Logo

ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি, দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩:৫২
ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি, দক্ষিণ এশিয়ায় শীর্ষে বাংলাদেশ
ছবি: সংগৃহীত

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে কারাগারের ধারণক্ষমতার তুলনায় সবচেয়ে বেশি বন্দি রয়েছে বাংলাদেশে। দেশের কারাগারগুলোতে প্রতি ১০০ জন বন্দির জায়গায় রয়েছেন ২২৬ জন। ফলে ধারণক্ষমতার তুলনায় অতিরিক্ত বন্দির দিক থেকে দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে খারাপ অবস্থানে রয়েছে বাংলাদেশ।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে শ্রীলঙ্কা। দেশটির কারাগারগুলোতে ধারণক্ষমতার ২১৬ শতাংশ বন্দি রয়েছে। অন্যদিকে পাকিস্তানে এই হার ১৬৩ শতাংশ, নেপালে ১৪৪ শতাংশ, ভারতে ১১৩ শতাংশ এবং মিয়ানমারে ১১২ শতাংশ।

যুক্তরাজ্যের বার্কবেক, ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের ইনস্টিটিউট ফর ক্রাইম অ্যান্ড জাস্টিস পলিসি রিসার্চ পরিচালিত অনলাইন তথ্যভাণ্ডার ওয়ার্ল্ড প্রিজন ব্রিফের (ডব্লিউপিবি) তথ্য থেকে এসব চিত্র পাওয়া গেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সংস্থাটি জাতীয় কারা অধিদপ্তরের তথ্য ব্যবহার করেছে।

ডব্লিউপিবির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে সরকারি হিসাবে ৪৫ হাজার ১৮৬ জন বন্দি রাখার ব্যবস্থা রয়েছে। অথচ চলতি সেপ্টেম্বর মাসে এসব কারাগারে বন্দি ছিলেন ১ লাখ ২ হাজার ১৮০ জন। অর্থাৎ মোট ধারণক্ষমতার ২২৬ দশমিক ১ শতাংশ বন্দি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। দেশের প্রতি ১ লাখ মানুষের বিপরীতে কারাবন্দির সংখ্যা ৫৯ জন।

বিজ্ঞাপন

তবে কারা অধিদপ্তরের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বন্দির সংখ্যা আরও বেড়েছে। ২৯ সেপ্টেম্বরের হিসাবে দেশের কারাগারগুলোতে বন্দির সংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজারে। অথচ কারাগারগুলোর মোট ধারণক্ষমতা ৪৫ হাজার ১৮৬ জন।

বিচারাধীন বন্দির সংখ্যাও বেশি

বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে থাকা বন্দিদের বড় একটি অংশ এখনো বিচারাধীন। ডব্লিউপিবির তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট বন্দির ৬৬ দশমিক ৯ শতাংশ বিচারপূর্ব বন্দি। অর্থাৎ কারাগারে থাকা প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বন্দির এখনো সাজা হয়নি।

বিজ্ঞাপন

দক্ষিণ এশিয়ায় বিচারপূর্ব বন্দির হার সবচেয়ে বেশি পাকিস্তানে—৭৩ দশমিক ৪ শতাংশ। ভারতে এ হার ৭২ দশমিক ৬ শতাংশ, শ্রীলঙ্কায় ৭২ দশমিক ৪ শতাংশ এবং নেপালে ৫৩ শতাংশ। এই হিসাবে প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশ কিছুটা ভালো অবস্থানে রয়েছে।

বাংলাদেশ কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৭৫টি কারাগার রয়েছে। এর মধ্যে ১৫টি কেন্দ্রীয় কারাগার এবং ৬০টি জেলা কারাগার।

কারা অধিদপ্তরের ইতিহাস অনুযায়ী, ১৭৮৮ সালে ঢাকায় একটি ক্রিমিনাল ওয়ার্ড নির্মাণের মাধ্যমে এ অঞ্চলে কারাগার প্রতিষ্ঠার সূচনা হয়। পরে ১৮৩৬ সালে ঢাকা, রাজশাহী, যশোর ও কুমিল্লায় কারাগার নির্মাণ করা হয়। ১৯২৯ সালে ঢাকা ও রাজশাহী কারাগারকে কেন্দ্রীয় কারাগার ঘোষণা করা হয়।

বিজ্ঞাপন

সময়ের সঙ্গে বেড়েছে বন্দির সংখ্যা

বাংলাদেশে কারাবন্দির সংখ্যা গত কয়েক দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ডব্লিউপিবি ২০০০ সালে তথ্যভাণ্ডারটি প্রতিষ্ঠা করে। ওই বছর বাংলাদেশে কারাবন্দির সংখ্যা ছিল ৬২ হাজার ৬৬৯ জন।

পরবর্তী এক দশকে সবচেয়ে বেশি বন্দি ছিল ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে। সে বছর কারাগারে ছিলেন ৮৬ হাজার ৮৩৮ জন। এক দশক পর, ২০২০ সালে বন্দির সংখ্যা দাঁড়ায় ৮৮ হাজার ৮৪ জন।

বিজ্ঞাপন

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের আগের দিন দেশের কারাগারগুলোতে প্রায় ৮৮ হাজার বন্দি ছিলেন বলে কারা অধিদপ্তরের সূত্রের বরাতে একটি প্রতিবেদনে জানানো হয়েছিল। এরপর ১২ আগস্ট বন্দির সংখ্যা কমে ৪৯ হাজারে নেমে আসে। তবে পরে আবার ধীরে ধীরে বন্দির সংখ্যা বাড়তে থাকে।

বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত কারা মহাপরিদর্শক কর্নেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল বলেন, সাধারণত দেশের কারাগারগুলোতে ৮০ থেকে ৮২ হাজার বন্দি থাকেন। বর্তমানে সেই সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে।

তার ভাষ্য, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানে গ্রেপ্তার বাড়ছে। মাদক মামলা, সাইবার অপরাধ ও কিশোর অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তারের ফলে কারাগারে বন্দির সংখ্যা বাড়ছে। এতে কারাগারগুলোর ব্যবস্থাপনায় চাপ তৈরি হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিশ্বে সবচেয়ে বেশি বন্দি যুক্তরাষ্ট্রে

ডব্লিউপিবির তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে বেশি বন্দি রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে। ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটির কারাগারে মোট বন্দির সংখ্যা ছিল ১৮ লাখ ৩৩ হাজারের বেশি। প্রতি ১ লাখ মানুষের বিপরীতে দেশটিতে কারাবন্দির সংখ্যা ৫৪২ জন।

এরপর রয়েছে চীন। ডব্লিউপিবির সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাবে, ২০১৮ সালে চীনে বন্দির সংখ্যা ছিল ১৬ লাখ ৯০ হাজার। প্রতি ১ লাখ মানুষের বিপরীতে বন্দির সংখ্যা ছিল ১১৯ জন।

বিজ্ঞাপন

চতুর্থ অবস্থানে থাকা ভারতে ২০২৪ সালে বন্দির সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ১১ হাজারের বেশি। প্রতি ১ লাখ মানুষের বিপরীতে সেখানে কারাবন্দির সংখ্যা ৩৬ জন।

দক্ষিণ এশিয়ার অন্য দেশগুলোর মধ্যে ২০২৪ সালে পাকিস্তানে বন্দির সংখ্যা ছিল ১ লাখ ৮ হাজার। ২০২০ সালে মিয়ানমারে বন্দি ছিলেন ১ লাখের কিছু বেশি মানুষ। চলতি মাস পর্যন্ত শ্রীলঙ্কায় বন্দির সংখ্যা প্রায় ৩৭ হাজার ৮০০। গত আগস্ট পর্যন্ত নেপালের কারাগারে বন্দি ছিলেন প্রায় ২৭ হাজার ৮০০ জন। আর ২০১৪ সাল পর্যন্ত ভুটানে বন্দির সংখ্যা ছিল ১ হাজার ১১৯ জন।

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মধ্যে ব্রাজিলে ৯ লাখ ৬৪ হাজার, তুরস্কে ৪ লাখ ৩৪ হাজার, রাশিয়ায় ২ লাখ ৮২ হাজার, ইরানে ১ লাখ ৯৯ হাজার, যুক্তরাজ্যে ৮৬ হাজার, সৌদি আরবে ৪৮ হাজার এবং জাপানে ৪১ হাজার বন্দি রয়েছেন।

বিজ্ঞাপন

ডব্লিউপিবির হিসাব করা ২২৪টি দেশের মধ্যে সবচেয়ে কম বন্দি রয়েছে টুভালু ও লিশটেনস্টাইনে—প্রতিটি দেশে মাত্র ১১ জন করে।

কারাগারে ‘অমানবিক পরিবেশ’

ধারণক্ষমতার দ্বিগুণের বেশি বন্দি থাকায় বাংলাদেশের কারাগারগুলোতে নানা ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে চিকিৎসাসেবা অপ্রতুল হওয়া এবং বন্দিদের খাবারের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। পাশাপাশি দীর্ঘ সময় জামিন না পাওয়ার অভিযোগও রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি ও মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান মইনুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, দেশের কারাগারগুলো ধারণক্ষমতার তুলনায় দ্বিগুণের বেশি বন্দিতে পূর্ণ। এর ফলে অনেক বন্দিকে মানবেতর বা অমানবিক পরিবেশে থাকতে হচ্ছে।

তার মতে, কারাগারের ধারণক্ষমতা বাড়াতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রয়োজন। শুধু নতুন কারাগার নির্মাণ নয়, বিদ্যমান কারাগারগুলোরও সম্প্রসারণ করতে হবে।

বিচারপূর্ব বন্দির সংখ্যা বেশি হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, দেশের অনেক আদালতে একজন বিচারকের ওপর কয়েক হাজার মামলা রয়েছে। এতে বিচারকাজ দ্রুত শেষ করা কঠিন হয়ে পড়ে। মামলার দীর্ঘসূত্রতার কারণে বিচারপূর্ব বন্দিরা দীর্ঘ সময় কারাগারে থাকছেন, যা কারাগারগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে।

বিজ্ঞাপন

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে বিচারকদের লজিস্টিক সহায়তা বাড়ানো, বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে বিচারিক কার্যক্রমের স্বয়ংক্রিয়করণ, দেওয়ানি মামলায় বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি এবং ফৌজদারি মামলায় প্লি বার্গেনিংয়ের মতো ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে আদালতের মামলার চাপ কমানো সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।

প্লি বার্গেনিং হলো আদালতে পূর্ণ বিচার এড়ানোর লক্ষ্যে মামলার বাদী ও আসামিপক্ষের মধ্যে একটি আইনি সমঝোতার ব্যবস্থা। এতে আসামি নিজের অপরাধ স্বীকার করার বিনিময়ে নির্দিষ্ট ধরনের আইনি সুবিধা বা ছাড় পেতে পারেন।

জেবি/এসডি

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD