Logo

গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি যাবে মেট্রোরেল, টানেল হাতিরঝিলে

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ আগস্ট, ২০২৬, ১৯:৪৬
গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি যাবে মেট্রোরেল, টানেল হাতিরঝিলে
ছবি: সংগৃহীত

রাজধানীর পশ্চিম থেকে পূর্ব প্রান্তকে মেট্রোরেলের মাধ্যমে যুক্ত করতে এমআরটি লাইন-৫-এর দক্ষিণ রুট বাস্তবায়নের উদ্যোগ আরও এক ধাপ এগিয়েছে। গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রুটের বড় অংশই হবে পাতালপথে। হাতিরঝিলসহ গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত অংশে টানেল নির্মাণ করা হবে, আর আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত অংশ হবে উড়ালপথে।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পটি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় উপস্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা। আগামী বুধবার (১৯ আগস্ট) একনেক সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সভায় প্রকল্পটি উপস্থাপন না হলে পরবর্তী সভায় তা তোলা হবে।

১৭.২০ কিলোমিটারে ১৫ স্টেশন

এমআরটি লাইন-৫ দক্ষিণ রুটের মোট দৈর্ঘ্য ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার। এর মধ্যে গাবতলী থেকে আফতাবনগর পর্যন্ত ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে পাতাল এবং আফতাবনগর থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ৪ দশমিক ১০ কিলোমিটার হবে উড়ালপথ।

বিজ্ঞাপন

পুরো রুটে মোট ১৫টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ১১টি থাকবে পাতাল এবং চারটি উড়াল স্টেশন।

রুটটি গাবতলী, টেকনিক্যাল, কল্যাণপুর, শ্যামলী, কলেজ গেট, আসাদ গেট, শুক্রাবাদ, কারওয়ান বাজার, হাতিরঝিল হয়ে তেজগাঁও ও আফতাবনগরের দিকে যাবে। হাতিরঝিল অংশসহ নির্ধারিত বড় একটি অংশ মাটির নিচ দিয়ে যাবে।

পাতাল মেট্রোরেলের টানেল মাটির উপরিভাগ থেকে ১৬ থেকে ৩৮ মিটার গভীরে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

ব্যয় ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা

প্রকল্পটির মোট সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন থাকবে ১৫ হাজার ১৯৭ কোটি টাকা। বাকি ৩০ হাজার ৩০৬ কোটি টাকা এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের উন্নয়ন সহায়তা তহবিল ইডিসিএফের অর্থায়নে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল) মনে করছে, রাজধানীর পশ্চিম ও পূর্বাঞ্চলকে দ্রুতগতির গণপরিবহন নেটওয়ার্কের আওতায় আনতে এই রুট গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পের লক্ষ্য হিসেবে যানজট কমানো, পরিবেশের উন্নয়ন এবং নিরাপদ, নির্ভরযোগ্য, সময়সাশ্রয়ী ও বিদ্যুৎচালিত গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

২০৩০-৩১ অর্থবছরে চালুর লক্ষ্য

এডিবির সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০৩০-৩১ অর্থবছরে এই রুটে যাত্রী পরিবহন শুরু করার লক্ষ্য রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সমীক্ষা অনুযায়ী, রুটটি চালু হলে বছরে বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হবে। একই সঙ্গে জ্বালানি ব্যবহার এবং সড়কে যানবাহনের চলাচল কমবে। বছরে প্রায় ২ লাখ ৭ হাজার ৯৬৪ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনাও তুলে ধরা হয়েছে।

প্রকল্পের হিসাব অনুযায়ী, এই মেট্রোরেল চালুর ফলে বছরে প্রায় ২১ কোটি ৪৯ লাখ ৭০ হাজার কর্মঘণ্টা সাশ্রয় হতে পারে। জ্বালানি সাশ্রয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে প্রায় ৪১ দশমিক ২২ হাজার টন। যানবাহনের চলাচলজনিত মোট দূরত্বও বছরে প্রায় ৬৪২ হাজার কিলোমিটার কমতে পারে।

প্রথমে ১৯ সেট মেট্রোরেল

বিজ্ঞাপন

শুরুতে ছয় কোচবিশিষ্ট ১৯ সেট মেট্রোরেল দিয়ে যাত্রী পরিবহন পরিচালনার পরিকল্পনা রয়েছে। পরবর্তীতে ২০৪০ সাল থেকে ছয় কোচের পরিবর্তে আট কোচের ট্রেন চালুর পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রতিটি ছয় কোচের ট্রেনে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৩১২ জন যাত্রী পরিবহনের সক্ষমতা থাকবে। মাঝের চারটি কোচে সর্বোচ্চ ৩৯১ জন করে এবং দুই ড্রাইভিং ট্রেলার কোচে সর্বোচ্চ ৩৭৪ জন করে যাত্রী পরিবহন করা যাবে।

প্রাথমিক পর্যায়ে একদিকে প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ২০ হাজার ১০৭ জন যাত্রী পরিবহন করা সম্ভব হবে। ২০৬০ সালে এই সক্ষমতা বেড়ে ঘণ্টায় ৩৮ হাজার ২৫৫ জনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

প্রতিটি ট্রেনে নারীদের জন্য একটি পৃথক কোচ রাখার পরিকল্পনাও রয়েছে। ট্রেন চলাচলের ব্যবধান সর্বোচ্চ ৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড রাখার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

উড়াল অংশে ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১০০ কিলোমিটার এবং পাতাল অংশে ঘণ্টায় ৯০ কিলোমিটার রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।

পাতাল স্টেশন নির্মাণে থাকবে বিশেষ ব্যবস্থা

বিজ্ঞাপন

ডিএমটিসিএল সূত্র অনুযায়ী, পাতাল স্টেশনগুলোতে আধুনিক লিফট ও এসকেলেটর থাকবে। এসব সুবিধা ব্যবহার করে পথচারীরা রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে যাতায়াতের সুযোগ পাবেন।

পাতাল অংশের ১১টি স্টেশন আধুনিক পদ্ধতিতে নির্মাণ করা হবে। স্টেশন নির্মাণের সময় সড়কের একটি অংশ ব্যবহার করে উন্মুক্ত খনন করা হবে। প্রায় ২২০ মিটার দীর্ঘ স্টেশন নির্মাণের পর সেটি স্টিলের পুরু পাত দিয়ে ঢেকে দেওয়া হবে। ফলে ওপর দিয়ে যানবাহন চলাচল অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে এবং নিচে স্টেশন নির্মাণের কাজ চলবে।

নির্মাণকাজের সময় প্রয়োজন অনুযায়ী আশপাশের সড়কে ট্রাফিক ডাইভারশনের ব্যবস্থা রাখা হবে।

বিজ্ঞাপন

৩১ লাখ ঘনমিটার মাটি উঠবে

পাতাল স্টেশন ও টানেল নির্মাণের সময় বিপুল পরিমাণ মাটি উত্তোলন করতে হবে। প্রতিটি পাতাল স্টেশন থেকে আনুমানিক ৭০ হাজার ঘনমিটার মাটি উঠতে পারে। ১১টি পাতাল স্টেশন ও টানেল নির্মাণ মিলিয়ে মোট উত্তোলিত মাটির পরিমাণ আনুমানিক ৩১ লাখ ২০ হাজার ঘনমিটার হতে পারে।

ডিএমটিসিএল জানিয়েছে, এই মাটি দাশেরকান্দি ও আশপাশের নিম্নাঞ্চলের ভূমি উন্নয়ন এবং ডিপোর সংযোগ সড়ক নির্মাণে ব্যবহার করা হবে। প্রয়োজনে সরকারি মহাসড়ক, সড়ক ও বাঁধ নির্মাণেও মাটি ব্যবহার করা যেতে পারে।

বিজ্ঞাপন

এ ছাড়া অন্য মেট্রোরেল প্রকল্পের ডিপোর ভূমি উন্নয়নেও এ মাটি কাজে লাগানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অতিরিক্ত মাটি অবশিষ্ট থাকলে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে বিক্রি করার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

পরিবেশ ও শব্দদূষণ কমানোর পরিকল্পনা

প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, উড়াল অংশে ভায়াডাক্টের দুই পাশে শব্দ প্রতিরোধক দেয়াল থাকবে। অন্যদিকে পাতাল অংশে টানেল ঘিরে থাকা মাটি স্বাভাবিকভাবেই শব্দ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখবে।

মেট্রোরেলের রোলিংস্টকে ইলেক্ট্রো-নিউমেটিক সার্ভিস সিস্টেমসহ আধুনিক ব্রেক কন্ট্রোল ব্যবস্থা থাকার কথা রয়েছে। এর ফলে ট্রেনের ব্রেক করার সময় ঝাঁকুনি কমানোর লক্ষ্য রাখা হয়েছে।

ডিএমটিসিএলের মতে, নতুন রুট চালু হলে সড়কে যানবাহনের চাপ কমবে, জ্বালানি ব্যবহার হ্রাস পাবে এবং কার্বন নিঃসরণ কমার মাধ্যমে ঢাকার পরিবেশ উন্নয়নে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।

প্রকল্প পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আব্দুল ওহাব জানিয়েছেন, একনেক সভায় প্রকল্প উপস্থাপনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বুধবারের সভায় এটি উপস্থাপিত না হলেও পরবর্তী একনেক সভায় প্রকল্পটি তোলা হবে।

প্রকল্পটি অনুমোদন ও পরবর্তী বাস্তবায়ন শুরু হলে গাবতলী থেকে হাতিরঝিল, আফতাবনগর হয়ে দাশেরকান্দি পর্যন্ত রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ পশ্চিম-পূর্ব করিডোর একটি আধুনিক মেট্রোরেল নেটওয়ার্কের আওতায় আসবে।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD