আতঙ্কের মধ্যে রয়েছেন।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
খুলনা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির এক কর্মীও গ্রাহকদের উদ্দেশে ক্ষোভ ও অনুরোধের সুরে বলেন, বিদ্যুৎকর্মীদের অযথা গালাগালি কিংবা দোষারোপ না করতে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিগুলো নিজেরা বিদ্যুৎ উৎপাদন করে না; জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া বিদ্যুৎ গ্রাহকদের মধ্যে বিতরণ করে।
বিজ্ঞাপন

একসঙ্গে আসছে হাজারো ফোন
বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের অভিযোগের বড় একটি অংশ গিয়ে পড়ছে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের কর্মীদের ওপর। কর্মীদের কেউ কেউ জানিয়েছেন, একটি অফিসে দায়িত্বে থাকা একজন কর্মীর কাছে একসঙ্গে চার-পাঁচটি ফোন থাকে। এর বিপরীতে হাজার হাজার গ্রাহক ফোন করায় সব কলের উত্তর দেওয়া সম্ভব হয় না।
তাদের অভিযোগ, অনেক গ্রাহক বিদ্যুৎ না থাকার কারণে ক্ষুব্ধ হয়ে ফোনে অশালীন ভাষায় কথা বলেন এবং কর্মীদের ব্যক্তিগতভাবে দায়ী করেন। দীর্ঘ সময় ধরে এ ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হওয়ায় মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যে মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ অনেক কম
স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসগুলোর বিভিন্ন বার্তা থেকেও জাতীয় গ্রিড থেকে পাওয়া বিদ্যুতের ঘাটতির চিত্র পাওয়া যাচ্ছে।

‘পল্লী বিদ্যুৎ খোকসা, কুষ্টিয়া’ পেজের এক বার্তায় জানানো হয়েছে, পিক আওয়ারে এলাকায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৪ মেগাওয়াট হলেও বটতৈল গ্রিড থেকে বরাদ্দ পাওয়া যাচ্ছে মাত্র ৪ দশমিক ৫ মেগাওয়াট। ফলে দীর্ঘ সময় লোডশেডিং করতে হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
চব্বিশ ঘণ্টার নির্দিষ্ট লোডশেডিং শিডিউল দিতে না পারার কারণ হিসেবে গ্রিড থেকে বরাদ্দের পরিমাণ বারবার পরিবর্তিত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে আগে থেকে তৈরি করা শিডিউলও ঠিকভাবে অনুসরণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
গ্রাহকদের পরিস্থিতি বোঝাতে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ অফিসগুলো নিয়মিত সতর্কতামূলক বার্তাও প্রকাশ করছে।
নিরাপত্তা চেয়ে পুলিশের দ্বারস্থ পল্লী বিদ্যুৎ
বিজ্ঞাপন
দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং নিয়ে ক্ষোভ বাড়তে থাকায় পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কার্যালয় ও বিদ্যুৎ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পরিস্থিতির অবনতির পর কয়েকটি জেলার পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বিদ্যুৎকেন্দ্র, স্থানীয় কার্যালয় এবং কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ সুপার ও সংশ্লিষ্ট থানায় লিখিত আবেদন করেছে।
এর আগে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুৎ অ্যাসোসিয়েশনও দেশের ৮০টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রিড, উপকেন্দ্র ও অফিসে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছে। তাদের আশঙ্কা, লোডশেডিং নিয়ে জনরোষের কারণে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ অবকাঠামো হামলার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
বিজ্ঞাপন
জাতীয় গ্রিডে বড় ঘাটতি
চলমান সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুতের বড় ঘাটতির কথা উঠে এসেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস ও কয়লার সংকটের পাশাপাশি বিদ্যুৎ আমদানি কমে যাওয়ায় উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ তৈরি হয়েছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
প্রতিবেদনে দেওয়া বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্য অনুযায়ী, পিক আওয়ারে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ১৬ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। বিপরীতে উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতি প্রতিদিন প্রায় ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার ৬০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত পৌঁছাচ্ছে।
বিজ্ঞাপন

গ্যাস সংকটও বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় প্রভাব ফেলছে। পিজিসিবির তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ৭০ কোটি ঘনফুট। এর ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উল্লেখযোগ্য উৎপাদন সক্ষমতা কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে গ্রামাঞ্চল
জাতীয় পর্যায়ে উৎপাদন ও সরবরাহের ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির আওতাধীন গ্রাহকদের ওপর। বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামীণ এলাকায় দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ থাকায় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, কোথাও কোথাও দিনে ৮ থেকে ১২ ঘণ্টা বা তারও বেশি সময় লোডশেডিং হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, কৃষক ও সাধারণ পরিবারের মানুষকে নানা ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
একদিকে বিদ্যুৎ না থাকায় গ্রাহকদের ক্ষোভ বাড়ছে, অন্যদিকে সেই ক্ষোভের বড় অংশ সামলাতে হচ্ছে স্থানীয় পল্লী বিদ্যুৎ কর্মীদের। ফলে বিদ্যুৎ সংকট এখন শুধু সরবরাহের সমস্যা নয়, মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা ও মানসিক চাপেরও বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।








