Logo

৬১ দিনের বন্দিজীবন স্মরণ করে কাঁদলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৩০ আগস্ট, ২০২৬, ১৩:৫০
৬১ দিনের বন্দিজীবন স্মরণ করে কাঁদলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী
ছবি: সংগৃহীত

২০১৫ সালে গুমের শিকার হওয়ার পর ৬১ দিনের বন্দিজীবন এবং পরবর্তী নয় বছর ভারতের মেঘালয়ে নির্বাসিত থাকার ভয়াবহ অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ।

বিজ্ঞাপন

শনিবার (২৯ আগস্ট) রাজধানীর শাহবাগে জাতীয় জাদুঘর মিলনায়তনে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত এক আলোচনা সভায় তিনি এসব কথা বলেন। আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সভাটির বিষয় ছিল—‘নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনতে বা তাদের সন্ধান পেতে চাই আইন, ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকার’।

বক্তব্যের একপর্যায়ে ভারতে মানসিক হাসপাতালে কাটানো সময়ের কথা স্মরণ করে কেঁদে ফেলেন সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেন, ‘আমি বিদেশের মাটিতে পাগল অবস্থায় মারা যাব, আমার পরিবার হয়তো আমার কবরও দেখতে পারবে না—এমন ভয়ও পেয়েছিলাম।’

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

নিজের গুমের সময়কার বন্দিজীবনের বর্ণনায় তিনি জানান, রাজধানীর উত্তরা থেকে অপহৃত হওয়ার পর তাকে প্রায় আট ফুট বাই চার ফুটের একটি অন্ধকার ও সংকীর্ণ কক্ষে ৬১ দিন আটকে রাখা হয়েছিল। সেখানে ছিল শুধু একটি পানির কল এবং শৌচকার্যের জন্য নর্দমার সঙ্গে যুক্ত একটি সরু ছিদ্র। ঘরের দুর্গন্ধ ও তীব্র গরমের মধ্যে মেঝেতে একটি কম্বল ও বালিশ নিয়েই তাকে থাকতে হতো।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, ঘরের দরজার ওপরের সামান্য ফাঁক দিয়ে যে বাতাস প্রবেশ করত, সেটিই ছিল স্বস্তির একমাত্র উপায়। দরজার বাইরে একটি বৈদ্যুতিক পাখা সবসময় চালু রাখা হতো। হৃদরোগে আক্রান্ত থাকা সত্ত্বেও বন্দিদশায় তিনি চিকিৎসা পাননি। অসুস্থ হয়ে পড়ার পর একপর্যায়ে চোখ বেঁধে তাকে অন্য একটি স্থানে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

বিজ্ঞাপন

ভারতে নেওয়ার ঘটনাও তুলে ধরেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। তিনি জানান, চোখ বাঁধা অবস্থায় প্রথমে মাইক্রোবাস এবং পরে গভীর রাতে জিপে করে তাকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়। দীর্ঘ যাত্রার পর হাত ও চোখ বাঁধা অবস্থায় তাকে চামচ দিয়ে নুডলস খেতে দেওয়া হয়।

বন্দিত্বের কারণে বাইরের পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন ছিলেন তিনি। এমনকি মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত কামরুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবরও তিনি জানতেন না। বিষয়টি শুনে জিজ্ঞাসাবাদকারী কর্মকর্তাও বিস্মিত হয়েছিলেন বলে জানান তিনি।

পরে ভোরের দিকে একটি নির্জন পাহাড়ি এলাকায় তাকে নামিয়ে রেখে অপহরণকারীরা মুখ ঢেকে দ্রুত চলে যায়। পরে একটি বিলবোর্ড দেখে তিনি বুঝতে পারেন, তিনি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের শিলং এলাকায় রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

স্থানীয়দের সহায়তায় পুলিশ তাকে উদ্ধার করে। প্রথমে বেসামরিক হাসপাতালে নেওয়া হলেও পরে মানসিক ভারসাম্যহীন সন্দেহে তাকে একটি মানসিক হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে মানসিক রোগীদের সঙ্গে তাকে রাখা এবং জোর করে মানসিক রোগের ওষুধ খাওয়ানো হতো বলে তিনি জানান। এমনকি তার চোখের চশমাও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।

দাড়ি-চুল কেটে দেওয়ার পর নিজের পরিচয় হারিয়ে ফেলার আশঙ্কায় তিনি আরও ভেঙে পড়েছিলেন। একপর্যায়ে হাসপাতাল থেকেই তার স্ত্রীর ফোন আসে। ফোনে স্ত্রীর কান্নার আওয়াজ শুনে তিনি বুঝতে পারেন, পরিবার তার বেঁচে থাকার খবর পেয়েছে।

পরে সিভিল হাসপাতালে স্থানান্তরের সময় সাংবাদিকদের টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে নিজের পরিচয় দিয়ে চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘ইয়েস, আই অ্যাম সালাহউদ্দিন’।

বিজ্ঞাপন

ভারতে অবস্থানকালে অবৈধ অনুপ্রবেশের অভিযোগে ফরেনার্স অ্যাক্টে তার বিরুদ্ধে মামলা হয়। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৮ সালের ২৬ অক্টোবর শিলংয়ের নিম্ন আদালত এবং ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আপিল আদালত তাকে খালাস দেন।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

ভারতে থাকা অবস্থাতেই বিএনপির ষষ্ঠ কাউন্সিলে সালাহউদ্দিন আহমদকে দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য করা হয়। ২০২৪ সালের আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর প্রায় নয় বছরের নির্বাসন শেষে তিনি বাংলাদেশে ফেরেন।

জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘জুলাই গণ-অভ্যুত্থান হওয়ায় ভারত থেকে আমি দেশে ফিরতে পেরেছি। যারা জুলাই যুদ্ধ করেছেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা।’

সালাহউদ্দিন আহমদ ১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার একান্ত সচিবের সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। পরে চাকরি ছেড়ে রাজনীতিতে যুক্ত হন। ২০০১ সালে কক্সবাজার থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান।

বিজ্ঞাপন

২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জনের পর বিএনপির মুখপাত্র হিসেবে দলটির আন্দোলন পরিচালনার সময় ২০১৫ সালের ১০ মার্চ রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে সাদা পোশাকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পরিচয়ে তাকে তুলে নেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। ঘটনাটি নিয়ে সে সময় বিএনপি তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD