জঙ্গল সলিমপুরের ছয় সড়ক নির্মাণে যুক্ত হচ্ছে সেনাবাহিনী

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার দুর্গম ও ঝুঁকিপূর্ণ জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় ছয়টি সংযোগ সড়ক পাকাকরণ প্রকল্পে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে যুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। দ্রুত ও কার্যকরভাবে নির্মাণকাজ শেষ করার লক্ষ্যেই সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড, চট্টগ্রামকে প্রকল্পের নির্বাহক সংস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপি সার উৎপাদনের কাঁচামাল দ্রুত সংগ্রহে আন্তর্জাতিক দরপত্রের সময়সীমা ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ২১ দিন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। একই সময়ে দেশের জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে বিভিন্ন দেশের ১৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১৫ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত ডিজেল সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে আমদানির পরিকল্পনাও রয়েছে।
এসব বিষয়ে নীতিগত অনুমোদনের জন্য অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রস্তাব তোলার কথা রয়েছে। সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠেয় বৈঠকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের পক্ষ থেকে এসব প্রস্তাব উপস্থাপনের কথা রয়েছে।
জঙ্গল সলিমপুরের ছয় সড়কে সেনাবাহিনী
বিজ্ঞাপন
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, স্থানীয় সরকার বিভাগের পক্ষ থেকে জঙ্গল সলিমপুর এলাকার ছয়টি সংযোগ সড়ক পাকাকরণ প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড, চট্টগ্রামকে নির্বাহক সংস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্তির নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হচ্ছে।
প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে সেনাবাহিনী প্রকল্প বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত হবে। তবে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরই প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী সংস্থা হিসেবে থাকবে। সরকারি অর্থায়নে প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘চট্টগ্রাম বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ উপজেলা ও ইউনিয়ন সড়ক প্রশস্তকরণ ও শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্পটি ২০২৩ সালের ২০ জুন একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। প্রকল্পটির প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ১১০ কোটি টাকা। ২০২৩ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ২০২৮ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রকল্পের আওতায় জঙ্গল সলিমপুরের ছয়টি সংযোগ সড়ক পাকাকরণের কাজও রয়েছে।
স্থানীয় সরকার বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, জঙ্গল সলিমপুরের ভৌগোলিক অবস্থান ও নিরাপত্তাজনিত বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নিয়ে কাজটি দ্রুত শেষ করার উদ্দেশ্যে সেনাবাহিনীর প্রকৌশল ইউনিটকে যুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদন পাওয়া গেলে পরবর্তী কার্যক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়া হবে।
সার উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানিতে কমছে সময়
বিজ্ঞাপন
দেশে ইউরিয়া, ডিএপি ও টিএসপি সারের উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে এসব সার তৈরির প্রয়োজনীয় কাঁচামাল দ্রুত সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য আন্তর্জাতিক উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান থেকে দরপত্র খোলা পর্যন্ত সময় ৪২ দিন থেকে কমিয়ে ২১ দিন করার নীতিগত অনুমোদন চাওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, ডিএপি ও টিএসপি সার উৎপাদনে ফসফরিক অ্যাসিড, রক ফসফেট ও সালফারের মতো কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়।
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রয়োজন বিবেচনায় প্রায় ২ লাখ ৫ হাজার ৮০০ মেট্রিক টন ফসফরিক অ্যাসিড, ৯০ হাজার মেট্রিক টন রক ফসফেট, ১৫ হাজার মেট্রিক টন ব্রাইট ইয়েলো সালফার এবং ১৮ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া ফরমালডিহাইড আমদানির প্রয়োজন রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
বর্তমানে আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বানের পর দরপত্র খোলার জন্য ৪২ দিনের সময় নির্ধারিত থাকায় বাজারের অনুকূল পরিস্থিতি কাজে লাগানো কঠিন হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ ও দামের দ্রুত পরিবর্তনের মধ্যে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করলে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহে জটিলতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে সার উৎপাদনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে দরপত্রের সময় অর্ধেক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
দরপত্র ছাড়াই আসছে প্রায় ১৬ লাখ টন ডিজেল
বিজ্ঞাপন
এদিকে দেশের জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) বিভিন্ন দেশের ১৫টি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রায় ১৫ লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন পরিশোধিত ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা করা হয়েছে।
এ জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার ৪৭২ কোটি ৭২ লাখ ৪০ হাজার টাকা। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির নীতিগত অনুমোদনের পর আমদানির পরবর্তী কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের প্রস্তাব অনুযায়ী বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) এসব ডিজেল আমদানি করবে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সরবরাহে সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলা এবং দেশে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ বজায় রাখতেই এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
বিজ্ঞাপন
পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওমানভিত্তিক এনার্জি মাল্টিনেক্স কনভারেন্স টেকনোলজিস এলএলসি থেকে ৫০ হাজার মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল আমদানির প্রস্তাব রয়েছে। এর সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৬৩ কোটি ৯৪ লাখ টাকা।
নাইজেরিয়ার প্যাসিফিক সিলভারলাইন লিমিটেড থেকে এক লাখ মেট্রিক টন ৫০-পিপিএম ডিজেল কেনার প্রস্তাব রয়েছে ১ হাজার ২২৫ কোটি ৪৭ লাখ ৩০ হাজার টাকায়। যুক্তরাজ্যের একে এনার্জি লিমিটেড থেকে ১ লাখ ২৫ হাজার মেট্রিক টন এন৫৯০-১০ পিপিএম ডিজেল কেনার সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৭০ কোটি ৮৮ লাখ টাকা।
অস্ট্রেলিয়ার টোটাল ট্রেডিং ইন্টারন্যাশনাল থেকে এক লাখ মেট্রিক টন ডিজেল আমদানিতে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ২৮৩ কোটি ৩১ লাখ ৯০ হাজার টাকা।
বিজ্ঞাপন
এ ছাড়া সিঙ্গাপুরের সিটিজামান ইন্টারন্যাশনাল পিটিই লিমিটেড, এইটিন সলিউশনস এসডিএন বিএইচডি, হেলথ আইকন ইন্টারন্যাশনাল হোল্ডিংস পিটিই লিমিটেড এবং অন্যান্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও বিভিন্ন পরিমাণ ডিজেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে।
পরিকল্পনায় ডেনমার্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, হংকং, কাজাখস্তান ও স্পেনভিত্তিক কয়েকটি প্রতিষ্ঠানও রয়েছে। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্ভাব্য ক্রয়মূল্য ও পরিমাণ আলাদাভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
আমদানির দাম পরিবর্তিত হতে পারে
বিজ্ঞাপন
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, ডিজেল আমদানির জন্য যে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে, সেটিই চূড়ান্ত মূল্য নয়। আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রকৃত মূল্য কম-বেশি হতে পারে।
তিনি জানান, বিল অব লেডিংয়ের তারিখে প্রকাশিত প্ল্যাটসের মূল্য অনুযায়ী ডিজেলের চূড়ান্ত দাম নির্ধারণ করা হবে। আন্তর্জাতিক বাজারদর ও বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারের ওঠানামার কারণে আমদানির সময় প্রকৃত ব্যয় পরিবর্তিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
তার ভাষ্য, দেশে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। অর্থনৈতিক বিষয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি নীতিগত অনুমোদন দিলে ডিজেল আমদানির পরবর্তী প্রক্রিয়া শুরু হবে।
বিজ্ঞাপন
সব মিলিয়ে জঙ্গল সলিমপুরে সড়ক নির্মাণে সেনাবাহিনীকে যুক্ত করা, সার উৎপাদনের কাঁচামাল আমদানির দরপত্রের সময় কমানো এবং বিপুল পরিমাণ ডিজেল সরাসরি আমদানির উদ্যোগ—তিনটি ক্ষেত্রেই দ্রুত বাস্তবায়নকে গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার।








