Logo

বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

profile picture
নিজস্ব প্রতিবেদক
২৮ অক্টোবর, ২০২৬, ১৭:৪৪
বাংলাদেশে কারখানা স্থাপনে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের দেশে কারখানা স্থাপনের আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে জ্বালানি, আধুনিক প্রযুক্তি, মহাকাশ গবেষণা, উড়ালসড়ক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক উন্নয়নেও জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ ও সহযোগিতা চেয়েছেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

বুধবার (২৮ অক্টোবর) জাপানের জেটিআরও হলে ‘বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরাম সংলাপে’ মূল বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করলে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো দেশের বৃহৎ ও ক্রমবর্ধমান অভ্যন্তরীণ বাজারে সরাসরি প্রবেশের সুযোগ পাবে। পাশাপাশি উৎপাদনের অনুকূল পরিবেশ কাজে লাগিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও পণ্য রপ্তানি করতে পারবে তারা।

প্রধানমন্ত্রী জানান, আড়াইহাজারে জাপানি অর্থনৈতিক অঞ্চলে কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নিচ্ছে জাপানের গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান, বড় খুচরা বিক্রেতা এবং কৃষিযন্ত্র উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানসহ আরও কয়েকটি কোম্পানি। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়নে সরকার প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেবে।

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার আহ্বান

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে দেশটি সফর করতে পেরে তিনি সম্মানিত বোধ করছেন। মঙ্গলবার জাপানের প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর দলের সঙ্গে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদলের ফলপ্রসূ দ্বিপক্ষীয় শীর্ষ বৈঠক হয়েছে বলেও জানান তিনি। দুই দেশের ব্যবসায়ী সম্প্রদায়কে একত্র করার উদ্যোগের জন্য বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক ফোরামকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের মানুষের হৃদয়ে জাপানের বিশেষ স্থান রয়েছে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর প্রথম দিকের স্বীকৃতিদানকারী দেশগুলোর একটি ছিল জাপান। এরপর থেকে দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। দীর্ঘদিনের বন্ধুত্ব ও সহযোগিতার জন্য জাপানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তিনি।

বিজ্ঞাপন

আগামী ৩০ থেকে ৫০ বছরের অংশীদারত্বের সম্ভাবনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে ১৮ কোটির বেশি মানুষ বসবাস করেন এবং জনসংখ্যার গড় বয়স ২৭ বছর। দেশে রয়েছে তরুণ ও প্রশিক্ষণযোগ্য জনশক্তি। প্রতিবছর প্রায় ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার শিক্ষার্থী প্রকৌশলে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।

তিনি আরও বলেন, ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের নবম বৃহত্তম ভোক্তা অর্থনীতিতে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান সচ্ছল মধ্যবিত্ত শ্রেণির কারণে ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের বার্ষিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) এক ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রত্যাশাও রয়েছে।

বাণিজ্য চুক্তিতে রপ্তানির নতুন সুযোগ

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রী জানান, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের সম্পর্ক জোরদার করতে এ বছর বাংলাদেশ ও জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সই করেছে। কোনো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের এ ধরনের এটিই প্রথম চুক্তি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল উন্নয়ন সহযোগিতার মধ্য দিয়ে। এখন অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের মাধ্যমে সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে।

সম্প্রতি সই হওয়া অর্থনৈতিক সহযোগিতা কাঠামো চুক্তির ভিত্তিতে বাংলাদেশের ৭ হাজার ৩৭৯টি পণ্য শুল্কমুক্ত সুবিধায় জাপানের বাজারে প্রবেশ করতে পারবে বলে জানান তিনি। অন্যদিকে, ইস্পাত, গাড়ির যন্ত্রাংশ ও ইলেকট্রনিক যন্ত্রাংশসহ জাপানের পণ্য বাংলাদেশে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা পাবে।

বিজ্ঞাপন

বিনিয়োগ, সেবা ও শুল্কসংক্রান্ত প্রক্রিয়ায় সরলীকৃত ও প্রগতিশীল নিয়ম চালুর কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ দুই দেশের বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসার পরিবেশ সহজ করবে।

বিনিয়োগকারীদের উদ্বেগ নিরসনে সরকারের উদ্যোগ

তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ সরকার ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেয়। জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলো নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ, দক্ষ অবকাঠামো এবং শুল্ক ছাড় ও করব্যবস্থায় পূর্বানুমানযোগ্যতাকে তাদের তিনটি প্রধান উদ্বেগ হিসেবে তুলে ধরেছে।

বিজ্ঞাপন

সরকার এসব উদ্বেগের কথা শুনেছে জানিয়ে তিনি বলেন, এরই মধ্যে কিছু সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। বাকি সমস্যাগুলো সমাধানেও কাজ চলছে।

আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য, ব্যবসা পরিচালনার জন্য স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য পরিবেশের পাশাপাশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা প্রয়োজন। এসব নিশ্চিত করার উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করা সরকারের দায়িত্ব। বিনিয়োগবান্ধব পরিবর্তনের বিভিন্ন দিক তাঁর দলের সদস্যরা শিগগির তুলে ধরবেন বলেও জানান তিনি।

জ্বালানি খাতে জাপানি বিনিয়োগের আহ্বান

বিজ্ঞাপন

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রবৃদ্ধির জন্য তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। এর প্রথমটি হলো জ্বালানি।

তিনি বলেন, যেকোনো দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী জ্বালানি অপরিহার্য। বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা ঐচ্ছিক বিষয় নয়, বরং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রয়োজন।

দেশের ভবিষ্যৎ জ্বালানি চাহিদা বিবেচনায় জ্বালানি অবকাঠামো, দক্ষ বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পে জাপানি প্রতিষ্ঠানগুলোকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

বিজ্ঞাপন

এআই, প্রযুক্তি পার্ক ও মহাকাশ সহযোগিতা

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে প্রযুক্তি ও মহাকাশ সহযোগিতার কথা তুলে ধরেন তারেক রহমান। তিনি জানান, বাংলাদেশ-জাপান প্রযুক্তি পার্ক প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), ক্লাউড কম্পিউটিং, রোবোটিকস ও ইলেকট্রনিকস উৎপাদনকে গুরুত্ব দিয়ে উদ্ভাবনভিত্তিক তথ্যপ্রযুক্তি পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে জাপানি প্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয় ও বিনিয়োগকারীদের সম্পৃক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মহাকাশ প্রযুক্তিতেও দুই দেশের সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশ মহাকাশবিষয়ক সক্ষমতা জোরদার করতে আগ্রহী। মহাকাশবিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও স্যাটেলাইট প্রকৌশলে জাপানের উন্নত সক্ষমতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পারস্পরিক লাভজনক সহযোগিতা গড়ে তুলতে চায় বাংলাদেশ।

ছয় বিভাগীয় শহর যুক্ত হবে উড়ালসড়ক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্কে

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে উড়ালসড়ক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক উন্নয়নের কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি জানান, উৎপাদনশীল অর্থনীতির জন্য শহর ও গ্রামের মধ্যে এবং কারখানা ও বন্দরের মধ্যে উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ এমন একটি পরিবহনব্যবস্থা গড়ে তুলতে চায়, যা মানুষকে নতুন সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করবে এবং দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন আরও দক্ষ করবে। এ লক্ষ্যে দেশের ছয়টি প্রধান বিভাগীয় শহরকে যুক্ত করে দেশব্যাপী উড়ালসড়ক ও দ্রুতগতির রেল নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

আরও পড়ুন

অবকাঠামো উন্নয়নে জাপানের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশব্যাপী উড়ালসড়ক ও রেল নেটওয়ার্কের মহাপরিকল্পনা তৈরিতে জাপানের সহযোগিতা চায় বাংলাদেশ। পরবর্তী সময়ে সম্ভাব্য প্রকল্পগুলোতে বিনিয়োগ ও অর্থায়নের ক্ষেত্রেও জাপানের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।

শিক্ষার্থী বিনিময় ও জাপানি ভাষা শিক্ষায় গুরুত্ব

অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ ও সম্পর্ক জোরদারের ওপরও গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিবছর বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষার জন্য জাপানে যান এবং মূল্যবান দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। দেশে ফিরে তাঁরা জাপানের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণেও সহায়ক ভূমিকা পালন করেন।

তারেক রহমান জানান, বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জাপানি ভাষা শেখানো শুরু করা হচ্ছে, যা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার। ভবিষ্যতে বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি তরুণ জাপানি ভাষা শিখবেন এবং দুই দেশের সম্পর্ক আরও গভীর করতে ভূমিকা রাখবেন বলে প্রত্যাশা করেন তিনি।

জাপানি বিনিয়োগকারীদের নতুন উদ্যোগে স্বাগত

বক্তব্যের শেষাংশে জাপানি ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে নতুন বিনিয়োগের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভিত্তি গড়ে তোলার সময় জাপান পাশে ছিল। এখন বাংলাদেশের শিল্প গড়ে তোলা, নতুন সুযোগ সৃষ্টি এবং দেশের সঙ্গে প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে জাপানি বিনিয়োগকারীদের আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুই দেশের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বকে আরও শক্তিশালী অংশীদারত্বে রূপান্তর করা এবং উভয় দেশের জনগণ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য পারস্পরিক সুযোগ ও সমৃদ্ধি সৃষ্টি করাই বাংলাদেশের লক্ষ্য।

জেবি/এএস

জনবাণী এর সকল স্বত্ব সংরক্ষিত। কপিরাইট © ২০২৬

Developed by: AB Infotech LTD