Logo

ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবে আজ দুর্গাপূজার মহাসপ্তমী

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
১৭ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩:০৫
ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবে আজ দুর্গাপূজার মহাসপ্তমী
ছবি: সংগৃহীত

ঢাকের বাদ্য, শঙ্খধ্বনি আর উলুধ্বনিতে মুখরিত দেশের পূজামণ্ডপগুলো। ফুল, ধূপ ও আগরবাতির সুবাসে ছড়িয়ে পড়েছে উৎসবের আমেজ। ষষ্ঠীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষে শনিবার (১৭ অক্টোবর) ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হচ্ছে শারদীয় দুর্গোৎসবের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিন মহাসপ্তমী। সকাল থেকেই মন্ত্রোচ্চারণ ও দেবী দর্শনে বিভিন্ন মণ্ডপে ভক্তদের সমাগম ঘটেছে।

বিজ্ঞাপন

মহাসপ্তমীতে ভক্তদের প্রার্থনায় উঠে আসছে শান্তি, সম্প্রীতি, শক্তি ও বিশ্বকল্যাণের প্রত্যাশা। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি এ দিনের তাৎপর্য অশুভের বিরুদ্ধে শুভবোধের জাগরণ, প্রকৃতির প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং সাম্য ও সম্প্রীতিনির্ভর সমাজ গঠনের বার্তাও বহন করে।

নবপত্রিকা স্থাপনের বিশেষ আয়োজন

মহাসপ্তমীর অন্যতম আকর্ষণীয় আচার ‘নবপত্রিকা’ বা প্রচলিত ভাষায় ‘কলাবউ’ স্থাপন। কলাগাছের সঙ্গে কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু ও ধানগাছ একত্রে বেঁধে স্নান করানো হয়। এরপর নতুন শাড়ি পরিয়ে নবপত্রিকাকে পূজামণ্ডপে স্থাপন করা হয়।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

নয়টি উদ্ভিদ দেবীর নয়টি শক্তির প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। দুর্গাপূজায় দেবী প্রতিমা মূল আকর্ষণ হলেও মহাসপ্তমীতে উদ্ভিদকে পূজার অংশ করার মধ্য দিয়ে প্রকৃতির প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ঘটে।

বিজ্ঞাপন

খাদ্য, চিকিৎসা, কৃষি ও মানুষের জীবনধারণের সঙ্গে এসব উদ্ভিদের গভীর সম্পর্ক রয়েছে। তাই নবপত্রিকার তাৎপর্য শুধু ধর্মীয় আচার পালনে সীমাবদ্ধ নয়। গাছপালা সংরক্ষণ, জলাশয় দূষণমুক্ত রাখা এবং পরিবেশ রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার মধ্য দিয়েও এ শিক্ষাকে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।

মহাস্নানে শুদ্ধতার প্রতীকী বার্তা

সপ্তমীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় আচার দেবীর ‘মহাস্নান’। এ সময় দর্পণে দেবীমূর্তির প্রতিবিম্ব রেখে গঙ্গাজল, দুধ, মধু ও সুগন্ধি উপকরণ দিয়ে স্নানের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করা হয়। এটি বাহ্যিক ও আত্মিক শুদ্ধতার প্রতীক হিসেবে বিবেচিত।

বিজ্ঞাপন

এই আচার থেকে নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষাও পাওয়া যায়। অন্যের অধিকার হরণ, অহংকার, বৈষম্য ও হিংসা পরিহার করে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এবং অন্যায়ের প্রতিবাদ করার মধ্য দিয়েই ধর্মীয় মূল্যবোধের সামাজিক প্রতিফলন ঘটতে পারে।

পৌরাণিক কাহিনিতে মহিষাসুর বধের ঘটনা শুভ ও অশুভ শক্তির চিরন্তন সংঘাতের প্রতীক। দেবী দুর্গার দশ হাত ও দশ অস্ত্র অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ এবং ন্যায় প্রতিষ্ঠার শক্তিকে তুলে ধরে। দেবীর সঙ্গে থাকা লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক ও গণেশ যথাক্রমে সমৃদ্ধি, জ্ঞান, বীরত্ব ও বুদ্ধির প্রতীক হিসেবে পরিচিত।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

প্রতীকী অর্থে জ্ঞান ছাড়া সমৃদ্ধি পূর্ণতা পায় না, সাহস ছাড়া ন্যায় প্রতিষ্ঠা কঠিন এবং বুদ্ধির সঠিক প্রয়োগ ছাড়া শক্তির যথাযথ ব্যবহার সম্ভব নয়।

ধর্মীয় উৎসব ঘিরে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বন্ধন

বিজ্ঞাপন

বাঙালির সংস্কৃতিতে দেবী দুর্গার আগমন শুধু ধর্মীয় উপাসনার বিষয় নয়; পিতৃগৃহে কন্যার ফিরে আসার আবেগও এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে। একই সঙ্গে প্রতিমাশিল্পী, মৃৎশিল্পী, ঢাকি, আলোকসজ্জাকর্মী ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের শ্রমে দুর্গোৎসব পরিণত হয় বড় ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক মিলনমেলায়।

বাংলাদেশের বাস্তবতায় মহাসপ্তমীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। প্রত্যেক নাগরিক যখন ভয়ভীতি ছাড়াই নিজের ধর্ম পালন করতে পারেন, তখনই উৎসবের আনন্দ পূর্ণতা পায়।

ঢাকের বাদ্য একসময় থেমে যাবে, শেষ হবে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতাও। তবে প্রকৃতির প্রতি যত্ন, মানুষের প্রতি সহমর্মিতা এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর সাহস যেন দৈনন্দিন জীবনেও বজায় থাকে—মহাসপ্তমীর তাৎপর্য সেই মানবিক অঙ্গীকারের মধ্যেই নিহিত।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD