নেপালের বন্যার পানি কি বাংলাদেশেও প্রবেশ করতে পারে?

নেপালে হিমবাহ ও পাহাড়ি ঢল থেকে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় ব্যাপক প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পর বাংলাদেশেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে নেপালের বন্যার পানি নদীপথে বাংলাদেশে পৌঁছে বড় ধরনের বন্যা সৃষ্টি করতে পারে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, পানি শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকলেও এখনই বড় ধরনের বন্যার আশঙ্কা তুলনামূলক কম। তবে উজানে নতুন করে ভারী বৃষ্টিপাত হলে পরিস্থিতি পরিবর্তিত হতে পারে।
গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নেপালের তিব্বত সীমান্তবর্তী রাসুয়া জেলায় আকস্মিক বন্যায় ৫৭০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে। পর্যটকসহ আরও এক হাজারের বেশি মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। প্রবল স্রোতে সেতু, সড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
বিজ্ঞানীদের স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে ধারণা করা হচ্ছে, হিমালয়ের একটি পর্বত থেকে হিমবাহ ও পাথরের ধস নেমে লেন্দে নদীর প্রবাহ আটকে যায়। পরবর্তী সময়ে বিপুল পানি, কাদা ও পাথর একসঙ্গে প্রবল গতিতে নিচের দিকে নেমে আসে। এতে মাত্র ৩০ মিনিটের মধ্যে গালছি এলাকায় নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বেড়ে যায়।
বিজ্ঞাপন
আরও পড়ুন
এই পাহাড়ি ঢলের পানি ভোতেকোশি ও ত্রিশূলী নদী হয়ে নারায়ণী-গণ্ডক নদী ব্যবস্থায় প্রবেশ করবে। এরপর গণ্ডক নদী ভারতের বিহার অতিক্রম করে গঙ্গায় মিশবে। গঙ্গার প্রবাহের সঙ্গে ওই পানি ফারাক্কা হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তবে নেপাল থেকে বাংলাদেশে পৌঁছাতে পানিকে দীর্ঘ নদীপথ অতিক্রম করতে হবে। এই সময়ে পানি বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়বে এবং পলি জমার কারণে স্রোতের গতিও কমে যাবে। ফলে বাংলাদেশে পৌঁছানোর আগেই ঢলের তীব্রতা অনেকটা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
এখনই বড় বন্যার আশঙ্কা কম
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি ও বন্যা ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মুশফিকুস সালেহীন জানিয়েছেন, নেপালের বর্তমান বন্যার কারণে বাংলাদেশে তাৎক্ষণিকভাবে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা তিনি দেখছেন না। তবে উজানের নদীগুলোর পানির উচ্চতা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
তার মতে, নেপালের বন্যার পানি ভারতে প্রবেশ করে গঙ্গায় মেশার পর বিহার পর্যন্ত যেতে যেতে অনেকটা ছড়িয়ে পড়বে। ফলে বাংলাদেশের নদীগুলোতে পানির উচ্চতা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা আপাতত কম।
তবে পুরো পরিস্থিতিকে ঝুঁকিমুক্ত মনে করছেন না বিশেষজ্ঞরা। বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের গবেষক মো. আজাহার হোসেনের মতে, আগামী কয়েক দিনে উজানে ভারী বৃষ্টিপাত হলে নেপালের বন্যার পানির সঙ্গে নতুন করে পানি যুক্ত হয়ে দ্বিতীয় দফায় বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
তিনি জানান, নেপালে বন্যার উৎপত্তিস্থল থেকে বাংলাদেশের নদীপথের দূরত্ব প্রায় ৪৫০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার। এই দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময় পানির বিস্তার ঘটবে এবং স্রোতের গতিও কমবে। তাই নেপাল থেকে সরাসরি ভয়াবহ বন্যার ঢল বাংলাদেশে আঘাত হানার সম্ভাবনা কম।
বিজ্ঞাপন
তবে আগামী ৫ থেকে ৭ দিনের মধ্যে উজান এলাকায় ভারী বৃষ্টি হলে পরিস্থিতি নতুন করে পর্যালোচনার প্রয়োজন হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন তিনি।
নজর রাখতে হবে ভারতের বৃষ্টি ও নদীর পানিতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, নেপালের বন্যার সম্ভাব্য প্রভাব বুঝতে শুধু নেপালের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট নয়। ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশ ও আসামের বৃষ্টিপাত এবং সংশ্লিষ্ট নদীগুলোর পানির উচ্চতার ওপরও নজর রাখা জরুরি।
বিজ্ঞাপন
ড. মুশফিকুস সালেহীনের মতে, ভারত থেকে পাওয়া বন্যা পরিস্থিতি ও নদীর পানির উচ্চতার তথ্য নিয়মিত বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশে সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে আগাম সতর্কতা দেওয়া সম্ভব।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
মো. আজাহার হোসেন সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ফারাক্কা ও তিস্তা ব্যারাজসহ সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজরদারির পরামর্শ দিয়েছেন। একই সঙ্গে বিহার ও উত্তর প্রদেশের গঙ্গা অববাহিকায় বৃষ্টিপাত এবং নদীর পানির তথ্য নিয়মিত সংগ্রহের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
বাংলাদেশের বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ১০ দিনে গঙ্গা-পদ্মা অববাহিকায় নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রমের আশঙ্কা নেই। ফলে নেপালের বর্তমান বন্যার পানি নিয়ে বাংলাদেশে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের বন্যার ঝুঁকি কম বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।
ভবিষ্যতে বাড়তে পারে হিমবাহজনিত বন্যা
বিজ্ঞাপন
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলে হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যার ঘটনা ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির যৌথ এক গবেষণায় হিমালয় অঞ্চলে তিব্বত, নেপাল ও ভারতের অববাহিকায় ৪৭টি হ্রদকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ কারণে নেপালের সাম্প্রতিক বন্যাকে শুধু দেশটির একটি দুর্যোগ হিসেবে না দেখে পুরো হিমালয়-গঙ্গা অববাহিকার জন্য সতর্ক সংকেত হিসেবে বিবেচনার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ ভাটির দেশ হওয়ায় উজানে বড় ধরনের পরিবর্তন হলে তার প্রভাব সম্পর্কে আগাম তথ্য সংগ্রহ করা এবং সীমান্তবর্তী নদীগুলোর পানির উচ্চতা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করাই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।








