Logo

সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকায় পুলিশের গাড়ি কিনছে সরকার

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২০ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩:১২
সাড়ে ৬ হাজার কোটি টাকায় পুলিশের গাড়ি কিনছে সরকার
ছবি: সংগৃহীত

পুলিশের দীর্ঘদিনের যানবাহন সংকট কাটাতে ৬ হাজার ৬০৯ কোটি টাকা ব্যয়ে ৫ হাজার ৮৩০টি গাড়ি কেনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এ জন্য ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য অপারেশনাল যানবাহন ক্রয়’ এবং ‘বাংলাদেশ পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষায়িত যানবাহন ক্রয়’ নামে দুটি প্রকল্প প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্প দুটি অনুমোদন পেলে ২০২৯ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দুটি প্রকল্পের আওতায় ৪ হাজার ৮২৯টি অপারেশনাল যানবাহন এবং ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত যানবাহন কেনা হবে। প্রথম প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ৩২৮ কোটি ৯২ লাখ ৪৭ হাজার টাকা। দ্বিতীয় প্রকল্পের সম্ভাব্য ব্যয় ২ হাজার ২৮০ কোটি ১৪ লাখ ১৪ হাজার টাকা।

পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রকল্প দুটির প্রস্তাব পুলিশ সদর দপ্তর থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো হয়েছে। আগামী ২৫ অক্টোবর অনুষ্ঠেয় জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প দুটি অনুমোদনের জন্য উপস্থাপনের কথা রয়েছে। অনুমোদন পেলে প্রকল্প প্রস্তাবনা অনুযায়ী চলতি মাস থেকেই কাজ শুরু করে ২০২৯ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

প্রকল্পের নথি অনুযায়ী, দুটি উদ্যোগই সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর পরিকল্পনা কমিশনের প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটি (পিইসি) প্রস্তাব দুটি পর্যালোচনা করে। কমিটি সঠিক ব্যয় প্রাক্কলন, সরকারি ক্রয়বিধি অনুসরণ, যানবাহনের পর্যাপ্ত রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং পুলিশের অনুমোদিত যানবাহনের তালিকার সঙ্গে প্রয়োজনীয় সমন্বয়ের সুপারিশ করেছে। পরে প্রকল্প দুটি একনেকের অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করা হয়।

প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দেশে জেলা ও মহানগর পুলিশের অধীন ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানা, ৭৩টি হাইওয়ে থানা এবং ২৪টি রেলওয়ে থানা রয়েছে। এসব থানার কার্যক্রম পরিচালনায় বর্তমানে যানবাহনের ঘাটতি প্রকট। ৬৩৯টি প্রশাসনিক থানায় মোট যানবাহন রয়েছে মাত্র ১ হাজার ২৩৭টি। এসব যানবাহন ব্যবহার করে প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় টহল ও অন্যান্য পুলিশি কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। বিদ্যমান যানবাহনের ৬৪ শতাংশের বয়স ১০ বছরের বেশি।

বিজ্ঞাপন

পুলিশের প্রস্তাব অনুযায়ী, সাধারণ পরিস্থিতিতে প্রতিটি থানায় অন্তত চার থেকে পাঁচটি পিকআপ বা টহলযান থাকা প্রয়োজন। এতে থানার বিভিন্ন এলাকায় একই সময়ে টহল চালানো এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া সহজ হবে। জনবহুল, ব্যস্ত ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী আরও বেশি যানবাহনের প্রয়োজন হতে পারে।

বর্তমানে কোনো থানায় এক বা দুটি গাড়ি থাকলে একটি দল অভিযানে বের হওয়ার পর অন্য এলাকায় টহল ও জরুরি সেবা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। যানবাহনের ঘাটতি এবং পুরোনো গাড়ির কারণে অনেক ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনা ও অপরাধের ঘটনায় দ্রুত সাড়া দেওয়াও কঠিন হয়ে পড়ে বলে প্রকল্প প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়েছে।

প্রস্তাবনায় আরও বলা হয়েছে, পর্যাপ্ত যানবাহন থাকলে অপরাধ সংঘটনের পর দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানো, অপরাধীকে গ্রেপ্তার এবং আলামত সংরক্ষণ সহজ হবে। সন্ত্রাস দমন, মাদক উদ্ধার, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং জরুরি অভিযান পরিচালনাতেও গাড়ির প্রয়োজন রয়েছে। জাতীয় নির্বাচন বা বড় কোনো অনুষ্ঠানে সব থানায় একযোগে অতিরিক্ত যানবাহনের চাহিদা তৈরি হলে বর্তমান সক্ষমতা দিয়ে তা পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

বিজ্ঞাপন

অপারেশনাল যানবাহন কেনার প্রকল্পে গাড়ি কেনার পাশাপাশি নিবন্ধন, চালক ও মেকানিকদের প্রশিক্ষণ এবং মেরামতের যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম কেনার জন্যও অর্থ বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পের একটি অংশে স্পিডবোট ও কান্ট্রি বোট কেনার পরিকল্পনাও রয়েছে। নদীপথে টহল, অপরাধী গ্রেপ্তার, জাটকা নিধন প্রতিরোধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদ্ধার ও সহায়তা এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের নিরাপত্তা জোরদারে এসব নৌযান ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে।

অন্যদিকে, ১ হাজার ১টি বিশেষায়িত যানবাহন কেনার প্রকল্পে রায়ট কন্ট্রোল ভেহিক্যাল, অল টেরেইন ভেহিক্যাল (এটিভি), মোবাইল কমান্ড সেন্টার এবং ক্রাইম সিন ভ্যানের মতো যানবাহন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এসব গাড়ি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, দুর্গম এলাকায় অভিযান, জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং অপরাধস্থল থেকে আলামত সংগ্রহে কাজে লাগবে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

প্রকল্প প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, দুর্গম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে সাধারণ গাড়ি নিয়ে চলাচল কঠিন হলেও এটিভির মাধ্যমে সেখানে পৌঁছানো সম্ভব। মোবাইল কমান্ড সেন্টারকে চলমান নিয়ন্ত্রণকক্ষ হিসেবে ব্যবহার করে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রযুক্তির সাহায্যে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা যাবে। অপরাধস্থল থেকে দ্রুত প্রমাণ সংগ্রহ এবং তদন্ত কার্যক্রমে সহায়তা করবে ক্রাইম সিন ভ্যান।

বিশেষায়িত যানবাহন কেনার পাশাপাশি এ প্রকল্পেও চালক ও মেকানিকদের প্রশিক্ষণ এবং গাড়ির নিবন্ধন ব্যয়ের সংস্থান রাখার প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য হিসেবে পুলিশের কার্যক্রমের গতি বাড়ানো, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সক্ষমতা বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

বিজ্ঞাপন

পুলিশ সদর দপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, দীর্ঘদিনের যানবাহন সংকটের কারণে স্বাভাবিক কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশেষ পরিস্থিতিতে পুলিশকে বাড়তি সমস্যায় পড়তে হয়। এতে প্রত্যাশিত সেবা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। এর সঙ্গে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ৪৫৫টি গাড়ি পুড়িয়ে দেওয়া এবং আরও ১ হাজার ৭৪টি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাও পরিবহন সংকট বাড়িয়েছে।

সরকারি অর্থায়নে বিপুলসংখ্যক গাড়ি কেনার এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুলিশের টহল, অভিযান ও জরুরি সেবার সক্ষমতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। তবে প্রকল্প অনুমোদনের আগে ব্যয় নির্ধারণ, ক্রয়বিধি অনুসরণ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের বিষয়গুলো নিশ্চিত করাই হবে গুরুত্বপূর্ণ।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD