বীরশ্রেষ্ঠ হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী আজ

মহান মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য সাহসিকতা ও আত্মত্যাগের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহি হামিদুর রহমানের ৫৫তম শাহাদতবার্ষিকী আজ। ১৯৭১ সালের এই দিনে মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার দলই সীমান্তে পাকিস্তানি সেনাদের মেশিনগান পোস্টে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে সেটি অকার্যকর করেন তিনি। এ সময় শত্রুপক্ষের গুলিতে শহীদ হন এই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধা। তাঁর আত্মত্যাগের ফলে মুক্তিযোদ্ধারা দলই সীমান্ত ফাঁড়ি দখলে সফল হন।
বিজ্ঞাপন
হামিদুর রহমানের জন্ম ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার খোরদা খালিশপুর গ্রামে। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য বীরত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব ‘বীরশ্রেষ্ঠ’ প্রদান করা হয়। সাত বীরশ্রেষ্ঠের মধ্যে মাত্র ১৮ বছর বয়সে শহীদ হওয়া হামিদুর রহমান ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।
১৯৭১ সালের অক্টোবরের শেষ দিকে কমলগঞ্জের দলই সীমান্ত এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র যুদ্ধ চলছিল। ২৮ অক্টোবর ভোররাতে লেফটেন্যান্ট কাইয়ুমের নেতৃত্বে ১২৫ জন মুক্তিযোদ্ধা চারদিক থেকে পাকিস্তানি সেনাদের অবস্থানে আক্রমণ চালান। প্রথম ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের সি কোম্পানির সদস্য হিসেবে ওই অভিযানে অংশ নেন হামিদুর রহমান।
যুদ্ধের একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা শত্রুপক্ষের সীমান্ত ফাঁড়ির দিকে এগিয়ে গেলে দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে পাকিস্তানি সেনাদের মেশিনগানের অবিরাম গুলিতে তাঁদের অগ্রযাত্রা থমকে যায়। পরিস্থিতি মোকাবিলায় মেশিনগান পোস্টটি ধ্বংসের দায়িত্ব নেন হামিদুর রহমান।
বিজ্ঞাপন
তিনি পাহাড়ি খাল ধরে বুকে ভর দিয়ে শত্রুর অবস্থানের দিকে এগিয়ে যান। কাছাকাছি পৌঁছে পরপর দুটি গ্রেনেড নিক্ষেপ করেন মেশিনগান পোস্ট লক্ষ্য করে। এ সময় শত্রুপক্ষের গুলিতে আহত হলেও অভিযান থামাননি তিনি। পরে পোস্টে পৌঁছে পাকিস্তানি দুই সেনার সঙ্গে হাতাহাতি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েন এবং শেষ পর্যন্ত মেশিনগানটি অকার্যকর করতে সক্ষম হন।
হামিদুর রহমানের এই সাহসী পদক্ষেপে মুক্তিযোদ্ধারা সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পান। তাঁরা পাকিস্তানি সেনাদের পরাস্ত করে সীমান্ত ফাঁড়িটি দখল করেন। তবে সেই বিজয় দেখে যেতে পারেননি হামিদুর রহমান। ফাঁড়ি দখলের পর সহযোদ্ধারা তাঁর মরদেহ উদ্ধার করেন। পরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের হাতিমেরছড়া গ্রামের একটি পারিবারিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।
যুদ্ধের পর দলই সীমান্ত ফাঁড়ির সামনে তাঁর স্মরণে স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়। ২০০৫ সালে তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমান সেখানে স্মৃতিসৌধের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। পরবর্তী সময়ে দলই চা বাগানের জমি অধিগ্রহণ করে নির্মাণ করা হয় স্মৃতিসৌধ।
বিজ্ঞাপন
স্থানীয় সাংবাদিকদের আবেদন এবং এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৭ সালের ২৭ অক্টোবর তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার হামিদুর রহমানের দেহাবশেষ দেশে ফিরিয়ে আনার সিদ্ধান্ত নেয়। একই বছরের ১০ ডিসেম্বর বাংলাদেশ রাইফেলসের (বর্তমানে বিজিবি) একটি দল ত্রিপুরা সীমান্ত থেকে তাঁর দেহাবশেষ গ্রহণ করে। পরদিন ১১ ডিসেম্বর রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ঢাকার বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে তাঁকে সমাহিত করা হয়।
প্রতিবছর তাঁর শাহাদতবার্ষিকী উপলক্ষে উপজেলা প্রশাসন, মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল, বিজিবি ব্যাটালিয়ন কর্তৃপক্ষ ও কমলগঞ্জ প্রেস ক্লাবের উদ্যোগে দলই সীমান্তের স্মৃতিসৌধে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। মহান মুক্তিযুদ্ধে হামিদুর রহমানের আত্মত্যাগ ও বীরত্ব আজও দেশের মানুষের কাছে সাহস, দেশপ্রেম ও আত্মনিবেদনের অনন্য উদাহরণ হয়ে আছে।








