Logo

ডিজিটাল সেবা তখনই কার্যকর, যখন তা মানুষের জীবনকে সহজ করে

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১২ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৩৮
ডিজিটাল সেবা তখনই কার্যকর, যখন তা মানুষের জীবনকে সহজ করে
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল করার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে উল্লেখ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান। তবে তাঁর মতে, ডিজিটাল সেবা তখনই কার্যকর, যখন তা বাস্তবে মানুষের জীবনকে সহজ করে।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (১২ আগস্ট) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এসব কথা বলেন তিনি। একই পোস্টে বাংলাদেশে নিজের দ্বিতীয়বারের মতো ড্রাইভিং টেস্ট দেওয়ার অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন জাইমা রহমান।

পোস্টে জাইমা রহমান জানান, গত সপ্তাহে বাংলাদেশে গাড়ি চালানোর অনুমতির জন্য তিনি দ্বিতীয়বার ড্রাইভিং টেস্ট দিয়েছেন। এর আগে ১০ বছরেরও বেশি সময় আগে লন্ডনে প্রথম ড্রাইভিং পরীক্ষা দিয়েছিলেন। দুই ক্ষেত্রেই প্রথমবার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেও বাস্তবে গাড়ি চালানোর প্রস্তুতির ক্ষেত্রে দুই পরীক্ষার অভিজ্ঞতায় পার্থক্য রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশে ড্রাইভিং পরীক্ষা ও লাইসেন্স পাওয়ার পুরো প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে গিয়ে শুধু লাইসেন্স বা পরীক্ষার বিষয়টি নয়, বরং দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনা এবং সড়ক ব্যবহারকারীদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক নিয়েও ভাবনার কথা জানান তিনি।

জাইমা রহমান বলেন, অনেক তরুণ বাংলাদেশির, বিশেষ করে ঢাকার তরুণদের মধ্যে একটি মৌলিক হতাশা রয়েছে। তাদের কাছ থেকে নিয়ম মেনে চলার প্রত্যাশা করা হলেও যে ব্যবস্থার মধ্যে তাদের চলতে হয়, সেটি সবসময় নিরাপদ কিংবা অনুমানযোগ্য মনে হয় না।

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, পথচারীদের অনেক সময় পর্যাপ্ত ক্রসিং ছাড়াই দ্রুতগতির সড়ক পার হতে হয়। কোথাও ফুটপাত হঠাৎ শেষ হয়ে যায়, কোথাও আবার তা দখল হয়ে থাকে। পাশাপাশি বাস, মোটরসাইকেল, রিকশা ও ব্যক্তিগত গাড়ির ভিড়ের মধ্য দিয়ে পথ চলতে হয়, যেগুলো অনেক সময় ভিন্ন ভিন্ন অলিখিত নিয়মে পরিচালিত হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

যাত্রীদের অসহায়ত্বের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, বাস যাত্রী তোলার জন্য অন্য বাসের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করবে কি না, হঠাৎ ব্রেক করবে কি না, গাড়িটির যান্ত্রিক সক্ষমতা ঠিক আছে কি না কিংবা চালক যথাযথ প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম পেয়েছেন কি না—এসব বিষয়ে একজন যাত্রীর হাতে কার্যত কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

নতুন চালকদের জন্যও নিয়ম মেনে চলার ক্ষেত্রে নানা প্রশ্ন তৈরি হয় বলে উল্লেখ করেন জাইমা। তাঁর প্রশ্ন—নিয়মগুলো আসলে কী, কেন সেগুলো সবার ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ হয় না, সঠিক প্রক্রিয়া কী এবং অনলাইনে আবেদন করার পরও কেন অনেক ক্ষেত্রে অফিসে গিয়ে বিষয়টি সমাধান করতে হয়?

তিনি আরও প্রশ্ন তোলেন, দালালের মাধ্যমে কেন অনেক সময় কাজ দ্রুত হয়ে যায় এবং পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পরও কেন প্রয়োজনীয় কাগজ হাতে পেতে মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়।

বিজ্ঞাপন

বিআরটিএর বিভিন্ন সেবা ডিজিটাল করার উদ্যোগকে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি উল্লেখ করে জাইমা রহমান বলেন, ডিজিটাল ব্যবস্থা তখনই কার্যকর, যখন সেটি সত্যিকার অর্থে মানুষের জীবন সহজ করে। অনলাইনে শুরু করা কোনো সমস্যার সমাধান যদি শেষ পর্যন্ত ‘অফিসে এসে কথা বলুন’ পর্যায়ে গিয়ে থেমে যায়, তাহলে সেটিকে প্রকৃত অর্থে ডিজিটাল সেবা বলা যায় না।

তাঁর মতে, প্রয়োজন ছাড়া নাগরিককে সশরীরে অফিসে যেতে বাধ্য করা হলে দেরি, পক্ষপাত কিংবা লেনদেনের সুযোগ তৈরি হয়। এই ব্যবস্থার দুর্বলতাকে কাজে লাগায় মধ্যস্থতাকারীরা। মানুষ আইন ভাঙতে চায় বলে নয়, বরং সরকারি প্রক্রিয়া যখন অত্যন্ত জটিল হয়ে ওঠে, তখন মধ্যস্থতাকারীই সহজ পথ হিসেবে সামনে আসে। এর ফলে দুর্নীতি ব্যতিক্রম না থেকে কাজ আদায়ের স্বাভাবিক পদ্ধতিতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন জাইমা। লাইসেন্স, গাড়ির ফিটনেস, চালকের প্রশিক্ষণ ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে ভালো আইন ও নীতিমালা থাকলেও সেগুলোর প্রয়োগ যদি বাছাই করে করা হয়, তাহলে মানুষের মধ্যে আইন ও নিয়মের প্রতি আস্থা কমে যায়।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি প্রশ্ন রাখেন, একজন নতুন চালককে নিয়ম মানার গুরুত্ব বোঝানো হলেও তার চোখের সামনে যদি ফিটনেসবিহীন যানবাহন, বেপরোয়া গাড়ি চালানো ও বিভিন্ন ধরনের আইন লঙ্ঘন চলতে থাকে, তাহলে সে নিয়মের প্রতি কতটা শ্রদ্ধাশীল থাকবে?

জাইমা রহমান বলেন, দুর্নীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু অন্যায় সংঘটিত হওয়া নয়, বরং অন্যায়ের প্রতিকার পাওয়ার প্রক্রিয়াটিও গুরুত্বপূর্ণ। মানুষ যদি মনে করে অভিযোগ করে কোনো লাভ হবে না, বরং নিজের ভোগান্তিই বাড়বে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সে পরিচিত বা প্রভাবশালী কারও মাধ্যমে কাজ করানোর পথ বেছে নিতে পারে। এভাবেই অনিয়মের চক্র চলতে থাকে।

বিজ্ঞাপন

সড়ক নিরাপত্তাকে শুধু গাড়ি, লাইসেন্স ও শাস্তির বিষয় হিসেবে না দেখার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, সড়ক নিরাপত্তার কেন্দ্রে থাকতে হবে প্রতিদিন সড়ক ব্যবহার করা মানুষগুলোকে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে হেঁটে যাওয়া শিক্ষার্থী, সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরা নারী, পরবর্তী অর্ডার পাওয়ার তাড়ায় থাকা ফুড ডেলিভারি রাইডার, দীর্ঘ সময় গাড়ি চালানো বাসচালক, ব্যস্ত সড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করা প্রতিবন্ধী ব্যক্তি কিংবা জীবিকার জন্য রিকশা চালানো ব্যক্তি—প্রত্যেকের কাছে একই সড়কের অভিজ্ঞতা ভিন্ন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

জাইমা রহমানের মতে, ভালো নীতিমালাকে এসব বাস্তবতা বিবেচনায় নিতে হবে। তা না হলে নিয়মের প্রয়োগ দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ সড়ক ব্যবহারকারীদের আরও বেশি অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দিতে পারে। এর ফলে শোষণ ও ঘুষের নতুন সুযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিজ্ঞাপন

নিরাপদ সড়কের দাবিতে তরুণদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর বক্তব্যে ২০১৮ সালের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রসঙ্গ আসে। সে সময় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে লাইসেন্স পরীক্ষা, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সবিহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল।

জাইমা রহমান বলেন, আট বছর পরও সেই সময়ের অনেক উদ্বেগ রয়ে গেছে। তাই এখন প্রশ্ন শুধু ‘সড়ক নিরাপদ নয়’—এখানে সীমাবদ্ধ থাকার নয়। বরং আগে থেকেই চিহ্নিত সমস্যাগুলো কেন এখনো সমাধান হয়নি, সেটিই হওয়া উচিত মূল প্রশ্ন।

তিনি বলেন, নাগরিকদের কীভাবে নিয়ম মানানো যাবে—শুধু এই প্রশ্ন করলেই হবে না। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, কারও সঙ্গে ব্যক্তিগত যোগাযোগ থাকুক বা না থাকুক, সবাই যেন সমান সেবা পায়।

বিজ্ঞাপন

পাশাপাশি আইন প্রয়োগ কীভাবে আরও ন্যায়সংগত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায়, অভিযোগ ও অন্যায়ের তথ্য জানানো কীভাবে নিরাপদ ও কার্যকর করা যায় এবং এমনভাবে সড়ক কীভাবে নকশা করা যায়, যাতে সাধারণ একটি ভুলের কারণে কারও জীবনহানি না ঘটে—এসব বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

পোস্টের শেষ দিকে জাইমা রহমান বলেন, সত্যিকার অর্থে পরিবর্তন আনতে হলে শুধু নিয়ম পরিবর্তন করলেই হবে না, সমস্যাকে দেখার এবং সমাধানের চিন্তার কাঠামোকেও নতুন করে সাজাতে হবে।

জেবি/জেএইচআর

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD