Logo

সাইবার অপরাধ দমনে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১৩:৩৩
সাইবার অপরাধ দমনে বড় উদ্যোগ নিয়েছে সরকার
ছবি : জনবাণী গ্রাফিক্স

সাইবার অপরাধ মোকাবিলায় পুলিশের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব স্থাপন, বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ এবং স্বতন্ত্র সাইবার পুলিশ ইউনিট গঠনসহ একাধিক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। পাশাপাশি অনলাইন প্রতারণা, হ্যাকিং ও হয়রানির মতো অপরাধ তদন্তে দক্ষ জনবল তৈরিতে দেশব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

সাইবার অপরাধের বিস্তারে ব্যক্তি ও পরিবারের নিরাপত্তা যেমন হুমকির মুখে পড়ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে আর্থিক ক্ষতি, মানসিক বিপর্যয় ও সামাজিক অস্থিরতা। ভুয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট খুলে মিথ্যা তথ্য, ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে ব্যক্তির সম্মানহানি করা হচ্ছে। অনলাইন হয়রানি, হুমকি ও প্রতারণার শিকার হয়ে অনেকে ভয়, হতাশা ও মানসিক চাপে ভুগছেন।

অনলাইন ও মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে প্রতারণা, ভুয়া লিংক ব্যবহার করে অর্থ হাতিয়ে নেওয়া এবং ব্যক্তিগত তথ্য চুরির ঘটনাও বাড়ছে। পাসওয়ার্ড, ছবি, ভিডিও ও অন্যান্য গোপন তথ্য হাতিয়ে নিয়ে সেগুলো প্রতারণা কিংবা হয়রানির কাজে ব্যবহার করছে অপরাধীরা।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) বিশেষ পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. ছুফি উল্লাহ জানান, সাইবার জালিয়াতি, হ্যাকিং ও অনলাইন হয়রানিসংক্রান্ত যেসব মামলা সিআইডিতে আসে, সেগুলো পেশাদারত্ব ও আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে নিয়মিত নজরদারি ও টহল কার্যক্রমও পরিচালনা করা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তিনি আরও জানান, সাইবার অপরাধ তদন্তে নিয়োজিত কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়াতে সাইবার ট্রেনিং সেন্টার, ফরেনসিক ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (এফটিআই) ও ডিটেকটিভ ট্রেনিং স্কুলে (ডিটিএস) চলমান প্রশিক্ষণে নতুন মডিউল যুক্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি পুলিশ সদরদপ্তরের উদ্যোগে দেশব্যাপী ‘ট্রেনিং অব ট্রেইনার্স’ (টিওটি) কোর্স চালু হয়েছে, যেখানে সিআইডির কর্মকর্তারাও অংশ নিচ্ছেন।

সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সাইবার অপরাধসংক্রান্ত ১৯১টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) মামলা ৩২টি এবং সিআর (ক্রিমিনাল রেজিস্টার) মামলা ১৫৯টি। একই সময়ে সাইবার অপরাধের অভিযোগে ১০১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কম্পিউটার, স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও অন্যান্য ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সাইবার অপরাধের ধরনও জটিল হচ্ছে। প্রতারকেরা ঘরে বসে খণ্ডকালীন কাজ কিংবা ইউটিউবের ভিডিওতে ‘লাইক’ দিয়ে আয় করার প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলছে।

বিজ্ঞাপন

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও হোয়াটসঅ্যাপে বার্তা পাঠিয়ে বিশেষ করে গৃহিণী, শিক্ষার্থী ও বেকার তরুণদের লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। প্রথমে এক থেকে দুই হাজার টাকা বোনাস দিয়ে আস্থা অর্জন করে প্রতারকেরা। এরপর বিভিন্ন ‘টাস্ক’ সম্পন্ন করার নামে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগে প্রলুব্ধ করা হয়। টাকা জমা দেওয়ার পর অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয় প্রতারকেরা।

একটি সমীক্ষার বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ ধরনের আর্থিক প্রতারণায় গত এক বছরে সাধারণ গ্রাহকেরা শত শত কোটি টাকা হারিয়েছেন।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) প্রধান অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, সাইবার অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। অপরাধ দমন এবং মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কাজ করছে।

বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম সোহাগের মতে, প্রযুক্তির বিস্তারের পাশাপাশি সাইবার অপরাধের ঝুঁকিও দ্রুত বাড়ছে। সাধারণ ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ এসব অপরাধে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে তিনি উল্লেখ করেন। ওটিপি শেয়ারিং, ভুয়া ফোনকল, ডিপফেক ভিডিও, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং অনলাইন জুয়ার ফাঁদে পড়ে অনেকে দীর্ঘদিনের সঞ্চয় হারাচ্ছেন। এসব ঘটনার মানসিক প্রভাবও গুরুতর হতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা সাইবার অপরাধ থেকে নিরাপদ থাকতে অপরিচিত লিংকে ক্লিক না করা, অচেনা কাউকে পিন বা ওটিপি না দেওয়া এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যক্তিগত ছবি ও তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছেন। দুর্বল পাসওয়ার্ড, ভুয়া ওয়েবসাইটে প্রবেশ এবং সাইবার নিরাপত্তা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞানের অভাব অপরাধের ঝুঁকি বাড়ায় বলেও তাঁরা মনে করেন।

ডিএমপির মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মো. আকতার হোসেন জানান, সাইবার অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে পুলিশ কাজ করছে। সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবে ডিএমপির গোয়েন্দা শাখায় একটি সাইবার ল্যাব রয়েছে। এ ছাড়া কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইমে (সিটিটিসি) ফরেনসিক ল্যাব চালুর অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ডিজিটাল অপরাধের মামলা তদন্তে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগও নেওয়া হবে।

বিজ্ঞাপন

ডিএমপির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে রাজধানীর বিভিন্ন বিভাগে সাইবার অপরাধসংক্রান্ত মামলা ও গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটেছে। রমনা বিভাগে ৮৮টি মামলায় ১৬৩ জন, লালবাগে ২২টি মামলায় ২৩ জন, ওয়ারীতে ১২টি মামলায় ২৪ জন, মতিঝিলে ৩৩টি মামলায় ৪৯ জন, তেজগাঁওয়ে ৫৩টি মামলায় ৪৯ জন, মিরপুরে ৩৩টি মামলায় ২৭ জন, গুলশানে ৩৮টি মামলায় ৩৭ জন এবং উত্তরা বিভাগে ২৬টি মামলায় ৩৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

পুলিশ সদরদপ্তর জানিয়েছে, সাইবার অপরাধ তদন্তে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাবের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে চলতি মাসে ঢাকার পাশাপাশি চট্টগ্রামেও ডিজিটাল ফরেনসিক ল্যাব ও সাইবার ল্যাব উদ্বোধন করা হয়েছে।

এ ছাড়া ১ অক্টোবর ঢাকায় স্বতন্ত্র ‘সাইবার পুলিশ ইউনিট’ গঠন করা হয়েছে। ইউনিটটিতে ৪ হাজার ৫৯২ জন পুলিশ সদস্য ও অন্যান্য কর্মী রয়েছেন। একজন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শকের (অতিরিক্ত আইজিপি) নেতৃত্বে কেন্দ্রীয়ভাবে ইউনিটটি পরিচালিত হচ্ছে। বিভাগ, জেলা ও থানা পর্যায়েও সাইবার অপরাধ তদন্তে পৃথক কার্যক্রম বা ডেস্ক রয়েছে।

বিজ্ঞাপন

সম্প্রতি মিরপুরের পুলিশ স্টাফ কলেজে সাইবার অপরাধের মামলা তদন্ত বিষয়ে ১০ দিনব্যাপী বিশেষ টিওটি কোর্স পরিচালনা করা হয়। এ প্রশিক্ষণে পর্যায়ক্রমে ৩৩২ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পরবর্তী সময়ে তাঁরা মাঠপর্যায়ের তদন্তকারীদের প্রশিক্ষণ দেবেন।

সরকারের এসব উদ্যোগের লক্ষ্য সাইবার অপরাধ তদন্তে দক্ষতা বাড়ানো, ডিজিটাল আলামত বিশ্লেষণের সক্ষমতা জোরদার করা এবং অনলাইন অপরাধীদের শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনার প্রক্রিয়া আরও কার্যকর করা।

তথ্য সূত্র : বাসস

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD