কৃষিজমির মাটি নয়, খনন করা খালের মাটি যাবে ইটভাটায়

কৃষিজমির উর্বর উপরিভাগের মাটি বা টপসয়েল রক্ষা এবং ফসল উৎপাদন সক্ষমতা ধরে রাখতে নতুন পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। ইট তৈরিতে কৃষিজমির মাটি ব্যবহারের প্রবণতা কমাতে খাল খননের পর পাওয়া উদ্বৃত্ত মাটি বৈধ ইটভাটায় সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিকভাবে পাইলট প্রকল্পের মাধ্যমে এ কার্যক্রম শুরু করে ভবিষ্যতে দেশজুড়ে সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে এ তথ্য জানিয়েছেন। সরকারের প্রত্যাশা, এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে একদিকে খাল খননের পর পাওয়া মাটির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে কৃষিজমির উর্বর স্তর কেটে ইট তৈরির কাঁচামাল সংগ্রহের চাপ কমবে।
খাদ্য উৎপাদন বাড়ানো এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রাখতে কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম। তাঁর মতে, অপরিকল্পিতভাবে ইটভাটায় কৃষিজমির ওপরের মাটি ব্যবহারের কারণে প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ উর্বর মাটি হারিয়ে যাচ্ছে। এতে জমির উৎপাদনশীলতা কমার পাশাপাশি দেশের খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে তিনি বলেন, ‘আমরা নতুন করে একটি পাইলট প্রজেক্ট নিয়েছি। আশা করি, এ বছর পাইলট প্রজেক্ট শুরু করলেও আগামীতে এটাকে আরও ব্যাপক পরিসরে সম্প্রসারণ করা হবে।’
প্রতিমন্ত্রী জানান, অক্টোবরের শেষ অথবা নভেম্বরের শুরুতে দেশজুড়ে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হতে পারে। যেসব এলাকায় এই কাজ পরিচালিত হবে, সেসব এলাকার জেলা প্রশাসকদের বৈধ ইটভাটার মালিকদের কর্মসূচির আওতায় আনার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। খনন শেষে পাওয়া উদ্বৃত্ত মাটি নির্ধারিত ইটভাটায় সরবরাহের পরিকল্পনা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি আরও বলেন, ‘টপসয়েল নষ্ট করতে দেব না—এটা সরকারের পক্ষ থেকে কঠোর সিদ্ধান্ত। আমাদের ফার্টাইল ল্যান্ডকে রক্ষা করতে হলে ইটভাটায় টপসয়েলের ব্যবহারকে নিরুৎসাহিত করতে হবে।’
ইটভাটার মালিক সমিতির নেতাদেরও পরিকল্পনার বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, ইটভাটাগুলোর তথ্য সংগ্রহ করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। পাশাপাশি পোড়ানো ইটের বিকল্প হিসেবে ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এর ফলে প্রচলিত ইট উৎপাদনে মাটির ব্যবহার কমানোর পাশাপাশি ইটভাটাগুলোকে ধীরে ধীরে ব্লক ইট উৎপাদনে উৎসাহিত করা সম্ভব হবে।
দক্ষিণাঞ্চলের কিছু এলাকায় নদী ও খাল খননের ক্ষেত্রে বাস্তব জটিলতা থাকলেও দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
বিজ্ঞাপন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জিল্লুর রহমান বাসসকে বলেন, টপসয়েল হলো কৃষিজমির উপরিভাগের পুষ্টিসমৃদ্ধ মাটি। এতে জৈব পদার্থের পরিমাণ বেশি থাকে, যা উদ্ভিদের বৃদ্ধি এবং মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই স্তর সরিয়ে ফেললে দীর্ঘমেয়াদে জমির উৎপাদনক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জমিকে আবার চাষাবাদের উপযোগী করতে অতিরিক্ত সার ও অন্যান্য কৃষি উপকরণ প্রয়োজন হতে পারে। এতে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কৃষিজমির উর্বর স্তর সংরক্ষণ শুধু ফসল উৎপাদনের জন্য নয়, দীর্ঘমেয়াদে কৃষির স্থায়িত্ব বজায় রাখার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বাসসকে বলেন, কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য টপসয়েল রক্ষা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় আট হাজার ইটভাটায় কৃষিজমির টপসয়েল ও এর নিচের মাটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
তিনি জানান, টপসয়েল অপসারণের পর তা পুনরুদ্ধারে ১৫ থেকে ২০ বছর সময় লাগতে পারে। এতে জমির উর্বরতা ও কৃষি উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি কিছু এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হতে পারে। এসব সমস্যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি সৃষ্টি করে।
অধ্যাপক আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, পোড়ানো ইটের পরিবর্তে ব্লক ইটের ব্যবহার বাড়াতে সরকার ২০১৯ ও ২০২৫ সালে পরিপত্র জারি করেছিল। তবে বিভিন্ন জটিলতার কারণে উদ্যোগটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
বিজ্ঞাপন
তাঁর মতে, আগের পরিকল্পনাটি কার্যকর করে সরকারি নির্মাণকাজে পোড়ানো ইটের ব্যবহার কমানো এবং ব্লক ইটের ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে টপসয়েল উত্তোলন, মাটির ক্ষয় ও বায়ুদূষণ কমানো সম্ভব।
তিনি টপসয়েল সংরক্ষণের সুফল ব্যাখ্যা করে বলেন, এর মাধ্যমে মাটি রক্ষা, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত এবং বায়ুদূষণ কমানোর ‘থ্রি ডাইমেনশনাল’ সুফল পাওয়া যাবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক মো. আলমগীর কবির বলেন, ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল মাটি। কৃষিজমির উপরিভাগ কেটে নেওয়ার ফলে মাটির প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান নষ্ট হয়। এতে জমির উর্বরতা কমে এবং ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়। তাই কৃষি ও খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থে টপসয়েল সংরক্ষণের বিকল্প নেই।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিজমি সুরক্ষা আইন-২০২৬ অনুযায়ী কৃষিজমি থেকে মাটি উত্তোলন নিষিদ্ধ। তবে আর্থিক লাভের আশায় অনেক কৃষক ইটভাটার মালিকদের কাছে উর্বর মাটি বিক্রি করেন। এ ধরনের প্রবণতা বন্ধে আইন অনুযায়ী শাস্তির বিধান কার্যকর করার পাশাপাশি কৃষকদের সচেতন করা প্রয়োজন।
আলমগীর কবির আরও বলেন, সারাদেশে প্রায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচিতে উত্তোলিত মাটির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা দরকার। পরিকল্পিতভাবে এই মাটি কাজে লাগানো গেলে অপচয় কমবে এবং ইটভাটায় কৃষিজমির মাটির ব্যবহারও হ্রাস পেতে পারে।
আরও পড়ুন
বিজ্ঞাপন
এর আগে ২০২৩ সালের ১২ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদে ‘ভূমি অপরাধ প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন-২০২৩’ পাস হয়। প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, জেলা প্রশাসকের অনুমতি ছাড়া আবাদযোগ্য জমির উপরিভাগের মাটি কাটলে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রয়েছে।
তবে আইন থাকা সত্ত্বেও কৃষিজমির উর্বর মাটি ব্যবহার বন্ধে কার্যকর নজরদারি, নিয়মিত তদারকি এবং সংশ্লিষ্টদের সচেতনতা বাড়ানো জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশে কৃষিজমির পরিমাণ সীমিত হলেও জনসংখ্যা ও খাদ্যের চাহিদা ক্রমাগত বাড়ছে। এ পরিস্থিতিতে বিদ্যমান জমির উৎপাদনক্ষমতা ধরে রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষিজমির উপরিভাগের উর্বর মাটি একবার সরিয়ে ফেললে স্বাভাবিক উর্বরতা ফিরে পেতে দীর্ঘ সময় লাগতে পারে। ফলে ইট তৈরির মতো কাজে এই মাটির ব্যবহার দীর্ঘমেয়াদে কৃষি উৎপাদন ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
সরকারের নতুন পরিকল্পনায় খাল খননের পর পাওয়া উদ্বৃত্ত মাটিকে ইটভাটার বিকল্প কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তবে এ উদ্যোগ সফল করতে বৈধ ইটভাটার নির্ভুল তালিকা তৈরি, মাটির গুণগত মান যাচাই, পরিবহন ও সরবরাহের স্বচ্ছ ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ে নজরদারি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
পাইলট প্রকল্পের ফলাফল পর্যালোচনা করে পরবর্তী সময়ে কার্যক্রমের পরিধি বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ব্লক ইটের ব্যবহার সম্প্রসারণ এবং বিদ্যমান আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা গেলে কৃষিজমির উর্বরতা সংরক্ষণ, খনন করা মাটির অপচয় কমানো এবং পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক অগ্রগতি সম্ভব হতে পারে।








